’আমাদের শিক্ষা; বিচিত্র ভাবনা’ গ্রন্থে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরুপ

শিক্ষা মানুষের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত শক্তি জাগ্রত করার কাজ করলে বাস্তবিক ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সঠিকভাবে হচ্ছে না। শিক্ষা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফল হচ্ছে না। প্রয়োগের উদ্দেশ্য এবং ধরণেই এমনটা হচ্ছে বলাই যায়। শিক্ষা একটি বিস্তৃত বিষয়। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মাঝে মধ্যেই পরিবর্তন করতে দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী তেমন কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না।

শিক্ষা এবং এর বর্তমান গতিবিধি নিয়ে লেখালেখি হয় তবে সেটা প্রায় গৎবাধা। এবারের বইমেলায় হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। তবে শিক্ষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বইয়ের দেখা পাওয়া যায় না। এর মধ্যেই প্রকৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকৃতি ও বেসরকারি সংস্থা সিদীপ এর যৌথ প্রকাশনায় মোহাম্মদ ইয়াহিয়া এবং আলমগীর খান সম্পাদিত আমাদের শিক্ষা; বিচিত্র ভাবনা নামে বইটি উল্লেখযোগ্য।

বইটিতে শিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা দেশের এবং দেশের বাইরের লেখকদের লেখার সমাহার ঘটেছে। বইটিতে মূলত শিক্ষা কি, উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন, আমাদের দেশের শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত এবং শিক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি ও বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, যতদিন শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া হবে, ততদিন সমাজে শুধু চাকররা জন্মাবে, মালিক নয়”। বইটির শুরুতেই প্রখ্যাত গবেষক আরশাদ সিদ্দিকীর লেখা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক সময়কার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশরা। মূলত ব্রিটিশদের তৈরি করা শিক্ষা ব্যবস্থাতেই কিছুটা পরিবর্তন করে আজও আমাদের দেশে চলছে। ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লর্ড মেকলে সাহেব। লর্ড মেকলে সাহেবের এ উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন নিয়ে একটি চিন্তা চেতনা ছিল এরকম- ” তিনি ১৮৩৫ সালের ২ ফ্রেবুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে তার বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি ভারতের আনাচে কানাচে ঘুরেও একজন ভিক্ষুক কিংবা একজন চোরের দেখা পাইনি। এদেশে এতটা ধনসম্পদ, এদেশের মানুষের মধ্যে নৈতিক চরিত্রের এতটা উচ্চস্তর দেখেছি যে, এদেশবাসীর শিক্ষা,তাদের ধর্মবিশ^াস,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে না পারলে আমরা কোনদিনই দেশটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো না।”

নিজেদের সংস্কৃতিকে গুলিয়ে আমরা পর সংস্কৃতির শিক্ষাই লাভ করতে শিখেছি। ড: মুঞ্জুরে খোদার লেখায় জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা সর্ম্পকে একটি বিস্তৃত ধারনা পাওয়া যায়। সম্প্রতি উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রসঙ্গ এসেছে। জাপান পৃথিবীর উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় অনুকরণীয়। ফলে এই প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে সেদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসে। এ.কে.ফজলুল বারির ’ অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও সামাজিক গবেষণার মাধ্যমে গ্রাম-উন্নয়নে আখতার হামিদ খানের চিন্তা ও কর্মযজ্ঞ নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। এই লেখায় শিক্ষায় গ্রামীণ মানুষের ভূমিকা এবং গ্রামীণ মানুষের শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সুফল ভোগ করতে হলে প্রান্তিক মানুষের শিক্ষিত হওয়া আবশ্যক। কারণ আমাদের দেশটাই আজও গ্রাম কেন্দ্রিক। গ্রামের কোন কিছু ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি শহরে পরে। শিক্ষা এনজিও ভূমিকার নতুন মাত্রা নিয়ে আলোচনা করেছেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া। ব্র্যাক সহ অন্যান্য এনজিও দেশের শিক্ষায় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে এবং এই কাজ আরও কিভাবে জোরদার করা যায় সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। শিক্ষা প্রদান একটি সেবামূলক কাজ হলেও বিষয়টি আজ রীতিমত বাণিজ্যিক একটা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে কয়েক বছর আগে থেকেই শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

  মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ইমাম মেহেদীর ‘১৯৭১ ডাঁশার চাষী ক্লাব যুদ্ধ’ গ্রন্থ বিতরণ

