ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকাঃ বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও সমীক্ষা ছাড়াই অনুমানের উপর তৈরি করা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প। যেখানে বলা আছে এখন ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচের প্রকল্প হলেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। যার ফলে অনুমোদনের পরই প্রকল্পের খরচ বৃদ্ধি পায়। শেষ হয় না নির্ধারিত মেয়াদে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সৈয়দপুরে ক্যারেজ তৈরির কারখানা নির্মাণ প্রকল্পটিতে একই ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় ঋণের টাকার এই প্রকল্পের খরচ এখন দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে। আর ঋণের টাকায় বিদেশে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সফর, দেশে প্রশিক্ষণ নেবেন কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, সৈয়দপুর ওয়ার্কশপ বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে ওয়ার্কশপ। ১১২ একর এই ওয়ার্কশপের আয়তন। এর মাধ্যমে রেলওয়ের ক্যারেজ পুনর্বাসনের কাজ করা হয়। এখন এখানে ক্যারেজ তৈরির কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কারখানা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্যারেজ তৈরি করতে সক্ষমতা অর্জন করবে। স্বল্পসময়ে ভবিষ্যতে ক্যারেজের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তা জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। আর এ কারণে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ক্যারেজ তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য ভারতীয় এলওসি বা লেটার অব ক্রেডিট ঋণ সহায়তায় ৭৫৪ কোটি টাকা একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়। যেখানে ঋণের পরিমাণ ৬২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সেটা ২০১৭ সালে পরিকল্পনা কমিশনের কাজে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সেই প্রকল্পটি আজো আলোর মুখ দেখেনি। তবে এখন আবার দ্বিগুণ ব্যয় বাড়িয়ে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে এক হাজার ৪৬১ কোটি টাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং ষ্টক) এর নেতৃত্বে প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে সদস্য সচিব করে আইএমইডি, রেলপথ মন্ত্রণালয়, ভৌত অবকাঠামো বিভাগ, অর্থ বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি সৈয়দপুর কারখানা পরিদর্শন করেন। সে আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পুনর্গঠন করে ২০১৮ সালের ৬ মে পরিকল্পনা কমিশনে পোঠায়। তাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৪৬০ কোটি ৮৪ লাখ দুই হাজার টাকা। যেখানে সরকারি অর্থ ২৪৭ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং প্রকল্প ঋণ এক হাজার ২১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়। এখন চলছে ২০২১ সালের এপ্রিল। প্রকল্পটি এখনো ফাইলেই আছে, আলোর মুখ দেখেনি।

  বন্যা দুর্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রে ৮৯ হাজার মানুষ

পরামর্শক নিয়োগ, রেলওয়ের প্রকৌশলীদের বিদেশ প্রশিক্ষণ, শিক্ষা সফর ওয়ার্কশপ তৈরির জন্য, প্রকৌশলীদের চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ, যান্ত্রিক প্লান্টস ও মেশিনারিজ সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং, ইলেকট্রিক্যাল প্লান্টস অ্যান্ড মেশিনারিজ সরবরাহ স্থাপন ও কমিশনিং, যানবাহন কেনা, অফিস উপকরণ কেনা ও আসবাবপত্র কেনা। পূর্ত কাজও রয়েছে সাথে।

প্রকল্প পর্যালোচনার ভৌত অবকাঠামোর তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই করা হয়নি। তবে নতুন করে প্রস্তাবনায় সমীক্ষার কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় প্রকল্পটি রয়েছে।

আর খরচের হিসাব বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, বিডিং পরামর্শক খরচ ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, নির্মাণ তদারকির জন্য পরামর্শকে ব্যয় ২০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, রেলওয়ের প্রকৌশলীদের বিদেশ প্রশিক্ষণে দুই কোটি টাকা, ওয়ার্কশপ তৈরির জন্য শিক্ষা সফরে এক কোটি টাকা এবং প্রকৌশলীদের চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ খরচ ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারখানা নির্মাণে ৭০৭ কোটি ৮০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, ইলেকট্রিক্যাল প্লান্টস ও মেশিনারিজ সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিংয়ে ২৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, দু’টি গাড়ি কিনতে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পূর্ত কাজে ৩২৫ কোটি ৫৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত হলো, ঋণচুক্তি সম্পাদনকালে পরামর্শকের জন্য বরাদ্দ ও নিয়োগ অর্থাৎ পরামর্শক অংশটি বাংলাদেশের সরকারি খরচের ভেতরে রাখতে হবে। কিন্তু এই প্রকল্পে সংশোধিত ডিপিপিতে সেটা করা হয়নি।

ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথম পিইসি সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের দ্বিতীয় ভৈরব, তৃতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ, খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প, কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পূনর্বাসন, কাশিয়ানি-গোপালগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আলোকে এটি করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান মো: আতাউর রহমান খান কার্যপত্রে বলছেন, প্রথমে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করা হবে। তারপর ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হবে। সাধারণত ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করতে দুই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন হয়। তারপর জানা যাবে প্রকল্পটি ফিজিবল কি না। সে ক্ষেত্রে এখনই নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা সমীচীন হবে না। প্রথমে সরকারি অর্থে এই সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। তারপর নির্মাণের জন্য ভারতীয় এলওসি ঋণের অর্থায়ন খোঁজা যৌক্তিক হবে। আর ভারতীয় এলওসির তালিতায় প্রকল্পটি আছে কি না সেটিও দেখতে হবে। তারপর প্রস্তাবনা।

আমাদেরবাণী/মৃধা