আমাদের বাণী ডেস্ক, ঢাকাঃ বিশ্বের একাধিক দেশে আছড়ে পড়েছে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ। করোনার দাপটে কার্যত বেসামাল হয়ে গেছে বিশ্বের নানান দেশ। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। বছর ঘুরে গ্রীষ্মের শুরুতে বাংলাদেশে ফিরছে সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো! গত বছর এই সময় সবে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছিল মারণ করোনা। এ বছর শীতের মৌসুমে ভ্যাকসিন হিরো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতায় বাংলাদেশে ভ্যাকসিন আসায় খানিকটা বাগে এলেও নতুন করে সংক্রমণ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এখন করোনাভাইরাস একেবারে সপাটে খেলছে। বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী করোনাগ্রাফ চিন্তা বাড়াচ্ছে।

করোনাগ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী
বাংলাদেশে রোগ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ার তথ্যই বলছে করোনাগ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পরীক্ষা বিবেচনায় আক্রান্তের হার ২ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এলেও এই হার এখন প্রায় ২৩ শতাংশের ঊর্ধ্বে। একদিনে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘এটি মহামারী ভাইরাসের নতুন ঢেউয়ের ইঙ্গিত।’ নতুন করোনার আতঙ্ক নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সম্প্রতি মন্তব্য করেন, ‘প্রতিদিন যদি পাঁচশ’ থেকে এক হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকে তাহলে গোটা ঢাকা শহরকে হাসপাতাল করে ফেললেও রোগী রাখার জায়গা দেওয়া যাবে না।’ ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় অনলাইন জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত কোভিড-১৯ দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্রমাগত অবনতি, সার্বিক পরিস্থিতি, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ও শয্যা বাড়ানোর বিষয়ে বিপিএমসিএর সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘গত এক মাস আগে আক্রান্তের হার ছিল মাত্র দুই শতাংশ। এখন এটি প্রায় ২০ শতাংশে চলে গেছে। এখন দিনে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। এই মুহূর্তে যেসব স্থান থেকে করোনা সৃষ্টি হচ্ছে সেই সব স্থান চিহ্নিত করে করোনার উৎপত্তির উৎস ঠেকাতে না পারলে দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে’।

করোনায় মারা গেছেন কারা
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৮ হাজার ৯৯৪ জনের মধ্যে ৬ হাজার ৭৭৪ জনই পুরুষ এবং ২ হাজার ২২০ জন নারী। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৩০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এছাড়া ২ হাজার ২২৭ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। ১ হাজার ১১ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। ৪৪৪ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ১৭৭ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ৬৭ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। ৩৮ জনের বয়স ১০ বছরের কম। মৃতদের মধ্যে ৫ হাজার ১১৮ জন ঢাকা বিভাগের। ১ হাজার ৬৩১ জন চট্টগ্রাম বিভাগের। ৫০১ জন রাজশাহী বিভাগের। ৫৭৯ জন খুলনা বিভাগের। ২৭৩ জন বরিশাল বিভাগের। ৩১৮ জন সিলেট বিভাগের। ৩৭৩ জন রংপুর বিভাগের এবং ২০১ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। এবার বেশি সংক্রমিত হয়েছে ৩০ জেলা। এই ২৯ জেলা থেকে ঢাকায় আসছে রোগী। ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় রোগী আসায় দুটো সমস্যাও হচ্ছে। প্রথমত ঢাকার ওপর চাপ পড়ে এবং দূর থেকে রোগী আসায় আস্তে আস্তে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাই ঢাকার বাইরেও চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সরকার থেকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