ভালো মানের স্কুল, ভালো ফলাফল, নামী দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট এসব নিয়ে বাণিজ্য হয়। আবার এক শ্রেণির দালাল বড় বড় ডিগ্রীর সার্টিফিকেট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে। সেসব ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে অনেকে চাকরিও করছে। শিক্ষা যদি পণ্য না হয় তো আর এত সহজলভ্য পণ্য কি আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হওয়া প্রাক প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহন এবং গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন ইব্রাহীম হোসেন। শিশুদের নিয়ে ’শিশু ও সভ্যতা’ শিরোনামে লিখেছেন ড.মো.সাজেদুর রহমান, ’এসওএস হারমেন মেইনার শিশুপল্লী” শিরোনামে লিখেছেন আশরাফ আহমেদ এবং ’অবাধ্যতার আনন্দ’ শিরোনামে সের্গেই মিখাল্কভের গল্প রয়েছে বইটিতে। এসব লেখায় শিশুর শৈশব, শিশুর শিক্ষা লাভ এবং শিশুর প্রতি আচরণ ও অবহেলার কথা উঠে এসেছে।

বইটিতে নারী শিক্ষার প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পুরুষশাসিত সমাজের প্রতিবন্ধকতার ভেতর নারী শিক্ষার অগ্রগতি, নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে মহিয়সী নারী এবং তাদের অবদান,ব্রিটিশ সময়কালীন নারী শিক্ষার অগ্রগতি,নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে ভূমিকার রাখা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত এবং ধারাবাহিকভাবেই উঠে এসেছে সালেহা বেগমের ’বাংলায় নারী শিক্ষা বিস্তারের উষালগ্ন” লেখায়। নারী শিক্ষার পাশাপাশি বর্তমান সমাজের লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে রুমানা সুলতানার ’ লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে হবে ঘর ও স্কুল থেকেই” নামক প্রবন্ধটিতে। এখানে স্পষ্টত লেখিকা আমাদের সমাজের যুগ যুগ ধরে চলে আসা কথা ও কাজে নারীদের পুরুষদের তুলনায় কিছুটা খাটো করে উপস্থানের বিষয় এবং পরবর্তীতে এর প্রভাব চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।

এছাড়া ’শিশুদের সাংস্কতিক চর্চা’ প্রবন্ধে লেখক মনজুর শামস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব এবং প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই প্রবন্ধে এরিষ্টটলের একটি শিক্ষা সম্পর্কিত উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। এরিষ্টটল বলেছেন, ’একজন শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে পার্থক্য ততটুকুই যতটুকু পার্থক্য একজন জীবিত ও মৃত মানুষের মধ্যে’। যে শিক্ষা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না তার কোন প্রয়োজন নেই। আজকাল যেন সেই মূল লক্ষ কেবল সার্টিফিকেট। সেটা লেখাপড়া করে হোক বা টাকা দিয়ে কিনে হোক কার্যসিদ্ধি হলেই হলো। কোনমতে একটা সার্টিফিকেট পেলেই সব শেষ। শিক্ষার বাণিজ্যিকিরণ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মারাত্বক। শিক্ষা যদি কোন ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারে তাহলে ধরে নিতে হবে সেই শিক্ষা কেবল বিষ ঢেলেছে অমৃত নয়।

অলোক আচার্যের লেখায় বর্তমান অভিভাবকদের তার সন্তানদের ওপর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে অতিমাত্রায় চাপের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রন্থটির একেবারে শেষে, শিক্ষা, স্বাক্ষরতা এবং সনদপত্র এগুলো শিক্ষার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত হলেও যে স্বাক্ষরতা অর্জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সনদপত্র পেলেই তাকে প্রকৃত শিক্ষিত বলা যাবে না সে বিষয়টি উঠে এসেছে আলমগীর খানের ’শিক্ষা,সাক্ষরতা এবং সনদপত্র’ নামক প্রবন্ধে। প্রবন্ধে লেখক স্পষ্টতই লিখেছেন, আমাদের দেশে বরাবরই শিক্ষাকে শিশুর জন্য সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে, অধিকার হিসেবে নয়”। তাই আজও আমাদের দেশে স্কুলে না যাওয়া শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার বিস্তৃতি এত বেশি যে প্রতিনিয়তই এটি নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা নিয়ে আরও বেশি লেখালেখি হওয়া উচিত।

প্রাবন্ধিক ও কলামিষ্ট , পাবনা।

আমাদের বাণী-আ.আ.হ/মৃধা

[wpdevart_like_box profile_id=”https://www.facebook.com/amaderbanicom-284130558933259/” connections=”show” width=”300″ height=”550″ header=”small” cover_photo=”show” locale=”en_US”]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *