নভেল করোনাভাইরাসের আরো বেশি সংক্রমণ ঘটার আশঙ্কা বাড়িয়েছে ঈদে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। মানুষের ঢল থামাতে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিআইডব্লিউটিসি। তবে বেশিক্ষণ সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের বিক্ষোভ-রোষের মুখে বন্ধের সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টার মাথায় গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় ফেরি চালাতে বাধ্য হন তারা। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দুই রুটেই ফেরিতে গণপরিবহন না থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি হাজার হাজার যাত্রী পার হয়েছেন। এরই মধ্যে দেশে শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের অতি সংক্রামক ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। তার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলমুখী জনস্রোত মহামারি ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারকরা পড়েছেন নতুন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরামর্শক ডা. মো. আহাদ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের যে লকডাউনটা ঈদ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, সরকার সতর্কভাবে এটা করেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভয়াবহতা লকডাউনের কারণেই কমে এসেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে সংক্রমণটা গত দুই সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বগতি। আমরা ভারতীয় সীমান্ত বন্ধ বললেও পণ্যসহ নানাভাবে দুই দেশের সঙ্গে বিনিময় হচ্ছে। ভারতে যাওয়া শত শত মানুষও ফিরে আসছে। এভাবেই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটা এখানে প্রবেশ করেছে। সংক্রমণটা যদি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে অনেক প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষ যেভাবে বাড়িতে ফিরছে, এটা করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে খুবই আশঙ্কার।’

শুক্রবার রাতে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ ঘরমুখো মানুষের ঢল সামলাতে দিনের বেলা ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার নৌপথে আটকে পড়ে। নদীর দু’পাড়েই অপেক্ষমাণ হয়ে পড়ে কয়েকশ’ গাড়ি ও হাজার হাজার মানুষ। এ সময় বেশির ভাগ মানুষের মুখেই ছিল না মাস্ক। বজায় ছিল না সামাজিক দূরত্ব। সবাই গাদাগাদি ও জটলা পাকিয়ে ফেরি চালানোর দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়ে গতকাল সকাল ৯টা থেকে সীমিত আকারে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলাচল শুরু করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দুপুর থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরি চলাচল শুরু হয়।

শিমুলিয়া ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই) হিলাল উদ্দিন বলেন, ‘শুক্রবার রাত ৩টা থেকে শিমুলিয়া ঘাটে সব ধরনের ফেরি পারাপার বন্ধ ছিল। তবে কুঞ্জলতা নামে একটি ফেরি সকাল ৮টা ১০ মিনিটে শিবচরের বাংলাবাজার ঘাট থেকে ৫টি অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের দুটি পিকআপভ্যান এবং ৫ শতাধিক যাত্রী নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে আসে। বাধা দেওয়ার আগেই শিমুলিয়া ঘাটে ভিড় জমানো মানুষ ওই ফেরিতে ওঠে পড়ে। পরে ফেরিটি ঘাট এলাকায় ঘণ্টাখানেক নোঙর করে রাখা হয়। এ সময় ফেরি বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। যাত্রীদের রোষানলে পড়েন ঘাট কর্তৃপক্ষের লোকজন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুসারে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ফেরি কুঞ্জলতায় যাত্রীবোঝাই করে বাংলাবাজার ঘাটে পাঠানো হয়।’ তিনি বলেন, ‘শিমুলিয়া ঘাটে এখনো ৪ শতাধিক ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান এবং ৭টি অ্যাম্বুলেন্স পারের অপেক্ষায় আছে। ব্যক্তিগত ছোট গাড়িও আছে। ১০ হাজারের বেশি যাত্রী ঘাটে পার হওয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন।’

  বিশ্বে করোনা: মোট মৃত্যু ৫ লাখ সাড়ে ৫৭ হাজার, শনাক্ত প্রায় ১ কোটি ২৪ লাশ

শিমুলিয়া ঘাটের উপমহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম বেলা বলেন, ঘাটের যাত্রীদের কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। ঘাটের পরিস্থিতি কীভাবে স্বাভাবিক করা যায়, সেই লক্ষ্যে জেলা প্রশাসক, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিসির লোকজন বৈঠকে বসে ফেরি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এদিকে, শিমুলিয়ার পর দুপুর ১২টায় দৌলতদিয়া প্রান্ত থেকে রজনীগন্ধা ও দুপুর সাড়ে ১২টায় বনলতা নামে দুটি ফেরি পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এর আগে পাটুরিয়া থেকে মাধবীলতা নামে একটি ফেরি প্রথম সকাল ১১টায় দৌলতদিয়া ঘাটে এসে পৌঁছায়। দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া দুটি ফেরিতেই যাত্রী ছিল প্রচুর। প্রতিটি ফেরিই শত শত যাত্রী ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঘাট ত্যাগ করে।
এদিকে গতকালই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বি.১. ৬১৭.২ পাওয়া গেছে। এটি গত ২৮ ও ২৯ এপ্রিল পাওয়া গেছে। এই ধরনটি অতি সংক্রামক। এরই মধ্যে ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের সড়কে উপচেপড়া ভিড় সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কর্তাদের সদিচ্ছা থাকলে ফেরিঘাটে ভিড় হতো না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি পুলিশকে নির্দেশ দিত মানুষকে ঠেকাতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি করোনার নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ব্যাপক প্রচার চালাতো এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় যদি পরিবহন নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতো তাহলে ফেরিঘাটে মানুষের ঢল নামত না।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘কর্তা যেমন চায়, কর্ম তেমনই হয়। কর্তারা চাচ্ছেন লোকজন যাক। লোকজন যাচ্ছে। এতে করোনা সংক্রমণ কতটা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যারা এ বিষয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছেন তারাই উপলব্ধি করতে পারছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলছেন, লোকজনকে ফেরিঘাটে দেখা যাচ্ছে। আমার প্রশ্ন মানুষজন গেল কীভাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছিলেন, যে যেখানে আছেন সেখানে ঈদ করবেন। কিন্তু সেটা মানা হলো না। তার এ ঘোষণায় পরিবহনমন্ত্রীর উচিত ছিল ব্যবস্থা নেওয়া তা তিনি নেননি। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দরকার ছিল এ বিষয়ে পুলিশ যাতে দেখে। রাস্তায় গাড়ি না বের হয়। আর স্বাস্থ্য বিভাগের দেখা দরকার ছিল, ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো; যাতে মানুষ ঈদ উপলক্ষে বাড়িতে না যায়। এই তিন বিভাগকে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখলাম না। এখন ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখে বললেই তো হবে না, সংক্রমণ বাড়বে। দূর গন্তব্যে মানুষ যাতে না যায় সেটা করে দেখাতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট আছে এটা অবধারিত। এটা দু-একজন নয়। সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। কারণ ভারত থেকে আসা যশোরের নাগরিক চট্টগ্রাম গিয়ে ধরা পড়েছে। তারা তো হেঁটে সেখানে যাননি। নিশ্চয়ই গাড়িতে সেখানে পৌঁছেছে। আমরা মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তাহলে সরকারকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। এখন আমরা কতটুকু এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি সেটাই দেখার বিষয়।’