হঠাৎ করোনা বেশি কেন
রূপ বদলানো করোনাভাইরাসের দাপট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে করোনার ব্রিটেন স্ট্রেইনের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। দেশে এখন পর্যন্ত কয়েক জনের শরীরে মিলেছে ইংল্যান্ডের শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের নতুন ধরনÑ বিলিতি স্ট্রেইন। যেগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা ও মৃত্যুহার দুটোই অনেক বেশি। এর দাপটে করোনার এবারের দ্বিতীয় ঢেউ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার (জিনোম সিকোয়েন্স) বদলের কারণে দ্রুতহারে আক্রান্ত বেড়েছে। এ ভাইরাসের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা খুবই কঠিন। সে বারবার চেঞ্জ করে তার চরিত্র। যখনই সে বাধা পায়, তখনই সে তার রূপ চেঞ্জ করে। গতবারের করোনাভাইরাস (চীন ভ্যারিয়েন্ট) আর এবারেরটা আফ্রিকা ও ব্রিটেন ভ্যারিয়েন্ট এক নয়। গত বছরের ভাইরাসের গতিবিধি, আর আজকের করোনাভাইরাসের গতিবিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানেরটাকে আটকানো বেশ জটিল। কারণ এটা অ্যান্টিবডিকে বাইপাস বা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে অতিক্রম করা শিখে গেছে। প্রতিনিয়ত মিউটেশন পরিবর্তন করে অভ্যস্ত হয়েছে। একবার সে ইমিউন সিস্টেমকে ভেঙেছে, সুতরাং সামনে আবার যখন ডিফেন্স সিস্টেম পাবে তখনই ভাঙবে। এভাবে করোনা প্রবহমান হয়ে চলতে থাকতে পারে। বাংলাদেশে যে মিউটেশন হচ্ছে, একবার হয়েছে আবার যে হবে না বা হচ্ছে যে না, তা বলা যাবে না। যখনই বাধাগ্রস্ত হয়, তখন চেঞ্জ করে। মানে যত বেশি অ্যান্টিবডি আসবে, তত বেশি চেঞ্জ করবে। অ্যান্টিবডির প্রতিরোধে বেশিরভাগ ভাইরাস মারা যাবে তা সত্যি। কিন্তু যে দু-একটা বেঁচে থাকবে তারা রূপ পরিবর্তন করবে এবং ভয়ঙ্কর আকারে ছড়িয়ে পড়বে। জানা যায়, গত এক বছরে বাংলাদেশের অনেকের হার্ড ইমিউনিটি বেড়েছে। ব্রিটেনে ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৯ শতাংশ, সুইডেনে ৫ শতাংশ, ভারতে ৪৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ৫০ শতাংশের মতো ইমিউনিটি বেড়েছে। এখন যদি বিশাল জনসংখ্যার যাদের মধ্যে ইমিউনিটি রয়েছে, এর মধ্যে যদি ভাইরাসটা টিকে থাকতে পারে, তাহলে কিন্তু চিন্তার বিষয় রয়েছে। কারণ ভাইরাস একটা সাইক্লোনের মতো এসে ধীরে ধীরে কমে গেছে। কিন্তু এখন যে ভাইরাস বাংলাদেশে এসেছে বা অন্য দেশে হচ্ছে, এই ভাইরাসটি প্রতিরোধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার মতো শক্তি সঞ্চয় করে ফেলেছে। এই শক্তি সঞ্চয় করায় তার গতিপথ আর সরল নেই। বাঁকা হয়ে গেছে। প্রতিরোধ পেলেই সে আরও অতিক্রম করতে পারবে। সে কারণেই এটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা খুব দুষ্কর।

ভয়াবহ বিপদের মুখে
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না, আমরা ক্রমেই কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সামনে বাংলাদেশে করোনার এই ক্ষিপ্রগতিতে ছড়ানোর আশঙ্কা আরও অনেক বেশি। যখন দেশে করোনাভাইরাস কমতে শুরু করেছিল, তখন আমরাও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমগুলোও কমাতে শুরু করেছি। যার অনিবার্য ফল হিসেবে বর্তমানে একটা ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছি। আমরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ের মুখোমুখি। এই অবস্থায় আতঙ্কিত মানুষজন ছুটছেন ভ্যাকসিন নিতে। প্রথম ডোজ শেষের দিকে, তাই দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করেই পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন পরিস্থিতিতে ঘরে থাকা, লকডাউনের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপই অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কারণ টিকা প্রদানের হার অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপের অনেক দেশেই ভাইরাসের এসব ধরনকে সামাল দিতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, প্রথম দফা সংক্রমণের চেয়ে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ বহুগুণে শক্তিশালী। আগের সংক্রমণে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণকে অবহেলা করা হলে অনেক বড় ভুল করা হবে। এখনই বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নাই অবস্থা। করোনা রোগীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি আইসিইউ চিকিৎসাসেবা নাগালের বাইরে চলে গেছে। সংক্রমণ এভাবে বাড়তে থাকলে রীতিমতো বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হবে। সারা বিশ্বেই চাহিদা অনুযায়ী টিকার সরবরাহ নেই। অনেক দেশ এখনো টিকা প্রদান কর্মসূচি শুরুই করতে পারেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ যে চাহিদা অনুযায়ী টিকা পাবেই তারও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। আর টিকা দিলেই যে করোনায় আক্রান্ত হবে না, এমনও নয়। তাই টিকা নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশের জরুরি হলো, যার যার ব্যক্তিগত সুরক্ষা। যাতে তিনি রোগটায় আক্রান্ত না হন। তিনি এবং তার পরিবার আক্রান্ত হলে ক্ষতিটা তারই হবে।

  মার্কিন মুল্লুকে বর্ণবাদবিরোধী জোয়ার, প্রতিবাদ-প্রতিরোধই মুক্তি

করণীয় কী
এই অবস্থায় করোনা পরীক্ষায় কোনো শৈথিল্য দেখালে চলবে না। সামান্য জ্বর-সর্দির সমস্যা থাকলেও সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচায় লালারস পরীক্ষা করতে হবে। বর্তমানে যে পরীক্ষা হচ্ছে, তা কম হচ্ছে। অবিলম্বে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা আরও অনেক বাড়াতে হবে। পরীক্ষা বাড়ালে অ্যাকটিভ করোনা রোগী অকল্পনীয় বেড়ে যাবে। করোনা রোগীরা যাতে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে, তার সব ব্যবস্থা তৈরি রাখতে হবে। সংক্রমিত ব্যক্তির যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে। কেবল রোগীকে নয়, কেউ সংক্রমিত হলে তার সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে এবং অবশিষ্ট সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। কোয়ারান্টিন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা আরও অনেক কঠোরভাবে বাড়াতে হবে। যাতে করে তাদের কারণে অন্যের সংক্রমণ না বাড়ে। এছাড়াও করোনার ওষুধ ও অক্সিজেনের মজুত বাড়াতে হবে। আইসিইউ ব্যবস্থাসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুযোগ আরও অনেক বাড়াতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবামূল্য যৌক্তিক করতে হবে। যেসব স্বাস্থ্যকর্মী চিকিৎসক ও নার্স বিগত বছরে বেশি সময় কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করেছেন, তাদের আবার কাজে ফিরিয়ে এনে অন্য নার্সদের ফের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞদের ফের নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকল্পনাগুলো অবশ্যই স্মার্ট, বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে এবং সবার আগে স্বাস্থ্য খাতে নজর দিতে হবে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদন চালু ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে আবারও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

করোনা কাউকেই ক্ষমা করে না
করোনার প্রভাব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পরিস্থিতি শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা কঠিন। গবেষকরা বলছেন, ‘বর্তমানে করোনাভাইরাসকে সহজভাবে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ঢিলেঢালা ভাব ও মানুষের মধ্যে অসচেতনতার ফলে যেকোনো সময় করোনার সংক্রমণ হু হু করে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় যে খোলেনি, এটা ভালো কাজ হয়েছে। আগের মতো আবার জীবন আর জীবিকা কিছুদিন স্থগিত না করে উপায় নেই। অর্থনৈতিক লাভালাভের হিসেব ভুলে সকলে মিলে অসামান্য দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় উৎপাদনমুখী কাজগুলো চালু করে, অল্পে সন্তুষ্ট থেকে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে, সামাজিক দূরত্ব মেনে, ঘরে বসে থেকে, বাইরে বের না হয়ে প্রতিরোধ দুর্গ টিকিয়ে রাখা দরকার। এজন্য আগামী দিনে বিভিন্ন সময়ে যেসব সরকারি সতর্কবার্তা দেওয়া হবে, তা যথাযথ মেনে চলতে হবে। তাতে যদি নিজেদের অনেকটা বদলেও নিতে হয় তা হলেও মেনে নিতে হবে। আমাদের জীবন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

কারফিউ কেন দরকার
কারফিউ শব্দটা রাজনৈতিক বাঙালির সংস্কৃতি। সংকটকালীন আস্থার এক শব্দ। আমাদের দেশের মানুষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে কারফিউর সঙ্গে পরিচিত। এই কারফিউর মূল লক্ষ্য সেনাবাহিনী কর্তৃক জনস্বার্থে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ। উন্নত দেশে লকডাউন মানে কারফিউর আরেক নাম। বর্তমান করোনা সংকটকালে দেশের আপামর জনতাও চায় রোগ মোকাবিলায় কঠোর কারফিউ দেওয়া হোক। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে পৃথিবীর দেশে দেশে কারফিউ স্টাইলে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব নিয়ে লকডাউন হচ্ছে। এভাবে মানুষের অপ্রয়োজনীয় চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ সফল হয়েছে যারা, তারা সফল হয়েছে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধেও। আমাদের জনবহুল বাংলাদেশে গতানুগতিক লকডাউনে মোটেও কাজ হবে না। জীবিকা রক্ষায় মানুষ পায়ে হেঁটে ঢাকা রওনা হয়ে যায়। তাছাড়া একবার চিচিং ফাঁক হয়ে গেলে, চিচিং বন্ধ করা, মানুষকে ঘরে ঢোকানোর কাজ আরও কঠিন। সরকারের ওপর মহল থেকে যতই বারবার করে বলা হোক, করোনা থেকে নিজে বাঁচতে এবং বাকিদের বাঁচাতে ঘরে থাকতে। আমরা নিজেরা কি সেকথা শুনি? মাস্ক না থাকার কতই না বাহানা অজুহাত দেখাইÑ অজুহাত মাস্টার বাঙালি! কিন্তু করোনা অজুহাত মানে না। ভাইরাস জীবন্ত কোষ ছাড়া বাঁচে না। সুতরাং কঠোর লকডাউনে মানুষকে ঘরে আটকে রেখে জীবন্ত কোষের বাইরে ১৪ দিন রাখা যায়, তাহলে মারা যায় ভাইরাস। এভাবে করোনাকে হোমলেস (গৃহহীন) করতে হবে। হোমলেস করার এখন একটাই পথ করোনা হোক বা না হোক কিংবা টিকা নেওয়া হোক বা না হোক, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। ঘরে থাকার কঠোর কারফিউ লড়াই এই ভাইরাসকে একমাত্র হারাতে পারে। একমাত্র ভরসা কারফিউ বা কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে মানুষকে ঘরে রাখা। ক্ষয়ক্ষতি, কষ্ট হলেও বৃহৎ স্বার্থে, সকলের ভালোর জন্য কারফিউ দেওয়া দরকার। জনগণের জীবন রক্ষার্থে কঠোর যুদ্ধের মতো হওয়ার বিকল্প নেই। দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেÑ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী দিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে ঘরে থাকার বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য করানো ছাড়া গত্যন্তর নেই। মেঘনাদের মতো অন্তরালে থেকে ছোঁয়াচ বাঁচিয়েই করোনাকে কাবু করা বুদ্ধিমানের কাজ।

এখন কতদিন এবং কতটা সতর্ক হয়ে কারফিউ লড়াই বা লকডাউন টিকিয়ে রাখতে পারবে বাংলাদেশ? তার ওপর নির্ধারিত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ। হয়তো ‘আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী’ ব্যর্থ করে দেওয়ার কাজটাও শুরু হবে কারফিউ লড়াই লকডাউন থেকেই।

আমরা এখনই যদি কারফিউ দিয়ে মানুষকে ঘরে আটকাতে না পারি, করোনাভাইরাসের রাশ টেনে ধরতে না পারি, তাহলে আমাদের অনেক জীবন দিয়ে, অর্থ দিয়ে, স্বাস্থ্য, ভোগান্তি দিয়ে এবং জাতীয় অর্থনীতির বহু ক্ষতি দিয়ে আমাদের সেই দায় শোধ করতে হবে। তাই আসুন, সকল ভেদজ্ঞান ভুলে সরকারের সকল কাজে একত্রিত হয়ে সকলকে সহযোগিতা করি। এখন ভয়াবহ করোনাকাল। মহামারীর চরম সময়। সম্মিলিতভাবে মহামারী সংকট মোকাবিলার বিকল্প নেই।

শেখ আনোয়ার : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক

আমাদেরবাণী/মৃধা