‘ছোট বেলা থেকে আমার ছেলেটা ঈদের আগের দিন কত বায়না করত। ও রে পটকা কেনার টাকা দিতে হইবো। শার্ট, গেঞ্জি পছন্দ না হলে বার বার পাল্টাইতে হইবো। ওর বাপ একটু বেশি রাগী ছিল। তাই ভয়ে সব কিছু আমারেই কইতো। ওর (ছেলের) বাপ রে লুকাইয়া, ওরে যে (ছেলেকে) কত টেকা দিছি। এখন তো ওরই অনেক টেকা।’

কথাগুলো বলতে বলতেই হু হু করে কেঁদে ফেললেন মর্জিনা বেগম। ঈদের সময়ের স্মৃতিগুলো মনে করে ৭০ বছর বয়সী এই নারী বার বার তার মুখে কাপড় দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছিলেন।

বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে হয়তো বা এখন অনেক কিছু মনে পড়ে না তার। অথবা কিছু মনে করতেও চান না তিনি।

তাই তো কোনো ভাবেই তার সেই ছেলের নাম বা পরিচয় কিছুই বলতে রাজি হননি এই মা। কারণ এই মায়ের খবর নেওয় না সেই ছেলে বা পরিবারের অন্য কোনো আপনজন।

মর্জিনা বেগমের ঠিক ৪/৫ গজ দূরে বসে মুখে হাত দিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন আরেক মা। তারও বয়স ষাটোর্ধ। তিনিও জেনে গেছেন কাল ঈদ। তাই নিজের ফেলে আসা সুখ-দুঃখের স্মৃতি গুলো মনে পড়ছে তার।

তবে মুখে তেমন কিছু বলতে পারেন না এ অভাগী মা। শুধু ঈশারায় কিছু বোঝান তিনি। কয়েক মাস আগে সড়কে পড়েছিলেন এই মা। পরে তাকে পুলিশের সহায়তায় আনা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।

আরেক জন মা জহুরা খাতুন। বয়স আনুমানিক ৯০ বছর। পরিবার, সন্তান জমিজমা থাকলেও শেষ বয়সে ঘর সংসার ছাড়া হতে হয়েছে তাকে। স্বামীর মৃত্যুর পরে সন্তানেরাও জায়গা দেয়নি বৃদ্ধ মাকে।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে তাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অসুস্থ হয়ে গেছেন তিনি। অসুস্থ সেই মা-কেও রাস্তা থেকে তুলে এনে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় দিয়েছেন। সারা বছর তো নয়ই এমনকি ঈদের সময়ও তার খোঁজ নিতে আসেনি কোনো সন্তান বা আপনজন।

শুধু মাত্র এই মায়েরাই নয়, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ৭৫ জন মা জানেন রাত পোহালেই ঈদ। কিন্তু অন্যদের মতো ঈদের আনন্দ নেই কারও মনেই। নেই কোনো আপনজনের অপেক্ষা। কারণ তারা জানেন কোনো আপনজনই তাদের আর খোঁজ নেবে না।

এক সময় স্বামী, সন্তান, বাবা- মা এবং পরিবার সবই ছিল তাদের । কিন্তু ভাগ্যের কষাঘাতে তারা এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা । কোনো আপনজন থেকেও নেই তাদের।

আপনজনহীন এসব মায়েদের আপন করে নিয়েছে ” আপন নিবাস’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম। রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ মায়েদের তুলে এনেছেন তারা। করছেন সেবা যত্ব, ব্যবস্থা করেছেন চিকিৎসার এবং থাকা খাওয়ার।

শুধু তাই নয়, মৃত্যুর পরে এই মায়েদের দাফন কাফন সবই করে “আপন নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রম। রাজধানীর উত্তরার উত্তরখান মৈনারটেকে ছোট একটা বাড়িতে গড়ে উঠেছে এই বৃদ্ধাশ্রমটি।

“আপন নিবাস’ কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রাস্তায় পরে থাকা অসহায় মা এবং বোনদের জন্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আর দশটা বৃদ্ধাআশ্রম এর মতো আপন নিবাস এ টাকা দিয়ে অথবা পরিবার দিয়ে গেছে এমন কাউকে রাখা হয় না। যে মানুষ গুলোর এই পৃথিবীতে আপনজন বলতে থেকেও কেউ নেই। কেবল তাদের কেই আপন করে নিয়েছে আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম।

  জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ৫৬ সাংবাদিকের জিডি

অপর দিকে সব মায়ের ভাগ্যে সন্তানের ভালোবাসা জোটে না। সন্তানসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনের শেষ সময়টুকু আনন্দে কাটাতে পারেন না অনেকেই। এমন মায়েদরই পরম যত্নে আগলে রেখেছে উত্তরখানের মৈনারটেক এলাকায় অসহায় ও দুস্থ নারীদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম ‘আপন নিবাস’। এখন প্রায় ৭৫ জন নারী বসবাস করছেন। তাদের বয়স ৬০-৭০ বছরের বেশি। তাদের কেউ হয়তো রাস্তায় পড়েছিলেন, কেউ মাজারে। দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে দিন চলত অনেকের। কোনো দিন হয়তো একবেলা খাবার পর্যন্তও জুটত না। প্রচণ্ড অসুস্থতা নিয়ে কেউ হয়তো কাঁপছিলেন হাসপাতালের পাশে। এসব অসহায়, দুস্থ নারীদের নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘আপন নিবাস’ নামের এ বৃদ্ধাশ্রমটি।

বৃদ্ধাশ্রমটিতে থাকা নারীরা যৌবনে কেউ ছিলেন কর্মজীবী নারী, কেউ ছিলেন গার্মেন্টকর্মী আবার কেউ ছিলেন কারও স্ত্রী বা কোনো সন্তানের মা। নিজের জীবনের সোনালী দিনগুলো উজাড় করে দিয়েছেন সন্তানের জন্য কিংবা পরিবারের জন্য। জীবনের শেষ সময়ে এসে সেই মানুষটির ঠাঁই হয়নি সংসারে।

আপন নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সৈয়দা সেলিনা হক শেলী দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘২০১০ সালের ৮ মার্চ ৭ জন অসহায় বয়স্ক নারীকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রমের। শুরুতে আশ্রম চলত মুষ্টিচাল সংগ্রহের মাধ্যমে। উত্তরখান ও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে চাল সংগ্রহ করে তা দিয়েই চলতো বৃদ্ধাশ্রমটি। কোনো নির্দিষ্ট সহায়তাকারী বা দাতা আমাদের ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, “মাঝে-মধ্যে অনেক পরিচিত ব্যক্তিরা আর্থিক সাহায্যে এগিয়ে আসেন। মাসের কোনো একদিন খাবার নিয়ে চলে আসেন কেউ কেউ। সবাইকে খাইয়ে দিয়ে যান। তবে খাবারের সমস্যা এখন কিছুটা কমেছে।এখন প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ বা কোনো সংগঠন খাবার দিয়ে যায়।’

সৈয়দা সেলিনা হক শেলী বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের আপন নিবাস এ ৭৫ জন মা এবং বোন রয়েছেন যাদের সেবায় নিয়োজিত আছেন ১৫ জন সেচ্ছাসেবক । প্রায় প্রত্যেকেরই রয়েছে মানসিক এবং শারিরিক প্রতিবন্ধকতা। তাদের খাবার খরচ থেকে শুরু করে ওষুধ কাপরসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুর চাহিদা মেটাচ্ছে আপন নিবাস।’

‘এতগুলো মানুষের এত খরচ আমাদের একার পক্ষে কখনোই বহন করা সম্ভব ছিল না যদিনা অন্যরা এগিয়ে না আসতেন। আপনাদের সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দান এবং ভালোবাসায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের এখানে আশ্রয় পাওয়া মা এবং বোনদের ভালো রাখতে পারছি’, যোগ করেন তিনি।

‘আপন নিবাসের’ অসহায় মায়েদের জন্য একটা নিজস্ব বাড়ি তৈরি করতে চেষ্টা করছেন পরিচালক সৈয়দা সেলিনা হক শেলী । এ বিষয়ে তিনি বলেন, ““আপন নিবাসের” নামের অত্র এলাকায় আমরা ইতিমধ্যে একটি জমি কিনেছি। এখন জমিটা ভরাট করতে পারলেই সেখানে বাড়ির কাজ শুরু করতে পারব। তবে আপাতত জমি ভরাট করার মতো তেমন আর্থিক অবস্থা আমাদের নেই।এসব অসহায় মায়েদর জন্য যেন দ্রুতই একটা ভালো থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারি।’