দেশে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। সেসব আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে মানুষ এবং সম্পদ। যখন মানুষ মারা যাচ্ছে তখন বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। দেশজুড়ে আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে, কতৃপক্ষ পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে,তদন্ত কমিটি হচ্ছে, তদন্ত কমিটি রির্পোট জমা দিচ্ছে,প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারপর আবার সব চুপচাপ। আবার যখন কোন জায়গায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে তখন আগুন লাগার কারণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। সেই নিমতলী থেকে মানুষ পুড়ছে। তারপর চকবাজার আর তারপর বনানীর এফআর টাওয়ার। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ছোটবড় বহু অগ্নিকান্ডের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। সেসব আগুনে মানুষ না পুড়লে পুড়ছে মানুষের স্বপ্ন।

অগ্নিকান্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কেন এত ঘনঘন অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে সে প্রশ্নই এখন সবার মনে। কিন্তু আগুনের ধোয়ার মতই এর উত্তরও ধোঁয়াশায় ভরা। গত ১৫ বছরে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ১৯৭০ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৪২৫ জন। এসব অগ্নিকান্ডের ভেতর ১ হাজার ৪১১ টি অগ্নিকান্ডের কোনা কারণ জানা যায়নি। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪০ হাজার ৬৬৩ টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৪৮০ জন নিহত এবং ৩৬৮৪ জন আহত হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ৯৫ টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১৬১ জন নিহত এবং ১৩৮৫ জন আহত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৮৯ হাজার ৯২৩ টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১১২২ জন মারা যায় এবং আহত হয় ৫১৩৫ জন। ২০০৪ সালের পর থেকে দেশে অগ্নিকান্ডের ঘটনা যেমন বেড়েছে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। অগ্নিকান্ডের পর ক্ষতিগ্রস্থ এফআর টাওয়ারে পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা উত্তরের মেয়র বলেছেন ’ এখন কথা বলার সময় নেই, অ্যাকশন নেওয়ার সময়”। মাননীয় মেয়রের কাছে অনুরোধ আর কোন চকবাজার বা এফআর টাওয়ারের ঘটনা ঘটার আগেই এই অ্যাকশন নেয়া হোক।

একের পর এক মৃহদেহ, পোড়া, আধপোড়া । বাতাসে লাশের গন্ধ। এসব বিভৎস দৃশ্য দেশের মানুষ আর সহ্য করতে পারছে না। কত মানুষের স্বপ্ন নিমেষেই ছাই হয়ে গেল। টিভির পর্দায় দেখেছি অনেকেই জানালার কাচ ভেঙে হাত বাড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছে। অনেকেই বাঁচার জন্য নিচে লাফ দিয়েছে। আহারে! বাঁচার যে আকুতি আমরা দিনের পর দিন দেখছি তা যেন আর না দেখতে হয়। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে আগুন নিভে যেতে থাকে। সেই সাথে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের সংখ্যা। নিমতলীর পর চকবাজার। দুই এলাকার দুরুত্বও বেশি নয়। আগুনের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। আর আগুন দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করেছিল কেমিক্যালের কারণে। নিমতলীতেও ভয়াবহ আগুনের পেছনে এই কেমিক্যাল ছিল।

আমাদের দেশে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ডে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। নিমতলীর এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সেখান থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানোসহ ১৭ টি সুপারিশ করেছিল। তারপর বহু বছর পার হয়ে গেছে। সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে। তারপর চকবাজার ট্রাজেডি এবং বনানী ট্র্যাজেডি। এবারও তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই সুপারিশ এবং তা বাস্তবায়নের কথা ঘুরেফিরেই আসছে। কারণ সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে সেই সুপারিশে মানুষের লাভ কোথায়। আমরা তদন্ত কমিটি হয়েছে এই পর্যন্ত জানতে চাই না। আমরার চাই তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে কি না তা দেখতে। কোন ঘটনা থেকে কেবল শিক্ষা নিয়ে বসে থাকলেই পরবর্তী ঘটনা আটকানো যায় না। ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যেন আর না ঘটে বা ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় তা বাস্তবায়ন করাই আসল কাজ। কোন দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার যথাযথ কারণ বের করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।

