মশার ঔষধ

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকাঃ শীতের প্রকোপ কাটিয়ে গরম আসতে না আসতেই রাজধানীতে ভয়ংকর চেহারায় ফিরেছে মশা। অফিস-বাসা বা দোকান, অভিজাত এলাকা বা বস্তি- সব জায়গায়ই মশার উৎপাত। মশার বিস্তার রোধে দুই সিটি করপোরেশন বছর বছর বাজেট বাড়ালেও মশা কমাতে পারছে না।

রাজধানীবাসীর অভিযোগ, মশা নিধনে খুব একটা কার্যকর উদ্যোগ নেই সিটি করপোরেশনের। মাঝে মাঝে ওষুধ ছিটানো বা ফগার দিয়ে স্প্রে করলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। এমনকী কয়েল বা অ্যারোসল স্প্রে করেও মরছে না মশা।

গবেষণা বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতেই রাজধানীতে মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। এই মুহুর্তে মশা নিধনের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ বছর ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে রাজধানীবাসীর মাঝে।

খোদ স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামও গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, মশা নিয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। এ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের খবর প্রচার হচ্ছে। আমি নিজেও জানি মশা বেড়েছে। যদিও গত বছর যে পরিমাণ কিউলেক্স এবং অ্যানোফিলিস মশা ছিল এ বছর সেই তুলনায় কম। তবে এখনো যে পরিমাণ রয়েছে তা-ও সহনীয় নয়।

তবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।

গত ৫ বছরে দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মশা নিধনে ২০২০-২১ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বাজেট রাখা হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাদের বাজেট ছিল ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম গতকাল রাজধানীর পান্থপথের পান্থকুঞ্জে অবস্থিত অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি আরো বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। মেয়র সাহেবরা কাজ করে যাচ্ছেন। এডিস মশার জন্ম হয় বাসা-বাড়িতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায়।

আর ঝোপ-জঙ্গল, কচুরিপানায় অ্যানোফিলিস এবং কিউলেক্স মশার জন্ম হয়। কিউলেক্স মশা ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে উড়ে যেতে পারে। এডিস মশা এক কিলোমিটারের কম জায়গায় উড়তে পারে। ফলে আমরা খাল-বিল যখন সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করতে সক্ষম হব, তখন আমরা এই মশা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব বলে বিশ্বাস করি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি আরো কিছু সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের ওপর জোর দিতে হবে। নর্দমা ও ডোবা পরিষ্কার এবং মশা নিয়ন্ত্রণের পুরো দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের নর্দমা ও ডোবার পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হবে। একইসঙ্গে সেখানে লার্ভিসাইড, অ্যাডাল্টিসাইট প্রয়োগ কিংবা গাপ্পি মাছ ছাড়তে হবে।

রাজধানীর মশা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। প্রতি বছরের এ সময় মশার আধিক্য দেখা যায়। এরপরও এবার অস্বাভাবিক হারে মশা বৃদ্ধির দায় সিটি করপোরেশন এড়াতে পারে না। সময়মতো কার্যকর ওষুধ না ছিটানোয় মশা বেড়েছে।

মশার ঘনত্ব নিয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। রাজধানীতে মশার উপদ্রব যে গত বছরের এই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি, তার জরিপেও তা উঠে এসেছে।

কবিরুল বাশার জানান, প্রতি মাসে রাজধানীর ৬টি এলাকাকে নমুনা ধরে সেখানে জরিপ করেন তারা। সেজন্য শনির আখড়া, শাঁখারীবাজার, মোহাম্মদপুর-শ্যামলী, পরীবাগ-সেন্ট্রাল রোড ও শাহবাগ, উত্তরা এবং খিলগাঁও-বাসাবো এলাকার বিভিন্ন স্থানে মশার ঘনত্ব মাপার যন্ত্র (ডিপার) বসানো হয়। প্রতিটি এলাকায় ২০০টি করে ডিপার বসানো হয়। ডিপার একবার পানিতে ডুবিয়ে তুলে আনার পর তাতে কতগুলো মশার লার্ভা পাওয়া গেল তা গণনা করা হয়। সবগুলো নমুনা সংগ্রহের পর গড় করে ওই এলাকায় মশার ঘনত্ব বের করা হয়।

  বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে তিস্তা ব্যারেজ, রেড এলার্ট জারি

কবিরুল বাশার বলেন, এ বছর মশার ঘনত্ব গত বছরের চেয়ে বেশি। সব জায়গায় সমান পাওয়া যায় না। গত বছর প্রতিটি ডিপারে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি লার্ভা পেতাম। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পাওয়া গেছে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫টি। ক্র্যাশ প্রোগ্রাম না নিলে, ঝড়-বৃষ্টি না হলে মার্চে এই মশা আরো বাড়তে পারে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন বলেন, ২০২০ পুরোটা ছিল করোনায় কবলিত। এর মধ্যেও আমরা কিছু ডেঙ্গু রোগী পেয়েছি হাসপাতালে। এবার মশার বৃদ্ধি যে রকম, সামনের দিনে যখন বৃষ্টি ও বর্ষা শুরু হবে তখন মশা আরো বাড়বে। আমরা আশঙ্কা করছি যে তখন ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মহামারী দেখা দিতে পারে। এটা হবে করোনার আঘাতে জর্জরিত মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। তাই মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা দরকার। কিন্তু আমার দেখেছি সিটি করপোরেশন বিভিন্ন জায়গা ওষুধ ছিটাচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। মশা বেড়ে যাচ্ছে। যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে সেগুলো কাজ করে কি না- বিষয়টির সমাধান হওয়া দরকার।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকার বাসিন্দা হোসনেয়ারা গাজী বলেন, মশার যন্ত্রণায় দরজা জানালা খেলা যায় না। কোনো কাজে বসলে মশা কামড়ে স্থির থাকা যায় না। আমাদের এখানে মশার ওষুধ ছিটানো খুব একটা চোখে পড়েনি।

খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, গত দুই সপ্তাহ থেকে মশা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মাঝেমধ্যে দেখি ওষুধ ছিটাতে আসে। তাদের মেশিনে যেভাবে ধোয়া ওড়ে এভাবে তো মশা মরে না। মশা মারার যে ওষুধ ছিটানো হয় তা একটু ভালো মানের হলে মশার উপদ্রব কমবে।

দক্ষিণ বাড্ডা জাগরণী ক্লাব সংলগ্ন আফতাব ভিলার বাসিন্দা জান্নাতুল নাঈম নাবিলা বলেন, মশার জ্বালায় একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। সন্ধ্যার আগ থেকে পুরো বাসা মশার দখলে চলে যায়। সন্তানদের পড়তে বসাতে পারি না। কয়েল জ্বালিয়ে কিংবা স্প্রে করেও মশার উৎপাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে না।

মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন কী পদক্ষেপ নিয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোবায়দুর রহমান বলেন, শীতের শেষে তাপমাত্রা বাড়ায় প্রকৃতিতে যে মশার ডিম থাকে সেগুলো একযোগে ফুটে যায়। ফলে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে মশার ঘনত্ব বেড়ে যায়। আমাদের একটি বিশেষ টিম ৮ মার্চ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালাবে। এছাড়া আমাদের নিয়মিত সব কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। বুধবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমরা বছরব্যাপী সমন্বিত মশক নিধন কর্মসূচি শুরু করেছি। ফলে এবছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ছিল। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা এই কার্যক্রম চালিয়েছি। তবে এই সময়ে কিউলেক্স মশা বেড়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে কাজ করার কারণে কিউলেক্সের দিকে আমরা নজর দিতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শদাতা এবং বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা ভুল ছিল। আমাদের বিশেষজ্ঞরা ঘটনা ঘটার পর বড় বড় পরামর্শ দেন। তারা আমাদের ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। যদিও এখন আমরা নতুন কৌশল নিয়েছি। মশা নিধনে আমরা কীটনাশক পরিবর্তন করেছি। আশা করি, আমরা ডেঙ্গুর মতো কিউলেক্স মশাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।’