Shadow

কুষ্টিয়ায় ভুল অপারেশনে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু: চিকিৎসক আটক

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কুষ্টিয়া জেলা সংবাদদাতা: কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গত শনিবার ১লা আগস্ট, ঈদের দিন রাত্রে ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তানিয়া খাতুন (২১) এক প্রসূত মায়ের ভুল অপারেশনে মৃত্যু হয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ অপারেশনকারী ডাক্তার আবু সাঈদ সিদ্দিককে আটক করেছে।

এ ঘটনায় নিহত তানিয়া খাতুনের স্বামী আলী আকবর বাদী হয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় ৫জনকে আসামী করে একটি মামলা করেছে। মামলার আসামী কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া মৃত মহিউদ্দিনের ছেলে ডাঃ আবু সাঈদ সিদ্দিকী, কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মালিক মশিউর রহমান নিজাম, মেডিকেল এ্যাস্টিটেন্ট নয়ন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স পাপিয়া খাতুন, ক্লিনিক দালাল রেজাউল ইসলাম।

নিহত তানিয়া খাতুনের লাশ পুলিশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে মর্গে রাখা হয়েছে। অসুস্থ শিশুকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আইসিতে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে নিহত তানিয়া খাতুনের স্বামী কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রাম গ্রামের আলী আকবর জানান, গত ২৩ জুলাই কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দালাল বটতৈল শিশিুরমাঠ এলাকার রেজাউল ইসলামের মাধ্যমে এই ক্লিনিকে আমার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখালে এই ডাক্তার ১০ আগস্ট আমার সন্তান হওয়ার সম্ভাব্য সময় দেয়। হঠাৎ ঈদের দিন শনিবার সন্ধ্যায় তানিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করি।

ক্লিনিকের মালিক মশিউর রহমান নিজাম বলেন, দ্রুত সিজার করতে হবে ১৭ হাজার টাকা লাগবে। আমরা তাতে রাজী হয়। বলেন ২ প্যাকেট বি পজেটিভ রক্ত লাগবে। আমার স্ত্রীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেয়ে আধা ঘন্টা পর এক ছেলে সন্তান আমার কোলে দেয়। এর এক ঘন্টা পর ডাক্তার ও তার সাথে থাকা নার্স আমাকে ডেকে বলে, দ্রত আপনার স্ত্রীকে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করতে হবে। এর আগেই ক্লিনিকের মালিক নিজাম গোপনে এ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিয়ে আসে। রোগী গায়ে হাত দিয়ে দেখতে পায় ঠান্ডা এবং নিশ্বব্দ। ডাক্তারকে বললে তিনি জানান, অজ্ঞান করা হয়েছে পরে ঠিক হয়ে যাবে। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নিহত তানিয়াকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এন কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত্যু ঘোষণা করেন। এ সময় আমার বাচ্চাকে এই হাসপাতারেই ভর্তি করি। আমার স্ত্রী তানিয়া খাতুন কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ওটিতেই মারা যায়। তাৎক্ষনিক আমি কুষ্টিয়া মডেল থানায় গিয়ে অভিযোগ করলে পুলিশ ঘাতক ডাক্তার ডাঃ আবু সাঈদ সিদ্দিকীকে আকটক করেছে। এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম মোস্তফার সাথে কথা বলে, তিনি জানান, রাতে থানার অফিসার (তদন্ত) আননুর যায়েদের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ডাক্তারকে আটক করা হয়। বাকি চার আসামী ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্লিনিকের মালিক মশিউর রহমান নিজামের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি বলেন, নাতি ছেলে অসুস্থ চুয়াডাঙ্গায় আছি। তবে ঘটনা সব শুনেছি। পুলিশ ডাক্তারকে আটক করেছে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্লিনিকের লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল।

  পানির নিচে পানি উন্নয়ন বোর্ড

উলে­খ, কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলো চলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে। আর এসব অননুমোদিত হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে রুগী ও রুগীর আত্মীয় স্বজনরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা সংলগ্ন গড়ে উঠেছে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। হাসপাতালটির নেই কোনো জরুরি বিভাগ, নেই রোগ নির্ণয়ের মানসম্মত কোনো যন্ত্রপাতি বা ল্যাব টেকনোলজিস্ট। ধার করা পার্টটাইম কতিপয় ভুয়া ডাক্তার দিয়ে চলছে জটিল কঠিন অপারেশনসহ নানা রোগের চিকিৎসা।

স্থানীয়রা জানায়, সরকারি হাসপাতাল, ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র,কমিউনিটি ক্লিনিক ও এক শ্রেণীর পল্লী চিকিৎসক রোগী ধরা দালাল হিসেবে কাজ করছে। রোগী প্রতি কমিশনের আশায় এসব দালালরা। অভিনব কৌশল ও প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে তথাকথিত এই হাসপাতালে ভর্তি করছে। ফলে সার্বক্ষনিক চিকিৎসক ছাড়াই এই হাসপাতাল চললেও তাদের রোগীর অভাব হচ্ছে না। চিকিৎসার নামে প্রতি নিয়ত চলছে অপচিকিৎসা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিক-কর্মচারীরা চিকিৎসক সেজে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্থানীয়রা এ হাসপাতালটিতে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার জন্য সংশি­ষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সংশি­ষ্ট সুত্রে জানা গেছে, সরকারিবিধি মোতাবেক প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগণষ্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল পরিচালনা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিস অনুমতিপত্র, পারমাণবিক শক্তি কমিশনের অনুমতিপত্র, আয়কর-ভ্যাট, ডিপ্লোমা নার্স ও প্যাথলজি ডিপ্লোমাধারী সার্বক্ষণিক এমবিবিএস চিকিৎসক অবশ্যই থাকতে হবে। এ ছাড়াও ১৯৮২ সালের ‘দ্য মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড লাবরেটরিজ রেগুলেশন’ অনুযায়ী ১০ শয্যাবিশিষ্ট কোন হাসপাতালের জন্য জরুরি বিভাগে তিনজন স্থায়ী চিকিৎসা কর্মকর্তা, তিনজন ডিপ্লোমাধারী জ্যেষ্ঠ সেবিকা, তিনজন কনিষ্ঠ সেবিকা, তিনজন আয়া, তিনজন ওয়ার্ডবয়, একজন ব্যবস্থাপক, দু’জন পাহাদার, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্ত্রপাচার কক্ষ (অপারেশন থিয়েটার) না থাকলে সেখানে কোনো রোগীর অস্ত্রপাচার (অপারেশন) করা যাবে না বলে শর্ত দেয়া রয়েছে। কিন্তু সংশি­ষ্ট বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারির যোগসাজশে এই হাসপাতালটির মালিক নিয়মনীতি লক্সঘন করে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

আমাদের বাণী ডট কম/০২ আগস্ট ২০২০/পিপিএম

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •