নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুরঃ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ২৭ নং ওয়ার্ড লক্ষ্মীপুরা এবং চান্দনা নিয়ে গঠিত। এই এলাকাটি এক সময়ে প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চল হলেও আধুনিক নগরায়নের ফলে বিভিন্ন জেলার শান্তিপ্রিয় নতুন মানুষ এই ওয়ার্ডে জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। মোঃ রফিক (ছদ্মনাম) তিনিও দীর্ঘদিন গাজীপুর শহরে ব্যবসা করে আসছেন। গাজীপুর সদর থেকে মাত্র মাইল পথের ব্যবধানে তিনিও স্থায়ী নিবাস গড়ার জন্য জমি কেনেন লক্ষ্মীপুরায়। জমি কিনলেও বিপত্তি বাঁধে ভবন নির্মাণে। এলাকার মাস্তানদের চাঁদা না দিলে ভবন নির্মাণ করতে দেয়া হবে না বলে ছাপ জানিয়ে দেয়া হয়। সাধ্যমত চাঁদা দিয়ে তিনি পাঁচ তলা ভবন নির্মান করেন।

তবে চাঁদা দিয়ে ভবন নির্মাণ করলেও ভয়ে প্রকাশ্যে এই চাঁদাবজদের বিরুদ্ধে তিনি কিছু বলতে সাহস পাননি। মোঃ রফিক নামের ঐ ব্যক্তির ভাষ্য, আপনি সংবাদ ছাপালে হয়ত তাদের এখানে কিছু দৌড়াত্ম কমবে পরে আমার উপর যে ধকল যাবে সেটা ঠেকাবে কে? মোঃ রফিক (ছদ্মনাম) চাঁদা দিয়ে ভবন নির্মাণ করলেও অনেকের সাধ থাকলেও সাধ্য নেই এই গ্রুপকে চাঁদা দিয়ে ভবন নির্মাণের।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (সার্ডি) এর মত বড় বড় নামি প্রতিষ্ঠান নিয়ে এই ওয়ার্ড গঠিত হলেও এলাকাটি আলোচিত অনেকটাই মাদকের সাম্রাজ্য হিসেবে। লক্ষীপুরা এবং পূর্ব চান্দনার আংশিক অংশে ভয়াবহভাবে ছড়িয়েছে মাদকের সাম্রাজ্য।

অনুসন্ধানে জমিতে ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজী, অন্যের জমি জবর দখল থেকে শুরু করে মাদক সাম্রাজ্যের বিস্তারে এবং মাদক সেবনে যে নামটা সবার উপরে ওঠে এসেছে তিনি আর কেউ নন এই ওয়ার্ডেরই এক সময়ের অবিভাবক। অর্থ্যাৎ এক সময়ের কাউন্সিলর আব্দুল মতিন যাকে সবাই মতি কমিশনার বলেই চেনে।

মতি কমিশনার এক সময়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতি দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতি সক্রিয় হন। এরপর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি থেকে ডিগবাজী দিয়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তবে রাজনীতিতে বিভিন্ন দলে তার নিমন্ত্রণহীন বিচরণ ভূমি দেখে আওয়ালীগে মেলেনি কোন পদ পদবী। ২০১৩ সালের গাজীপুর সিটি নির্বাচন ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে হয়েছে তাকে। তবে মাদকাশক্ত এবং মাদক বাণিজ্য ও এলাকার চাঁদাবাজ খ্যাতি থাকায় ভোটে তেমন সাড়া পাননি ভোটারদের। সর্বশেষ ২০১৮ সালের গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও কাউন্সিলর পদে মতি কমিশনার তাঁর নির্বাচনী তহবিলে প্রতি দোকান থেকে দুই হাজার করে বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায় করেন যেটা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৭ নং ওয়ার্ডের একাধিক দোকান মালিক জানিয়েছেন।

মতি কমিশনারের বাসায় মদের আসর ও অশ্লীল ডিজে পার্টটি। ছবিঃ ভিডিও থেকে সংগৃহীত 

অসংখ্য নারী কেলেংকারীর নায়ক পাঁচ পাঁচ টি বিয়ে করা মতি কমিশনার এখন সংসার করছেন তার পঞ্চম স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপিকে নিয়ে। আগের স্ত্রীদের দিয়ে মাদক ব্যবসায়ে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে তাকে ছেড়ে গেছেন আগের সব স্ত্রীরা। মাদকে মতি কমিশনার সাম্রাজ্য বিস্তারে এবং দখলবাজীতে তাঁর পঞ্চম স্ত্রী যেন আরও শক্তিবান। লক্ষ্মীপুরায় মতি কমিশনারের নিজস্ব পাঁচ তলা ভবনে চলে মাদকের আড্ডা ও অল্প বয়সী সুন্দর মেয়েদের নিয়ে অশ্লীল ডিজে পার্টি। প্রকাশ্যে অবৈধ আগ্নেয় অস্ত্র ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোকজন নিয়ে চলাফেরা করায় তাঁর বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে সাহস পাননা স্থানীয়রা।

মতি কমিশনারের বাসায় মদের আসর ও অশ্লীল ডিজে পার্টি। ছবিঃ ভিডিও থেকে সংগৃহীত 

অনুসন্ধানে মাদকের আখড়া বসানো ও সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ডিজে পার্টি করানোর দুইটা ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে।
মতি কমিশনারের বিরুদ্ধে তাঁর আপন ভাই মোঃ ইমাম আলীর অর্থ আত্মসাৎ, আপন খালাত ভাই ডাঃ সিরাজের জমি দখল, তাঁর পঞ্চম স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপিকে দিয়ে পপির বিধবা খালাতো বোন ফাতেমা বেগমের জমি জবর দখলের পাঁয়তারাও করছেন তিনি বলে অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে। ফাতেমা বেগমের এই জমি মতি কমিশনার পাঁচ তলা ভবনের সাথে লাগোয়া। শুধু পরিচিতদের মধ্যেই নয় এমন অসংখ্য জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে কমিশনার মতির বিরুদ্ধে।

মদ পান করছেন ও অশ্লীল ডিজে পার্টিতে মেতে আছেন মতি কমিশনার। ছবিঃ ভিডিও থেকে সংগৃহীত 

অনুসন্ধানে ফাতেমা বেগম জিএমপি পুলিশ কমাশনার বরাবর অভিযোগ ও জিমপি সদর থানায় জিডি এবং বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গাজীপুরের দায়ের কৃত মামলার বিবরণীতে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মতি কমিশনারের পাঁচ তলা ভবনের সাথে লাগোয়া ১০.৫০ শতাংশ জমি মতি কমিশনার ও তাঁর স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপি জবর দখল করার জন্য কতিপয় সন্ত্রাসী নিয়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছেন। এবং জমি থেকে চলে যেতে ভয় দেখিয়ে আসছে। একই সাথে বিভিন্ন ভাবে জমিতে স্থাপিত বসতভিটার ক্ষতিসাধান করে আসছে।

এ বিষয়ে ফাতেমা বেগম জানান, ২০০৫ সালে আমার স্বামী মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পরই মতি কমিশনার আমার জন্য এক ভীতি। আমার জমি দখল করার জন্য এহেন কোন কাজ নাই তিনি চেষ্টা করেননাই। এই সর্বশেষ চার পাঁচ মাস আগে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয় মতি, তাঁর স্ত্রী পপি এবং বেশ কিছু সন্ত্রাসীরা। আমি তখন বাধ্য হয়ে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা নিয়ে কোন রকম ঘরে বাস করছে। স্বামী নেই এক ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এ জমি তাদের নামে লিখে না দিলে আমার ছেলেকে নিয়ে কিভাবে এখানে থাকি সেই হুমকি সব সময়ই দিয়ে আসছে। আমি পুলিশ কমিশনার, জিএমপি সদর থানায় অভিযোগ এবং আদালতে মামলা করেছি যা চলমান। জানিনা একজন নারী হয়ে এই সন্ত্রাসীদের সাথে লড়াই করে কতদিন স্বামীর ভিটামাটি রক্ষা করতে পারব।

  কুড়িগ্রামে ছাত্র শিবিরের ৬ নেতা কর্মী গ্রেফতার

মতি-পপি দম্পতির অত্যাচার থেকে বাঁচতে ও স্বামীর ভিটেমাটি রক্ষায় অন্য কোন উপায়ন্ত না পেয়ে গত ২৬ এপ্রিল গাজীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন বিধবা ফাতেমা বেগম।

আরও পড়ুনঃ মতি-পপি দম্পতির অত্যাচার থেকে বাঁচতে চান এক অসহায় বিধবা নারী

এদিকে লক্ষ্মীপুরায় অবস্থিত রাজধানী ঢাকার জৈনিক জাহিদ নামের এক ব্যক্তির জায়গা দখল করে রিকশার গ্যারাজ নির্মাণ করে তা ভাড়ায় পরিচালনা করছে মতি কমিশনার। তবে সরেজমিনে দখলকৃত রিকশা গ্যারেজ দেখা গেলেও এই এলাকায় বসবাস না করায় জাহিদ নামের ঐ ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অন্যের জমি দখল করে রিকশা গ্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

