নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকাঃ মোঃ মোরশেদ আজম। বয়স ৩৫।  মিরপুরের কাজী পাড়ার বাসিন্দা । চাকরি করেন বনানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বেরুতেই হোঁচট খেতে হয়েছে তাকে। কারণ গণপরিবহন বন্ধ। গন্তব্যে কিভাবে পৌঁছবেন, এ নিয়ে দেন-দরবার শুরু করেন অটোচালক, পাঠাও-উবার চালকদের সঙ্গে। তবে সামর্থ্যরে মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছাতে তাকে ঘণ্টাখানেক রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে কয়েকজন মিলে একটি অটোরিকশা পেলেও মহাখালী পর্যন্ত জনপ্রতি গুনতে হয়েছে ৫০ টাকা। আসার বেলায় হিসাবের অতিরিক্ত খরচ তো হলোই, কষ্ট করে অফিসে পৌঁছলেও সন্ধ্যায় ফিরতে কত টাকা ব্যয় করতে হবে- এ নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই এই চাকরিজীবীর। শুধু আজমই নন, তার মতো এ সমস্যায় পড়েছেন নাজমুল, সোহাগ, নাফিয়াসহ অফিসগামী বেশিরভাগ কর্মজীবী মানুষ। গতকাল সোমবার এ সমস্যা তৈরি হয়েছে সরকারের গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণায়। অথচ সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে খোলা। এমন পরিস্থিতিতে পদে পদে ভোগান্তি হয়েছে রাজধানীর কর্মজীবীদের।

রাজধানীর সড়কগুলোতে গতকাল সকাল থেকে অফিসগামী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে অন্যান্য দিনের মতোই। কিন্তু গণপরিবহন না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে তাদের। এ সুযোগে অফিসগামী যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দাপট দেখিয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও রাইড শেয়ারিংয়ের মোটর বাইকওয়ালারা। যেহেতু চাকরিজীবিদের অফিসে যেতেই হবে, আর বাসও বন্ধ, সে সুযোগে তারা বেশি ভাড়া আদায় করেছেন, এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে অফিসগামীদের কাছ থেকে।

রেজা রহিম নামে এক বেসরকারি কর্মকর্তা জানান, আজিমপুর থেকে বনশ্রীর অফিসে যেতেই তাকে গুণতে হয়েছে সাড়ে ৬০০ টাকা। অথচ দৈনিক আসতে-যেতে তার মোট খরচ হয় মাত্র ৭০ টাকা। তিনি বলেন, ‘একদিকে গণলপরিবহন বন্ধ, অন্যদিকে অফিস চালু, এ কারণে বাধ্য হয়ে যাত্রীরা বেশি ভাড়া দিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন।’

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সাতদিনের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এর আওতায় গতকাল থেকে গণপরিবহন বন্ধ এবং চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এ নিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অফিস-আদালত ও বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে কাজ চালাবে এবং তাদের কর্মীদের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অফিসে আনা নেওয়া করতে পারবে। শিল্প-কারখানা ও নির্মাণকাজ চালু থাকবে। শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করতে হবে। তবে অফিস চালু রাখলেও আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করেনি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান।

পল্টনে অফিসে যাওয়ার জন্য রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবি তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও অফিস কিন্তু আমাদের খোলা আছে। আর যে কারণে অফিসে যেতেই হচ্ছে। অফিস খোলা রেখে বাস বন্ধ, লকডাউন দিয়ে কী লাভ? সবাইকে বাধ্য হয়ে অফিসে যেতেই হচ্ছে। সব অফিস তো আর সব কর্মীদের জন্য নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা করেনি। তাহলে আমরা কিভাবে অফিস যাবো?’

  দেশে সাধারণ ছুটি আরও বাড়াল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

খামারবাড়ি মোড় এলাকায় সিএনজি অটোচালক আবদুল কাইয়ুম বলেন, লকডাউন চালু থাকলেও যাত্রীদের প্রয়োজনে ভেতরের রাস্তা দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি। আর অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি তো চলছেই। কিচু অফিসের গাড়িও চলছে।

মিরপুর থেকে ভাড়ায় মোহাম্মদপুর আসা মোটরসাইকেল যাত্রী ফারুক মাহমুদ বলেন, ‘এটাকে লকডাউন বলা যাবে না। অফিস খোলা, বইমেলা খোলা। বাস ছাড়া রাস্তায় সব ধরণের গাড়িই চলছে শুধু ভাড়া বেশি আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এভাবে লকডাউন দিয়ে উবর্ধমুখী করোনার গতি থামিয়ে রাখা যাবে না।’

যদিও সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, লকডাউনের সময় সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মানতে হবে। যারা এই নির্দেশনা অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি কথা মানতে হবে, দেশের মানুষকে মহামারি থেকে রক্ষা করতেই এই লকডাউন দেওয়া হয়েছে। কাজেই লকডাউন কার্যকর করতে আমাদের অবশ্যই সচেতন হয়ে সরকারি নির্দেশনাগুলো মানতে হবে।

সরকারের এমন পদক্ষেপের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রিমিয়ার ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘লকডাউন হলে লকডাউনের মতোই হতে হবে। এভাবে বিধিনিষেধ দিয়ে লাভ কী? আমাদের তো কাজে যেতেই হচ্ছে।’

এদিকে কর্মজীবী মানুষের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন রাজধানীসহ সারাদেশের ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ছিন্নমূল মানষরাও। সাধারণ মানুষের আনাগোনা কম থাকায় রাস্তার মোড়ে ও ফুটপাতে বসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিশেহারা। ভাসমান ক্রেতা শূন্যতায় ব্যবসায় মন্দা তাদের। কথা হয় নাবিস্কো মোড়ে পান-সিগারেট বিক্রেতা নাজনীন আক্তারের সঙ্গে। প্রতিদিনের সংবাদকে এই নারী জানান, অন্যদিন দুপুর পর্যন্ত তার বেচা-বিক্রি হয় দুইশ টাকা। এদিন মাত্র ২০ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাসের ড্রাইভার-হেলপার আমার পান সিগারেট বেশি কেনে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তারা নাই, তাই বেচাবিক্রিও নাই।’

ক্ষতির শিকার হলেও এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা কর্মহীন দুঃস্থ মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোন আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যদি সরকারি বিধি-নিষেধ দীর্ঘ হয় কিংবা দু:স্থদের কথা ভেবে সরকার কোন বরাদ্দ দেয়, সেটি জানিয়ে দেওয়া হবে।

এদিকে, সরকারি বিধি-নিষেধের প্রতিবাদে রাজধানীর নিউমার্কেটসহ বেশকিছু এলাকায় বিক্ষুদ্ধ জনতাকে রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়ি ভাংচুর করতে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়িকে ভাঙতে উদ্যত হতেও দেখা গেছে কাউকে কাউকে। বিক্ষুদ্ধ জনতাকে থামাতে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিককে অনুনয়-বিনয় করে স্থান ত্যাগ করতে দেখা গেছে।

আমাদেরবাণী/মৃধা