  শ্রেষ্ঠ জীবের নিকৃষ্ট কাজ

জনগণের জীবন নিয়ে যারা ছেলেখেলা করে তাদের বিরুদ্ধে জোরদার পদক্ষেপ কেন নেয়া হয় না। আমাদের রাজধানী ঢাকা যে আজ মৃত্যুপুরী তা সবারই জানা। অবশ্য স্বপ্নের এই শহরটাকে আমরাই মেরে ফেলেছি বহু বছর আগেই। এফআর টাওয়ারের আগ্নিকান্ডে ঢাকার বহুতল ভবনগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে একটার সাথে আরেকটা গা ঘেঁষে। কোন নিয়মের তোয়াক্কা নেই গড়ে উঠেছে ভবন। উপর মহলকে ম্যানেজ করে দশ তলা বিল্ডিংয়ের অনুমতি এনে গড়ে তুলছে পনেরো তলা ভবন। যে এফআর টাওয়ারে আগুন লেগে ২৫ জন মানুষ পুড়ে ছাই হলো, সেই ভবনের ২২ তলা পর্যন্ত অনুমতিই ছিল না। তাহলে কোন ক্ষমতার বলে তারা ভবন তলা পর্যন্ত করেছিল। নিশ্চয়ই তাদের সেই জোর আছে। আমাদের দেশে ক্ষমতাশালীরা মাঝে মধ্যেই ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায় আর দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয় সাধারণ মানুষকে। ঢাকার বহুতল ভবনগুলোর অধিকাংশতেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই। নেই ঠিকঠাক জরুরি নির্গমন ব্যবস্থাও। আর আইন অমান্য করে ও বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় বিল্ডিংগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। কতৃপক্ষ অনুসন্ধান করলে এরকম অনিয়মে গড়ে ওঠা এফআর টাওয়ারের মত বহুতল ভবনের সন্ধান আরও পাওয়া যাবে। বলা বাহুল্য এরা শক্তিশালী। তাই কাজটা বেশ কষ্টসাধ্য। চকবাজারের ঘটনার পর কেমিক্যাল গুদাম সরাতে অভিযানে কতৃপক্ষ প্রথমে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু সেসব বাধা কতৃপক্ষকে থামাতে পারেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে অগ্নিকান্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে খুব দ্রুত কিছু সমাধানে আসা প্রয়োজন। অন্ততপক্ষে প্রতিটি ভবনের কর্মীরা যেন জরুরি সময়ে নিরাপদে বের হতে পারে সেজন্য বহির্গমন সিঁড়ি সহ তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা প্রতিটি ভবনে বাধ্যতামূলক করা হোক। উন্নত বিশে^ অগ্নিকান্ডে জরুরি সময় যে ধরনের আধুনিক উপকরণ ব্যবহৃত হয় তা আমাদের দমকল বাহিনীর জন্যও সরবরাহ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তাবায়ন করতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটার পর এটা করা উচিত ছিল, ওটা করা উচিত ছিল এসব নিয়ে চিৎকার না করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়াই উত্তম।

দেশের মানুষ আর কোন পোড়া লাশ দেখতে চায় না। যাদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে আজ এই কারণে আজ এত প্রাণহানি হোক তার পেছনে যেই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সেই সাথে নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে অতিসত্তর কাজ করতে হবে। এখন থেকেই যদি সতর্ক অবস্থানে যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে ভবিষ্যৎ ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো অনেকটাই সম্ভব হবে। নিমতলী,চকবাজার বা বনানীর পর আবার কোথায় দুর্ঘটনা ঘটবে সেই আশংকায় সময় পার করছি আমরা। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর রির্পোট জমা পরে ফাইল ভর্তি না করে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। মোট কথা আমরা কথা নয়, প্রতিশ্রুতি নয় অ্যাকশন দেখতে চাই।

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, পাবনা।

আমাদের বাণী-আ.আ.হ/মৃধা

[wpdevart_like_box profile_id=”https://www.facebook.com/amaderbanicom-284130558933259/” connections=”show” width=”300″ height=”550″ header=”small” cover_photo=”show” locale=”en_US”]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *