বিচিত্র এক দেশ ঈদের দিনেও সড়কে ঝরে ২৫ তাজা প্রাণ

মুশলধারার বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ঈদের আনন্দে মেতেছিল বাংলাদেশ। ভোগান্তির কথা জেনেও বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন দেশবাসী। সর্বস্তরের মানুষ ঈদের নামাজে শামিল হয়েছে ঠিকই। অনেকের এক হাতে ছিল জায়নামাজ, অন্য হাতে ছাতা। নামাজ শেষে করেছেন কোলাকুলি। সবার মুখেই আনন্দের হাসি।

ধর্মীয় মতে, এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে রোজাদারদের দুটি আনন্দ। এক, যখন রোজা শেষে ঈদ আসে তখন আনন্দ আর দুই যখন কিয়ামতের দিন তার মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে সাক্ষাৎ পাবে সেই আনন্দ। ধর্মপ্রাণ মুসলিম বিশ্বে রোজাদারেরা এই দুই আনন্দ পাওয়ার জন্যই এক মাস রোজা থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র যেন ভিন্ন। একমাস রোজা শেষে পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন ভাগাভাগী করার জন্য তাদেরও দুই ধরনের আনন্দ। এক, রোজা শেষে ঈদের ছুটিতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফেরার আনন্দ আর দুই তাদের সাথে ঈদ উদযাপনের আনন্দ।

বুধবার সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি। তবে এই বৃষ্টি ঈদ আনন্দে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটালেও পরিবারের সাথে ঈদের বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ থেকে আটকাতে পারেনি। তবে আটকিয়েছে সড়ক। ঈদের দিনেই সড়ক কেড়ে নিয়েছি ২৫ প্রাণ। ঢাকা, গাজীপুর, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, নরসিংদী, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাগেরহাট ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক দূর্ঘটনায় এরা মারা গেছে (অবশ্য দুর্ঘটনা বলা স্রেফ কাকতালীয় এটাকে হত্যা বলাই শ্রেয়)।

গণমাধ্যমে কাজ করার সুফলে ঈদের নামাজ শেষে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদগুলোর দিকে চোখ দিতেই ভিতরটা কেমন যেন শিউরে উঠলো।যেখানে প্রত্যাশা ছিল প্রতিনিধিরা পাঠাবেন রঙবেরঙের বিভিন্ন নতুন পোশাকে ঈদ আনন্দের ছবি, বাঁধ ভাঙ্গা উল্লাসের কাহিনী। সড়কে পরে থাকা রক্তাক্ত নিথর দেহ আর দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া যান গুলো দেখতে দেখতে আঁতকে উঠলো ভেতরটা। ঐ পরিবারগুলোই একই আনন্দ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সড়ক তাদেরকে আনন্দ কে ভুলন্ঠিত করে শোকের শহরে ধাবিত করল। কেউ হারালেন ভাই কেউবা বাবা কেউবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে।

  বামপন্থীদের সেই হে মার্কেটের আন্দোলন ও আজকের শ্রমিক দিবস

এবার ঈদে অন্যান্যবারের মত সড়কে এতটা বিশৃঙ্খলা না থাকায় সড়ক মন্ত্রী মহাশয় বাহবা নিয়ে নিলেন। একবারেও নিহতদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে দেখা গেলো না। সড়কের এই দায় নেবার কেউনাই। যেন সড়কেরই দোষ অথবা নিজের দোষেই তারা মারা গেছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই)  তথ্য অনুযায়ী গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৮ সালে সারা দেশে চার হাজার ৪৩৯ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যা জানিয়েছিল নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। এদেশে প্রতিদিন যেহারে সড়কে মানুষ মরে কোন দেশের রাজনৈতিক গৃহযুদ্ধেও প্রতিদিন এত পরিমান মানুষ মরে না।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল থেকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করে আসছে। এর মধ্যে সাতটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার যে হিসাব প্রকাশ করছে, তাতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী ও কর্মক্ষম জনসম্পদ হারিয়ে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সরকার সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ করলে এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ৯০ শতাংশ কমানো সম্ভব। আসুন সড়কে নৈরাজ্য রোধে সড়ক পরিবহণে দুর্নীতিরোধে আমরাও সোচ্চার হয়। সরকারের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধ্য করি। যেমন আমাদের কোমলমতি শিশুরা দেখিয়েছিলেন।

লেখক, সম্পাদক অনলাইন নিউজ পোর্টাল আমাদের বাণী ডট কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *