কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা; করোনা সংক্রমণের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেসরকারি শিক্ষকদের দুঃখ-দুরবস্থা, আর্থিক টানাপোড়েন। এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকট ও বিপদে আছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। সরকারের কাছ থেকে এমনিতেই কোনো বেতন-ভাতা পান না এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। তাই বেতন না পাওয়া এই শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি নানা পেশায় জড়িয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের সে উপার্জনও বন্ধ হয়ে গেছে।

  • কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের মাসিক বেতন, টিউশন ফি সংগ্রহ করেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হতো। এখন স্কুল বন্ধ থাকায় টিউশন ফিও নিতে পারছে না। সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী। করোনা পরিস্থিতি আরো দীর্ঘ হলে অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে এবং বেকার হবে কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত সারাদেশে প্রায় ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলে প্লে-গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। কিছু কিন্ডারগার্টেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ায়। এখানে লেখাপড়া করছে ১ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী। স্কুলগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৬ লাখ। করোনাভাইরাসের কারণে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতনের ওপর নির্ভর করেই শিক্ষকদের বেতন ও বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে হয়। এখন স্কুল বন্ধ থাকায় টিউশন ফিও নিতে পারছে না।

  • এসময়ে প্রাইভেট টিউশনও বন্ধ হওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে। ফলে দুর্বিষহ কষ্টে পড়ে গেছেন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ও কর্মচারীরা। ইতোমধ্যে ছুটি ৬ আগস্ট পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ধাপে ধাপে ছুটি আরো বাড়তে পারে। তাতে কিন্ডারগার্টেন স্কুল শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আরো করুণ অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হতে পারে। তারা বাঁচার তাগিদে প্রণোদনা চান সরকারের কাছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, কেজি স্কুলে শিক্ষকতা ও প্রাইভেট পড়িয়ে কোনো রকম পরিবারের খরচ সামাল দিচ্ছি। এমনিতেই কেজি স্কুল থেকে ঠিকভাবে বেতন পাই না তার ওপর করোনায় লকডাউন। ফলে আর্থিক অস্বচ্ছল শিক্ষকদের পরিবারে অভাব অনটন চলছে। চক্ষু লজ্জার ভয়ে কাউকে বলতেও পারছি না আবার সইতেও পারছি না। তাই সরকার এবং সমাজের বিত্তবান মানুষরা যেন আমাদের কষ্টটা একটু বোঝার চেষ্টা করেন।

  • ঢাকার হাজারীবাগ প্রতিভাস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুলের পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমাদের শিক্ষকদের বেতন, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য বিল বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ খরচ আছে। এখন পরিশোধ করতে পারছি না। ফলে চরম দুরবস্থায় আছি।

রাজশাহীর তানোর পৌরশহরের তানোর প্রি ক্যাডেট কেজি স্কুলের পরিচালক দেলুয়ার হোসেন ও অর্কিড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এরফান আলী সরকার বলেন, আমাদের কেজি স্কুলের শিক্ষকরা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। এই দুর্যোগ মুহূর্তে এখন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষকরা সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের পরিবারে হাহাকার বিরাজ করছে। চলমান দুর্যোগে আমাদের শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি সহায়তার আবেদন জানাচ্ছি।

  ঢাবিতে ভর্তির জন্য সেই তনুশ্রীকে টাকা দিলেন ডিসি
  • কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, বেকারত্ব ঘোচাতে অনেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লায় কিন্ডারগার্টেন চালু করেছিলেন। অনেকে এটিকে ব্যবসা হিসেবেও নিয়েছিলেন। কিন্ডারগার্টেন মালিকরা বলছেন, কে জানত করোনার সময় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই কিন্ডারগার্টেন স্কুল পুরোপুরি বন্ধের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

বাড্ডার মুনলাইট কিন্ডারগার্টেন স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে মালিকপক্ষ। অধ্যক্ষ জেসি আক্তার বলেন, আমরা কষ্ট করে স্কুলটি চালিয়েছি। বাড়ি ভাড়া দিতে হয় মাসে ২০ হাজার টাকা। কয়েক মাসের ভাড়া বাকি রয়েছে। করোনার এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের বেতনই দিতে পারছি না। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে স্কুল পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

  • বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের প্রায় ৮০ভাগ বেসরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে এবং তাতে এক কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। স্কুল খোলার পরও যে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে আসার কথা, খরচ বহন করার অপারগতার জন্য তারা হয়ত স্কুলে আসবে না। কারণ যেসব ছাত্র-ছাত্রী কিন্ডারগার্টেনগুলোতে পড়াশোনা করে তাদের অধিকাংশ অভিভাবক নিম্ন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ আয়ের লোক। এ দুর্যোগের পরে তাদের অনেকে সংসার চালাতেই অক্ষম হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো আরো বেশি সংকটে পড়ে যাবে এবং অনেক পরিচালক তাদের স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।

তিনি আরো জানান, আমরা ৬ লাখ শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি ফেসবুকে পোস্ট করেছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠিতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের এমন সংকটের সময় আমরা তাকিয়ে আছি প্রধানমন্ত্রীর দিকে। এই মুহূর্তে আমরা আপনার প্রণোদনা প্রত্যাশী। আমাদের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করুন। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখুন।

  • বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারা ভূঞা বলেন, অভিভাবকরা টিউশন ফি দিচ্ছেন না, তাই আমরাও শিক্ষকদের বেতন, বাড়ি ভাড়া দিতে পারছি না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা চেয়েছি। সরকার আমাদের সহায়তা না করলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় থাকবে না।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, কারোনার সময় চাপ দিয়ে টিউশন ফি আদায় না করার জন্য বলা হয়েছে। তবে সচ্ছল অভিভাবকদের কাছ থেকে টিউশন ফি না নিলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কীভাবে হবে? এই বিষয়টি সচ্ছল অভিভাবকদের ভাবা উচিত। কারণ, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপরেই চলে।

আমাদের বাণী ডট কম/২৪ জুন ২০২০/পিপিএম