নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুরঃ গাজীপুরে দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নেওয়া তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। এতে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে নতুন করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও দালালদের মাধ্যমে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নেওয়া হয় এসব সংযোগ।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে বিভিন্ন এলাকায় দিন দিন বেড়েই চলেছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। রাতের আঁধারে এসব সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় দালাল ও তিতাসের এক অসাধু কর্মচারী। অবৈধ সংযোগ দিতে ১ লাখ থেকে তিন টাকা পর্যন্ত নেন। আর বিল হিসেবে যে টাকা তারা নিয়ে যান তার পুরোটাই যায় তাদের পকেটে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ডে (লক্ষ্মীপুরা ও চান্দনা) প্রায় অর্ধ শতাধিক বাড়িতে এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। শুধু গ্যাস সংযোগই না অবৈধ সংযোগ পাওয়া এসব বাড়ি থেকে প্রতি মাসে তোলা হচ্ছে চুলা প্রতি ৫০০ টাকার গ্যাসের বিলও। এই পুরো টাকাটা হজম করছেন স্থানীয় এক প্রতারকচক্র। লক্ষ্মীপুরার  সাখাওয়াত হোসেন, শহিদুল্লাহ, রোকসানা, হানিফ, ছানাউল্লাহ , ইদ্রিস, ও রায়হান এই বাসাগুলোর ৩৫ চুলা থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে বিল নেন ২৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মতি কমিশনারের পুত্র রিপন। তা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তবে যেহেতু অবৈধ লাইন তাই এসব বাড়ীর মালিক সরাসরি মুখ না খুললেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, সরকারি ভাবে লাইন দেয়া বন্ধ। আমাদের গ্যাস তো লাগবেই তাই যখন তিতাস আমাদের লাইন কেটে দিয়ে যায় এবং পাইপ লাইন উঠিয়ে নিয়ে যায় এর পরের দিনই তিতাস গ্যাসের ড্রাইভার আসলাম এবং মতি কমিশনারের ছেলে আমাদেরকে গ্যাস লাইন করার প্রস্তাব দিলে আমার অর্থের বিনিময়ে লাইন নিয়েছে। এর পর থেকে রিপন প্রতি মাসে আমাদের থেকে চুলা প্রতি ৫০০ টাকা করে বিল নিয়ে যায়।

জানা গেছে, ২৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল মতিন ওরফে মতি কমিশনারের ছেলে রিপন বাড়ি বুঝে ২০১৯ সালে তিতাসের অভিযানে ২৭ নং ওয়ার্ডে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও পাইপ লাইন তুলে নেয়ার এক দিন পরেই প্রতি বাসা  থেকে এক লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস পাইপ বসিয়ে পুনরায় সংযোগ প্রদান করেন। আর তিতাস গ্যাসের অফিস ম্যানেজ করেন তিতাসের গাড়ি চালক আসলাম।  মতি কমিশনারের ছেলে ও তিতাসের ড্রাইভার  সাথে রয়েছে তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশ। তবে সংযোগ দেয়ার সময় অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার কিছু টাকা পেলেও এই অবৈধ সংযোগের বাড়ি গুলোর প্রতি ফ্লাট থেকে নির্দিষ্ট হারে গ্যাসের বিল তোলা হয় তা যায় মতি পুত্র রিপনের পকেটে। এভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান রিপন।

  শিক্ষক স্বামীর ওপর অভিমানে প্রাথমিক শিক্ষিকার আত্মহত্যা

পেশাগত দৃশ্যমান কোন পরিচয় না থাকলেও রিপনের অর্থের অভাব নেই। রিপন প্রতিমাসে তিতাসের অবৈধ সংযোগ থেকে বিলের যে অর্থ আদায় করে তা একজন ১২ তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তার বেতনের সমান। অন্যদিকে বিভিন্ন সময় সদর থানার পুলিশের সোর্স পরিচয়ে কখনও মাদক ব্যবসায়ীর সাথে মাসোয়ারার হেরফের হলে মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশে ধরিয়ে দেন। আবার মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়িয়েও আনেন।

অন্যদিকে তিতাস গ্যাসের ড্রাইভার আসলাম তিতাসের যাবতীয় অবৈধ কাজ করে বনে গেছেন কোটিপতি। লক্ষীপুরায় নির্মাণ করেছেন চার তলা বাড়ি গড়েছেন অঢেল সম্পত্তির মালিক। সম্প্রতি তার সম্পদের হিসেবে চেয়ে তাকে চিঠি দিয়েছে দুদক। তবে তিনি বিভিন্ন লবিং করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন সম্পদের হিসেবের দায়মুক্তি থেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লক্ষ্মীপুরার একাধিক বাসিন্দা জানান, লক্ষ্মীপুরায় অবৈধ গ্যাসের লাইনের বিষয়ে সবাই জানে কিন্তু কেউ মুখ খুলবে না । মুখ খুললেও লাভ নাই। তিতাস এসে লাইন কেটে দিয়ে গেলে তাদের ইনকাম আরও বেড়ে যাবে। এক লাখ থেকে শুরু করে দুই তিন লাখ টাকার বিনিময়ে তারা পুনরায় অবৈধ লাইন স্থাপন করবে।

অবৈধ গ্যাস লাইন স্থাপন ও মাসিক বিল উত্তোলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে মতি কমিশনারের ছেলে রিপন জানান, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তার বাবা ভালো মানুষ। তিনি এরকম কিছু করেন নাই। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।

তবে এ বিষয়ে অভিযোগ অস্বীকার করে তিতাসের ড্রাইভার আসলাম বলেন, আপনি আমাদের স্যারের সাথে কথা বলেন। তিতাসের
ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিপণন ডিভিশন গাজীপুরে কর্মরত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেছি উল্লেখ করলে তিনি পুনরায় অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তার বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে দুদকের অনুসন্ধান ও সম্পদের হিসেব চেয়ে চিঠির প্রসঙ্গে আনলে তিনি তা এড়িয়ে যন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিপণন ডিভিশন গাজীপুরে কর্মরত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাসান বলেন, লক্ষ্মীপুরায় আমরা অভিযান চালিয়ে সব লাইন কেটে দিয়ে এসেছিলাম এমনকি অবৈধ পাইপ লাইনও আমরা উঠিয়ে নিয়ে এসেছি। এরপর আবারও একই কাজ করেছে। আমরা অবশ্যই পুনরায় অভিযান পরিচালনা করে লাইন কাটে দিব ও পাইপ তুলে আনবো এবং দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসব। তিনি অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় এখন অভিযানের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হয়েছে জানিয়ে বলেন, আমি আজই আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব। অচিরেই আমরা অভিযান পরিচালনা করব।