জমি বিক্রি করে এবং তা রেজিস্ট্রেশন করে দিলেও এখনও তাঁর টাকা না দিয়ে উল্টো গালাগালি করছে মতি কমিশনার ও তাঁর স্ত্রী পপি জানিয়ে মতি কমিশনার আপন বড় ভাই মোঃ ইমাম আলী জানান, শুধু আমার টাকাই নয় কত মানুষ যে মতির (মতি কমিশনার) কাছে টাকা পাবে তাঁর ঠিক নাই। জমি দখল, নতুন ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজি, ভবানীপুর পিঙ্গাইল এলাকায় সরকারি খাস জমি দখল এমনকি আমাদের এই অঞ্চলটাকে মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে মতি ও তাঁর স্ত্রী পপি। অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে ঘুরাঘুরি করায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস করেনা। আমাদের আপন খালাতো ভাই গাজীপুরের নামকরা ডাক্তার সিরাজের জমিও দখল করে রেখেছে মতি ।

তিনি আরও বলেন, একাধিক বিয়ে করে পঞ্চম স্ত্রী নিয়ে বাস করলেও তাঁর বাসায় মাদক ও নেশা সামগ্রীর পশরা বসিয়ে অশ্লীল নারীদের নিয়ে মজলিশ বসায়। মদ, গাঁজা, ইয়াবা সেবন ও যৌনাচার থেকে শুরু করে এহেন কোন অপকর্ম নেই যে ঐ মজলিশে চলে না। আগের সব স্ত্রীদের দিয়ে মাদকের কারবারি চালাতে বাধ্য করেছে।

এ বিষয়ে জানতে আব্দুল মতিন ওরফে মতি কমিশনারের মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি অসুস্থ্য থাকার কথা জানিয়ে তাঁর স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপি এবিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।

পরপর্তীতে আমাদের বাণী ডট কম এর পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মতি কমিশনার পঞ্চম স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপি জানান, তাঁর স্বামী অসুস্থ্য। তাই তিনি কথা বলতে পারছেন না। ফাতেমা বেগমের জমি ও বাড়ি দখল নেওয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই জমি আমরা কিনেছি। এটাই ফাতেমা বেগমই দখল করে রেখেছে। আমাদের কাছে জমির কাগজ আছেন। কিভাবে কিনেছেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ফাতেমা বেগমের প্রয়াত স্বামীর আগের স্ত্রীর সন্তানের নিকট থেকে আমরা কিনেছি জমিটা। আপনারা চাইলে কাগজ দেখতে পারেন।  ফাতেমা বেগম তাঁর স্বামীর জমি সেই ২০০৫ সাল থেকে খাজনা দিয়ে আসছেন এবং আপনি যাদের কাছ থেকে জমি কেনার কথা বলেছেন তারা এরকম কোন পেপারে সই করেনি বলে আমাদের জানিয়েছেন এবিষয়ে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।  ফাতেমা বেগমকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তিনি জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এ ফোন করে পুলিশের সহায়তায় পুনরায় বাসায় উঠেন প্রসঙ্গে বলেন, এমন কোন ঘটনা ঘটেনি বরং আমি নিজে ফাতেমা বেগমকে সহায়তা করেছি।

জাহিদ নামের ব্যক্তির জমি দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরকম কোন জমি তারা দখল করে নি রিকশা গ্যারেজ করেছে স্থানীয় এক ব্যক্তির জমি ভাড়া নিয়ে।

বাসায় অশ্লিল ডিজে পার্টি ও মাদক সেবন ও মাদক বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন,  এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি। দুইটি ভিডিও বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরকম কোন ভিডিও যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা তারা একটি শর্ট ফিল্ম করেছিল সেটার হবে। কোন টা শর্ট ফিল্ম আর কোনটা মাদক ও ডিজে পার্টি ভিডিওতে তা স্পষ্ট জানালে তিনি বলেন, সম্প্রতি আমার জন্মদিনে একটি পার্টি করেছিলাম সেটা হবে হয়ত।

একাধিক স্ত্রী প্রসঙ্গে এবং সাবেক স্ত্রীদের দিয়ে মাদক ব্যবসায় বাধ্য করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একাধিক নয় এর আগে তিনি দুইটা বিয়ে করেছেন এবং তাদের দিয়ে এমন কোন কাজ তিন করেননি বলে জানান।

এছাড়াও নির্বাচনী তহবিলে প্রতি দোকান থেকে চাঁদা আদায়, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো, মাদক বাণিজ্য ও অন্যান্য অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।

তবে লক্ষ্মীপুরা ও চান্দনা মাদকের গ্রাম বলে গাজীপুরে পরিচিত এবং মতি-পপি দম্পতির মাদক সেবন ও মাদকের আসর প্রসঙ্গে জিএমপি সদর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এর মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আমাদেরবাণী/মৃধা

মাদক, দখল বাজ ও অশ্লীল কিছু ভিডিও ক্লিপস নিয়ে মতি কমিশনার কৃত কলাপের ২য় পর্ব দেখতে চোখ রাখুন আমাদের বাণী ডট কমে।