নীলফামারী জেলা

জিকরুল হক, উত্তরাঞ্চল সংবাদদাতা;  করোনার কারণে নিউজপ্রিন্ট কাগজের চাহিদা দিন দিন বাজারে কমে যাওয়ায় গত সাত দিনের ব্যবধানে উত্তরাঞ্চলের ৭টি পেপার মিল লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে। মিলের তৈরী কাগজে গোডাউন ভর্তি হয়ে আছে। বাজারে ক্রেতা না থাকায় মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে ওইসব কাগজ মিলে লে-অফ ঘোষণা করেছেন। বছরে কমপক্ষে ১৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো ওইসিব মিলে। মিলগুলো লে-অফ ঘোষণা করায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মচারী বেকার হলো। পরোক্ষভাবে জড়িত আরো সাত হাজার মানুষ কর্মের সংস্থান হারালো। সবমিলে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লো।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর লে-অফ ঘোষণা করা হয় নীলফামারী জেলার বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরের ইকু পেপার মিল। এর আগে বগুড়ার রাজা পেপার মিল, বিপিএল পেপার মিল, আজাদ পেপার মিল, হাসান পেপার মিল, কিবরিয়া পেপার মিল ও রংপুরের ভাই ভাই পেপার মিল লে-অফ ঘোষণা করা হয়।
কথা হয় বগুড়ার রাজা পেপার মিলের মালিক খন্দকার মেজবাউল হক রন্টুর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের ছোট মিল মালিকদের সরকার মূল্যায়ন করেন না। করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসব মিলের উৎপাদিত কাগজের শতকরা ৭৫ ভাগ ক্রেতা শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীরা কাগজের ব্যবহার করছে না। ফলে কাগজের বাজারে পুরোপুরি মন্দাভাব শুরু হয়েছে। পত্রিকা মালিকরা আগে যে পরিমাণ কাগজ কিনতো তারাও পূর্বের তুলনায় সিকিভাগ কাগজ কিনছে। প্রিন্ট পত্রিকার সার্কুলেশন আগের তুলনায় এক চতুর্থাংশে নেমে এসেছে। তৈরী কাগজ বাজারে বিক্রি করেই শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকের টাকার সুদ, ভ্যাট, ইনকাম টেক্স, কাঁচামাল সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করতে হয়। সেই বাজারে কাগজ বিক্রি না হলে কত পরিমাণ কাগজ গুদামজাত করে রাখা যায়? সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেই টাকা দুই একজন মিল মালিক পেলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। যা দিয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের এক মাসের বেতন আর ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করাও সম্ভব না।

পেপার মিল লে-অফ ঘোষণার বিষয়ে জানতে কথা হয় উত্তরাঞ্চলের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারিগর ইকু গ্রুপ অব ইন্ডাাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইকু পেপার মিল মালিক আলহাজ্ব সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন ছয় মাসের বেশি সময় ধরে লোকসান দিয়েও মিল চালু রেখেছি। কিন্তু মিলে উৎপাদিত কাগজ বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ছয় মাসের উৎপাদিত কাগজ গোডাউনে পড়ে আছে। কিন্তু প্রতিমাসে শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকের টাকার সুদ, ভ্যাট, ট্যাক্স নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। তার মিলে উৎপাদিত কাগজের বড় ক্রেতা হলো দৈনিক কালেরকন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা কর্তৃপক্ষ। এসব পত্রিকা কর্তৃপক্ষ করোনার পূর্বে যে পরিমাণ কাগজ কিনতো, বর্তমানে তার সিকিভাগও কাগজ কিনছে না। এমন অবস্থায় বাধ্য হয়ে কাগজ মিল ১ অক্টোবর লে-অফ ঘোষণা করি। তার মতে, আমাদের মত উদ্যোক্তারা দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বদ্ধপরিকর। শিল্পের বিকাশ না ঘটলে বেকারত্ব ঘুচবে না। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি আমাদের চলমান অর্থনীতির চাকাকে বজ্রাঘাত করেছে। বন্ধ কাগজ কলগুলোর বিপরীতে কমপক্ষে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ আছে। শতকরা ৯ টাকা হারে ব্যাংকের সুদ গুণতে হয়। তিনি আরো বলেন তার মিলের ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল ২৫ কোটি টাকার বেশি। সরকারের কথা ছিল ওয়ার্কিং ক্যাপিটেলের ৩০ টাকা হারে প্রণোদনার অর্থ দিবে। অথচ আমি প্রণোদনার টাকা পেয়েছি মাত্র ৩০ লাখ টাকা। এ টাকা দিয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের একমাসের বেতন পরিশোধ করাও সম্ভব না। তাছাড়াও ওই প্রণোদনার টাকাও সাড়ে ৪ পার্সেন্ট হারে সুদ দিতে হবে এক বছর। এ সময়ে সুদসহ টাকা পরিশোধ করতে না পারলে সরকার আরো দুই বছর পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি করবে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি করলেও সুদ দিতে হবে ৯ টাকা হারে। তাহলে অবস্থা এমন অবস্থায় ঠেকছে যে, মিল লে-অফ ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের মালিকদের সামনে অন্য কোন পথ খোলা নেই। তাছাড়াও লাভ-লোকসান যাই হোক উৎপাদিত কাগজ বাজারে বিক্রি হলে লেনদেনের একটা প্রবাহ থাকে। এক্ষেত্রে ঘটছে তার উল্টোটা। তার মতে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলোতে কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার কাগজ গুদামে পড়ে আছে।

  রাজশাহীতে চিকিৎসার টাকা না থাকায় কৃষকের আত্মহত্যা

উৎপাদিত পণ্যের বেচাকেনা বন্ধ থাকলে অর্থের প্রবাহ কমে যায়। অবশেষে বন্ধ হয়ে পড়ে অর্থনীতির ঘূর্ণায়মান চাকা। তারপরও তিনি আশা করছেন করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে দেশীয় কাগজের বাজার আবার চাঙ্গা হবে। বন্ধ মিলগুলোতে আবার সাইরেন বেজে উঠবে। শ্রমিক কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মিলগুলোতে আবার প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিবে। তার মতে এ আমার দেশ, আশার বাংলাদেশ।