জিকরুল হক, উত্তরাঞ্চল সংবাদদাতা;  উত্তরাঞ্চলে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দফায় দফায় বন্যা হওয়ায় গোচারণ ভূমি ডুবে যাওয়ায় ঘাস পঁচে গেছে। জমির আঁেলও ঘাস মিলছে না। পুরোপুরি খড় নির্ভর হয়ে ওঠছে প্রাণিকূল। এই সুযোগে খড়ের দাম আকাশচুম্বি হয়ে ওঠেছে।

মাসখানিক আগেও ২০০ টাকায় এক পোন (৮০টি খড়ের আঁটি) খড় মিলত। বর্তমানে প্রতি পোন খড় বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ টাকা দরে। প্রতিটি খড়ের আঁটি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১৫ টাকা মূল্যে। প্রান্তিক কৃষক ঘরের বধূরা গরুর খাবারের জন্য খড় বিক্রেতার সঙ্গে চাল বিনিময় করছে। এক কেজি চালে মিলছে মাত্র তিনটি খড়ের আঁটি। যা ছোট সাইজের গরুর এক বেলারও খাবার হয় না। চালের চড়া বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনটি খড়ের আঁটিরও বর্তমান বাজার মূল্য সাড়ে ৪৬ টাকা।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দেয়া তথ্য মতে, এই জনপদে ৮৫০০ ছোট, বড় গরুর খামার রয়েছে। একেকটি খামারে ৫টি থেকে ২০টি পর্যন্ত গরু আছে। ছোট খামারিরা মাঠের ঘাসের ওপর নির্ভর করে গরু পালত। বাড়ির আশপাশ এবং রাস্তার পাশের পতিত জমিতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা ঘাসই ছিল ছোট খামারিদের গরুর খাবারের প্রধান উৎস। কিন্তু দফায় দফায় বন্যা ও স্বাভাবিক বৃষ্টির চেয়ে অতিমাত্রায় বৃষ্টি হওয়ায় ঘাস পানিতে ডুবে পঁচে গেছে। এক সপ্তাহ শুষ্ক আবহাওয়া থাকলে পতিত জমিগুলোতে ঘাসের অংকুর গজাতো। কিন্তু এবারের মওসুম ঘাসের জমদূতে পরিণত হয়েছে। আবাদি জমি পানিতে ডুবে থাকায় জমির আঁলেও ঘাস জন্ম নিচ্ছে না। এ কারণে গো-খাদ্যের জন্য পুরোপুরি খামারিরা খড়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

খড় ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র রায়, মংলু ও হাফিজ জানান, মোকামে খড়ের চড়া মূল্য। আমরা সেখান থেকে নিয়ে এসে সামান্য লাভ ধরে ভোক্তাদের দেই। কোন সিন্ডিকেট নেই ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর সদর ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্ষা মওসুমে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় খড় যেত। বন্যার কারণে কৃষকের মজুদ খড় বৃষ্টির পানিতে ডুবে পঁচে গেছে। যেসব কৃষক বাঁশের মাচায় খড়ের মজুদ করেছিল তাদের খড়ই বন্যা ও অতিবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এসব মজুদের পরিমাণ যৎসামান্য। এজন্য চাহিদার শুকনা খড় পাওয়া দুঃস্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। খড় মজুদের তুলনায় চাহিদা শতগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় খড়ের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও সাধারণ মানুষ পেটে পাথরবেধে গো-সম্পদ রক্ষার্থে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। আগামী সাতদিনের মধ্যে আবহাওয়ার পরিবর্তন না হলে খামারের পশু সম্পদগুলো পুষ্টিহীনতার শিকার হয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পশু চিকিৎসকরা বলছেন। এতে করে পুষ্টিহীন গো-সম্পদে মহামারি দেখা দিতে পারে। অন্যান্য বছর উঁচু আবাদি জমিগুলোতে এই মওসুমে বেশ ঘাস মিলত। কিন্তু কৃষকরা ফসল চাষে বাড়তি ব্যয় কমাতে ফসলি জমিতে ঘাস মারার ওষুধ দিচ্ছে।

  করোনায় সারাবিশ্বে মৃত্যু ৬ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি

বিশেষ করে কীটনাশক কোম্পানির বেনসানিল, এমরাজ ও সুপার পাওয়ার (ডব্লিউপি) ফসলি জমিতে আগাছা নাশক হিসাবে ব্যবহার করায় ঘাস জন্ম নিচ্ছে না। এতে করে ঘাসের সহজলভ্যতা আর নেই।
এমন অবস্থায় গো-সম্পদ বাঁচিয়ে রাখা সাধারণ মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। কথা হয় খামার মালিক মিজান, পরিমল, নাজমুল, মমিনুল, মনসুর, আবেদ আলী, শাহাজাহানসহ একাধিক খামারির সঙ্গে। তারা অভিযোগ করে বলেন, খড়ের চড়া বাজারে খড় কিনতে গিয়ে অনেকে ধারদেনায় পড়ে গেছেন। অনেক সময় নিজে না খেয়ে অবলা পশুদের জন্য কিনতে হচ্ছে। জামিলুর রহমান নামে একজন খামারি জানান তার খামারে ছোট বড় মিলে সাতটি গরু আছে। সাতটি গরুর খাবারের জন্য তিন বেলা প্রয়োজন কমপক্ষে ৪০টি (আধা পোন) খড়ের আঁটি। এই ৪০টি খড়ের আঁটির বর্তমান বাজার মূল্য ৬৫০ টাকা। তিনি সারাদিনে রিক্সাভ্যান চালিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। তার এই সীমিত আয় দিয়ে নিজের পরিবারে অন্ন জোগাবে না গরুর জন্য খাবার কিনবে? একই অবস্থা অন্যান্য ছোট খামারিদেরও। অনেক খামারি ফসলি জমি বন্ধক রেখে গরুর খাবারের টাকার যোগান দিচ্ছে। তাদের আশা আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে গরুর বিক্রির টাকায় বন্ধকি জমি ছাড় করতে পারবে।

এ বিষয়ে জানতে কথা হয় রংপুর বিভাগীয় প্রাণিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. হাবিবুল হকের সঙ্গে। তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা প্রাকৃতিকভাবেই করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই।