জিকরুল হক, উত্তরাঞ্চল সংবাদদাতাঃ শত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে উত্তরাঞ্চলে বোরো মওসুমে আকাক্সক্ষার ৮০ ভাগ চাল মজুদ করা সম্ভব হয়েছে। রংপুর বিভাগের আট জেলার ৫৮টি উপজেলার ৮৮টি খাদ্যগুদামে মজুদ করা হয় এসব চাল।

রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্র জানায়, বোরো মওসুমের সংগ্রহ অভিযানের শুরুতেই করোনার ছোবল মারে। এতে করে চলমান কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়ে। দেশে শুরু হয় লকডাউন। চালের মজুদে যাতে কোন ঘাটতি না হয় এমন নির্দেশনা দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশনা মতে খাদ্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা চাল সংগ্রহে মাঠে নামে। বিশেষ করে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খাদ্যগুদামে চালের মজুদ বাড়াতে অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করে। সরকারের বেধে দেয়া সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রার আশিভাগ চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

তাদের দেয়া তথ্য মতে, উত্তরাঞ্চলের ২৭১টি অটোরাইস মিল ও সাত হাজার ৮০টি হাসকিং মিল মালিকের সঙ্গে খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের চুক্তি করা হয়। চুক্তিকৃত মান সম্পন্ন চাল যথাসময়ে খাদ্যগুদামে সরবরাহ করতে দফায় দফায় খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মিল মালিকদের তাগাদা দেন। অটোরাইস মিল মালিকরা সরকারকে সহায়তা করতে তাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। তবে হাসকিং মিল মালিকরা চুক্তি করলেও চুক্তির শর্ত রাখতে পারেনি। হাসকিং মিল থেকে চুক্তি অনুযায়ী চাল মিললে মজুদের আকাক্সক্ষার শতভাগ পূরণ করা সম্ভব হতো।

গরীববান্ধব বর্তমান সরকার ধানের মূল্য কেজি প্রতি ২৬ টাকা আর চালের মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু খোলা বাজারে প্রতি কেজি ধান বিক্রি হয়েছে ৩২ টাকা দরে। এতে করে প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত কৃষকরা এ মওসুমে বেশ লাভবান হয়েছে। কিন্তু সরকারের ধান সংগ্রহে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হয়নি। সে কারণে সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদ বাড়াতে মিল মালিকদের চাপ দেয়া হয়। অটোরাইস মিল মালিকরা সরকারকে সহায়তা করতে খোলা বাজারে চালের মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজি ৭ টাকা কমে খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করে। খোলা বাজারে যে মানের চাল বর্তমানে ৪৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে সেই মানের চাল খাদ্যগুদামে ৩৬ টাকা কেজি দরে সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা হয় উত্তরবঙ্গের বৃহৎ চালকল আফজাল অটো রাইস মিলের মালিক আফজাল খানের সঙ্গে। তিনি বলেন সরকার চাল মজুদ করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। জনকল্যাণময়ী বর্তমান সরকারকে আমরা চালকল মালিকরাও সহযোগিতা করতে চাইছি। এজন্য মুনাফা নয় মানবতা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাজার মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। তার মতে এই মওসুমে খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে কমপক্ষে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা তিনি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

  করোনাতেও মন গলছে না ১৩ ব্যাংকের

এ বছর বোরো মওসুমে সরকার উত্তরাঞ্চল থেকে সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল দুই লাখ ৩৬ হাজার ২৩৫ মেট্রিক টন। শত প্রতিক‚লতাকে উপেক্ষা করে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় আশিভাগ। আর আতপ চাল সংগ্রহের টার্গেট ছিল ১৮ হাজার ৭৩৮ মেট্রিক টন। সেখানে সংগ্রহ হয়েছে ১১ হাজার ৯৩৪ মেট্রিক টন। চাষিরা যাতে ফসলের মূল্যে না ঠকেন সেজন্য সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। আর সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরুর সঙ্গেই খোলা বাজারে ধানের দাম বেড়ে যায়। চাষিরা ফসলের দামে লাভবান হন। তারপরেও ৩৩ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন ধান সরকারিভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৪২ হাজার ৪৪ মেট্রিক টন।

প্রতিকূল পরিবেশেও চাল সংগ্রহ অভিযানের সফলতার কৌশল জানতে কথা হয় সৈয়দপুর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথোপযুক্তভাবে পালন করতে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মিল মালিকদের সঙ্গে সুসম্পর্কের সমন্বয় গড়ে তুলে। মিল মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টা তাদের অবগত করা হয়। চালকল মালিকরা সন্তুষ্টি হয়ে ক্ষতির শিকার হলেও সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ অব্যাহত রাখে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল ধান চাল সংগ্রহ অভিযানের শেষ দিন।

জানতে চাইলে, মুঠোফোনে কথা হয় রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্যনিয়ন্ত্রক আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি জানান প্রতিকূল পরিবেশেও খাদ্যবিভাগ সংগ্রহ অভিযান সফল করার চেষ্টা করেছে। শতভাগ পূরণ না হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ ভাগ পূরণ হয়েছে। এ মজুদ দিয়েই সরকার সকল খাদ্য দুর্যোগ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ।

আমাদের বাণী ডট কম/২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০/পিপিএম