করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তার পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখাসহ সব কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি দেখভাল করছেন। সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলেই ভাই শামীম এস্কানদারকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হবেন বিএনপিপ্রধান। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চায় পরিবার। এ জন্য গত সোমবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এর আগে গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে। তবে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগ চলছে। কৌশলগত কারণে দুপক্ষের কেউই এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না।

জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিমা ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, আমার বোন খুবই অসুস্থ। আপনারা তার জন্য দোয়া করেন। বিদেশ নেয়ার বিষয়ে কী হবে সেটা এখনই কিছু বলতে পারছি না। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার আগ্রহ নেই। তার মতের বাইরে গিয়ে করোনা পজেটিভ হওয়ার পরই পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে। পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান ও নাতনিরা বিএনপি নেত্রীকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন। অপর একটি সূত্র জানায়, প্রথমে সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে নিয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সেখান থেকে লন্ডন নেয়া হতে পারে খালেদাকে। এ লক্ষ্যে সোমবার রাতেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হয়েছে। দেশের একটি খ্যাতনামা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এ প্রক্রিয়াটি বেশ এগিয়ে রয়েছে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদেশে নেয়ার জন্য তার দল বা পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকরা দফায় দফায় খালেদা জিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তবে যেহেতু তিনি শর্তসাপেক্ষে মুক্ত আছেন; এ কারণে সরকার অনুমতি দিলেই কেবল বিদেশে রওনা করতে পারবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র নেতা বলেন, তাকে সিসিইউতে নেয়ার পর আমি মহাসচিবকে ফোন দিয়েছিলাম- আমরা কয়েকজন নেতা মিলে ম্যাডামকে দেখতে যেতে চাই। কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, তার পরিবারের অনুমতি নেই।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসক টিমের একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম থেকেই দলের পক্ষ থেকে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে বলে জানালেও মূলত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা একদমই ভালো নয়। তার ফুসফুসের পানি বের করা হয়েছে। তারপরও আগামী দুদিন খুবই ‘কঠিন সময়’। ওই চিকিৎসক বলেন, প্রথম দিনের সিটিস্ক্যানেই তার ফুসফুসে পানি জমার বিষয়টি ধরা পড়ে। কিন্তু এমন খবরে দলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে সন্দেহে বিষয়টি সামনে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে বারণ ছিল। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত না হওয়ায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই বলেও জানান তিনি।

  সড়ক দুর্ঘটনায় পিআইবির পরিচালক নিহত

জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ম্যাডামে’র অবস্থা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিয়েছি। সেগুলোর প্রতিবেদন আসার পর চিকিৎসকরা পর্যালোচনা করবেন। এর আগে বলার কিছু নেই। তিনি জানান, দেশের বাইরের একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গেও নিয়মিত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার পুত্রবধূ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চিকিৎসক ডা. জোবায়দা রহমানও পুরো কার্যক্রমের খোঁজখবর করছেন। বিদেশ নেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণই তার পরিবারের বিষয়। আমার কিছুই বলার নেই। দলটির প্রভাবশালী একাধিক নেতা জানান, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আবেদনের পর কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সোমবার বিএনপির মহাসচিব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। বিশেষ করে সোমবার বিকালে খালেদা জিয়াকে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে স্থানান্তর করার বিষয়টি অবহিত করেন।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সঠিক তথ্য না পেয়ে ইতোমধ্যেই বিএনপিতে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্নের। নেতাকর্মীরা বলছেন, ডাক্তারদের বক্তব্য অনুযায়ী খালেদা জিয়ার শরীরে যদি করোনা না থাকে তাহলে তার ফুসফুসে পানি জমার কারণ কি? কেন তার করোনা নিয়ে এই লুকোচুরি? কেনইবা হঠাৎ করেই বিদেশ নেয়ার আলোচনা?

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) রাতে খালেদা জিয়াকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরদিন বিএনপি প্রধানের চিকিৎসার জন্য ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। আর গত সোমবার বিকালে তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। এর আগে গত ১১ এপ্রিল খালেদা জিয়ার করোনা টেস্টের রিপোর্ট পজেটিভ আসে। ওইদিন বিকালে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান খালেদা জিয়া। সেখান থেকে এক মাসের মধ্যেই ফেরার কথা থাকলেও চিকিৎসায় সময় লাগায় দেশে ফিরতে দেরি হয়। ওই বছর ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন তিনি।