নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুরঃ শিক্ষিত মানুষের আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (সার্ডি) নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ড। লক্ষীপুরা এবং চান্দনা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। নামি প্রতিষ্ঠান এলাকার মান বা সুনাম বাড়ায়। কিন্তু গাজীপুরের এই ওয়ার্ডটি এই নামি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয় পরিচিতি পেয়েছে দেশের আলোচিত মাদকের গ্রাম হিসেবে। লক্ষীপুরা এবং পূর্ব চান্দনার আংশিক অংশে মাদকের এই ভয়াবহতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আশির দশকের শেষ দিকে এই ওয়ার্ডে ফেনসিডিলের আবির্ভাব হয় (দেশেও মাত্র তখনই ফেনসিডিলের যাত্রা)। পর্যায়ক্রমে এটার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে মাদকের জগতে সংযোজন হয় ইয়াবা। এ ছাড়া গাঁজা, বাংলা মদ, বিয়ার, ওয়াইন, হেরোইন, ও চোলাইমদসহ রকমারি মাদকের প্রতি আসক্ত এই ওয়ার্ডের তরুণ ও যুব সমাজ। লক্ষ্মীপুরা ও চান্দনায় মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার, সেবন ও সরবরাহ যেন ওপেন সিক্রেট। এই মাদকের মুল হোতা কে তা সবাই জানেন। তবে নাম প্রকাশের সাহস করেনি কেউ।

অনুসন্ধানে ২৭ ওয়ার্ডে সরেজমিনে জানা যায়, সন্ধ্যা নামলেই মাদকের সরবরাহ শুরু হয়, চলে গভীর রাত পর্যন্ত। দূরদূরান্ত থেকে তরুণ, যুবক ও নানা বয়সী মানুষ এই ওয়ার্ডে চলে আসে মাদকের চালান নিতে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের কড়া নজরদারি থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে এই বাণিজ্য। এক হাত থেকে অন্য হাত বদল হতে থাকে মাদকের চালান। রাঘব বোয়ালরা পর্দার আড়ালে থেকে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তবে মাদকের মূল হোতাদের নাম বেড়িয়ে আসে অনুসন্ধানে। ধরা পরে ভিডিও চিত্রে।

মাদকের বহুমুখী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হলেও এর মূল হোতারাও যে মাদক বাণিজ্য করতে করতে নিজেরাই আসক্ত হয়ে পড়েছেন তা দেখে মেলে এই ভিডিও চিত্রে।

ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, মাদকের মূল হোতা একই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল মতিন  যাকে সবাই মতি কমিশনার বলেই বেশি চেনে। নিজের বাসায় অশ্লীল নারীদের নিয়ে ডিজে পার্টি ও মাদকের আখড়া বসিয়েছেন। ভিডিও চিত্রে কমিশনারের আসে পাশে যাদের দেখা যায় তারা কমিশনার মাদকের সাপ্লাইয়ার। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকের চালান নিয়ে এসে সরবরাহ করেন তারা। আর বসে থেকেই এই বাণিজ্যের অর্থে পকেট মোটা হয় মতি কমিশনারের। অবৈধ অস্ত্রের প্রকাশ্যে মহড়া এবং সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলাফেরার কারণে তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করেনি কেউ।

আরও পড়ুনঃ মতি-পপি দম্পতির অত্যাচার থেকে বাঁচতে চান এক অসহায় বিধবা নারী

অনুসন্ধানে জানা যায়, অসংখ্য নারী কেলেংকারীর নায়ক ও পাঁচ পাঁচ টি বিয়ে করা মাদকাসক্ত আব্দুল মতিন ওরফে মতি কমিশনার এক সময়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতি দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতি সক্রিয় হন। এরপর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি থেকে ডিগবাজী দিয়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তবে রাজনীতিতে বিভিন্ন দলে তার নিমন্ত্রণহীন বিচরণ ভূমি দেখে আওয়ালীগে মেলেনি কোন পদ পদবী। ২০১৩ সালের গাজীপুর সিটি নির্বাচন ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে হয়েছে তাকে। তবে মাদকাশক্ত এবং মাদক বাণিজ্য ও এলাকার চাঁদাবাজ খ্যাতি থাকায় ভোটে তেমন সাড়া পাননি ভোটারদের।

  নারী বাউলের বিরুদ্ধে মামলা!

আরও পড়ুনঃ গাজীপুরের এক মতি কমিশনার অসংখ্য অপরাধের হোতা!

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লক্ষ্মীপুরার এক বায়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি জানান, বেড়ে উঠেছি এই গ্রামে। চোখের সামনে অনেক কিছুই দেখি। কিন্তু কাকে বলব। সাহস হয়ে উঠে না । যদি তারা জানতে পারে আমি তাদের নাম বলেছি তবে আমার নিস্তার নাই।

মাদকের বিস্তারে ও ব্যবসায়ে সরাসরি মতি কমিশনারের হাত রয়েছে জানিয়ে মতি কমিশনারের  আপন বড় ভাই মোঃ ইমাম আলী জানান, দখলবাজা, চাঁদাবাজ আর মাদক ব্যবসায়ই মতিকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বানিয়েছে। এহেন কুকর্ম নেই যা মতি ও মতির স্ত্রী এবং মতির ৩য় স্ত্রীর ছোট ছেলে রিপন করেনা। অবৈধ অস্ত্র নিয়ে সরাসরি ঘুরাফেরা ও ক্যাডার পুষায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনা। মাদকের এই সিন্ডিকেট থামাতে না পারলে এই ওয়ার্ডের যুব সমাজ এক সময়ে পরিবারের অভিশাপে পরিণত হবে।

এ বিষয়ে জিএমপি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক বাণিজ্য রুখতে জিএমপি পুলিশ সদা তৎপর। তবে আমরা যখন বড় কোন মাদক কারবারিকে ধরি অনেক সময় এমনভাবে রাজনৈতিক সুপারিশ আসে তাকে ছারাতে তা কল্পনাতীত। ২৭ নং ওয়ার্ডের মাদকের বিস্তার সম্পর্কে আমরা জানি। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে আমরা নজরদারিতে রেখেছি। যেভাবেই হোক আমরা মাদক মুক্ত করব।

এ বিষয়ে জানতে আব্দুল মতিন ওরফে মতি কমিশনারের মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি অসুস্থ্য থাকায় তাঁর স্ত্রী ইসমিতা জাহান পপি এবিষয়ে বলেন, মতি কমিশনার মাদকের সাথে কোনভাবেই জড়িত নয়। বাসায় অশ্লিল ডিজে পার্টি ও মাদক সেবনের ভিডিও চিত্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,  এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি। এরকম কোন ভিডিও যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা তারা একটি শর্ট ফিল্ম করেছিল সেটার হবে। কোন টা শর্ট ফিল্ম আর কোনটা মাদক ও ডিজে পার্টি ভিডিওতে তা স্পষ্ট জানালে তিনি বলেন, সম্প্রতি আমার জন্মদিনে একটি পার্টি করেছিলাম সেটা হবে হয়ত।

তবে এ বিষয়ে জিএমপি সদর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এর মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শামীম হোসেন জানান, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ আসে নাই। তবে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিব। মাদক সেবন ও বাণিজ্যের ভিডিওর বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, যদি এমন কোন ঘটনা থাকে তাহলে আমাদের কাছে আপনার নিউজ পাঠান আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিব।