বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের দুটি রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ঘোষিত ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ও আসামে বিজেপি জয়ী হওয়ার পর বাংলাদেশের খচখচানিটা বেড়েছে। একই সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এ নিয়ে সাবধানী মন্তব্য করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, ভোটে জয়ী হওয়া দুই দলকেই শুভেচ্ছা জানিয়ে সতর্কভাবে পা ফেলতে চাইছে বাংলাদেশ। কারণ করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে একটি কষ্ট বাংলাদেশের রয়েছে। আর এই কষ্টের সুযোগে ভ্যাকসিন নিয়ে ঢাকায় ঢুকেছে চীন এবং রাশিয়া। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে খানিকটা টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যসভার ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই মধুর।

তবু বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি গত ১০ বছর ধরে ঝুলে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি করতে পারেনি। এবারো ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তিস্তার ব্যাপারে তিনি আগের অবস্থানেই থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিস্তার পানি চুক্তি নাও হতে পারে। এ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ আরো বাড়ল। অন্যদিকে আসামে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতার মসনদে বসতে যাচ্ছে বিজেপি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও অত্যন্ত চমৎকার। তবু আসামে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের করা বিভিন্ন মন্তব্য বাংলাদেশের খচখচানিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। ভোটারাও পরিপক্ক এবং ভোটিং সিস্টেমও উন্নতমানের। ভারতের সব দলই বাংলাদেশের বন্ধু। সুতরাং তাদের মঙ্গল কামনা করি।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ভোটের ফলাফলে ধারণা করা হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসতে যাচ্ছেন। ভারত বন্ধুরাষ্ট্র হলেও তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তার পানি চুক্তির বিরোধিতা করে সেখানকার কয়েকটি জেলায় ভোট বেশি পেয়েছেন। এ অবস্থায় ফের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে অবস্থান পরিবর্তন করবেন এমন কোনো আভাস পাচ্ছি না। অর্থাৎ তিস্তার পানি চুক্তিতে তিনি সায় নাও দিতে পারেন। এবারের ভোটের আগে প্রচারপর্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে এই ক‚টনীতিক বলেন, প্রচারের সময় বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পর্ক এমন জায়গায় চলে গেছে; যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি কথা বললে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাও মানতে পারেন। সেই হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার হয়তো তিস্তার পানি চুক্তির ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আর অনুরোধ নাও করতে পারে। তবু আমরা চেষ্টা করব যাতে চুক্তি হয়।

  আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা নিরসনে আসছে গণবিজ্ঞপ্তি

আরেক কূটনীতিক ড. মোহাম্মদ জমির পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। তিনি বলেন, আসামে দ্বিতীয়বারের মতো বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ফলে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এখন কী ভূমিকা নেন তা দেখার বিষয়। বহু বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমান নাগরিকত্ব আইনের কারণে নাগরিকত্ব হারিয়ে বসে আছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের যে কোনো নির্বাচনকে তাদের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, ভারতের নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় হোক। তথ্যমন্ত্রী বলেন, যারাই ভারতে সরকার গঠন করুক, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক এবং পাশের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যে নৈকট্য, তা যেন আরো গভীরে প্রোথিত হয়। দুদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রæত সমাধান হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই ভারতে সব সময় গণতন্ত্রের বিজয় হোক।

এদিকে গতকাল পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের তামিলনাড়ু, আসাম, কেরালা ও পন্ডিচেরিতে ভোট গণনা ও ফলাফল দেয়া হলেও সবার নজর ছিল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। মূল লড়াই হয় বিজেপি ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সরাসরি প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম নিয়েই বাংলাদেশের আগ্রহ বেশি ছিল। উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ভোট গ্রহণ হয়েছে ২৯২টি আসনে পশ্চিমবঙ্গে। মোট ২৯৪টি আসনে ভোট হওয়ার কথা থাকলেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ২৯২টি আসনে। অন্য চার রাজ্যে এপ্রিলের শুরুতেই ভোটগ্রহণ করা হয়।