ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকাঃ দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে- এ বিষয়ে একমত বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ যে আরো বেশি ভয়ঙ্কর হবে এ বিষয়েও দ্বিমত নেই কারো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে এখনো উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। তাই তাদের শঙ্কা, সামনের দিনগুলো হবে আরো বেশি ভয়ঙ্কর।

* সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড * শনাক্তও প্রায় ৭ হাজার

গত বছর মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর সংক্রমণ তীব্র হয়েছিল জুন-জুলাই মাসে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ছিল ওই দুই মাসেই। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এরপর থেকে শনাক্তের হার কমতে শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ শনাক্তের হার নেমে আসে ৩ শতাংশের নিচে। তবে মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। শুরুতেই তা হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যের সংখ্যায় আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হচ্ছে। গড় শনাক্তের হারও ইতোমধ্যে ২৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা এ যাবত কালের সর্বোচ্চ মৃত্যু। নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা ৭ হাজারের নিচে নামলেও শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৪ জন। শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৩৮টি জেলাকে অধিক, ১০টিকে মধ্যম এবং ১৬টিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব জেলায় সংক্রমণের হার ১০ থেকে ৩০ শতাংশ।

পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছলে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ পিকে (সর্বোচ্চ চূড়ায়) পৌঁছেছে বলা যাবে- এ প্রসঙ্গে এখনো নিশ্চিত নন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দেখেও মানুষের মধ্যে এখনো কোনো সচেতনতা তৈরি হয়নি। এখনই সংক্রমণের পিক কখন হবে তা অনুমান করা সম্ভব নয়। তবে মানুষের ফ্রি স্টাইল চলাচল বন্ধ না হলে পিক কোথায় গিয়ে পৌঁছবে তা আমরা ধারণাও করতে পারব না। সরকার সংক্রমণ ঠেকাতে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী আরো কঠোর নির্দেশনার প্রয়োজন ছিল। গতকাল এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং মানুষকে বাঁচাতে সামনে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। এর আগে বিভিন্ন সময় তিনি দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে সবাইকে এগিয়ে আসার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের দুই ধরনের নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে। একটি যুক্তরাজ্যে (এন৫০১ওয়াই), অন্যটি দক্ষিণ আফ্রিকায় (ই৪৮৪কে)। বাংলাদেশে জানুয়ারিতেই যুক্তরাজ্যের ধরনের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এবার দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরনের সঙ্গেও মিল পাওয়া গেছে। মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরনের ৮১ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর’বি তাদের ওয়েবসাইটে এ খবর প্রকাশ করে।

বাংলাদেশে এই নতুন ধরন শুধু সংক্রমণের হারই দ্রুত বাড়াচ্ছে না, খুব কম সময়ের মধ্যে আক্রান্তদের অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং মৃত্যু হচ্ছে। সব দিক বিবেচনায় জনস্বাস্থ্যবিদরা একে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নয় সুনামির ঢেউ বলছেন। তাদের আশঙ্কা, জনগণ সচেতন না হলে সামনে খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) দেশটির নাগরিকদের কোনো দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংক্রমণ বিবেচনায় চারটি স্তর নির্ধারণ করেছে। এই স্তরের চতুর্থ তালিকা হচ্ছে ‘সংক্রমণ খুবই উচ্চ’। ২ লাখের বেশি জনসংখ্যা রয়েছে এমন অঞ্চল বা দেশে ২৮ দিনের মোট আক্রান্তের হার যদি প্রতি লাখে ১০০ জনের বেশি হয়, তবে সেটি চতুর্থ স্তর। অর্থাৎ সেখানে ‘সংক্রমণ খুবই উচ্চ’। সেই স্তরে বাংলাদেশও আছে।

  দেশসেরা যে ১২ শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করলেন প্রধানমন্ত্রী

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরিক পরামর্শক কমিটির সদস্য বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ বেশ শক্তভাবে আঘাত হানতে শুরু করেছে। কিন্তু মানুষ সেই বিষয়টি গ্রাহ্য করছে না। ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার নির্দেশনাগুলো মেনে চলার পরিবর্তে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো চলছে। জনগণ সচেতন না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা মুশকিল হবে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল মেডিসিনের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. এ কে এম শামসুজ্জামান বলেন, সংক্রমণের পিক নিয়ে পূর্বানুমান করার মতো অবস্থা এখনো আসেনি। কারণ মানুষের আচরণের ওপর এই ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়া ও কমা নির্ভর করছে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। অথচ মানুষ এখনো অসচেতন আচরণ করছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, সংক্রমণের যে তীব্রতা তাতে এখন আর করোনার সংক্রমণকে দ্বিতীয় ঢেউ বলা যাবে না, এটা একটা সুনামির ঢেউ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট টার্গেট করে, কোথায় কোথায় মানুষ সংক্রমিত বেশি হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে হবে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এর পাশাপাশি সরকারের ঘোষিত ১৮টি সিদ্ধান্তকে অবশ্যই পালন করতে হবে। এছাড়া বর্তমানে করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হলে তাদের আইসোলেশনের বিষয়ে আমাদের মনোযোগ কম। বিদেশফেরতদের মধ্যে শুধু ব্রিটেন থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের ভেতরে যারা শনাক্ত হচ্ছেন তারা আইসোলেশনে আছে কিনা, তাদের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কিনা, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। এছাড়া সব কিছু লকডাউনের ওপর ছেড়ে দিলেই হবে না। সার্বিক বিষয়ে সমন্বয় করতে হবে।

সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিনে শনাক্ত ৬ হাজার ৮৫৪ জন : গতকাল বৃহস্পতিবার পাঠানো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট ২৪৩টি ল্যাবে ৩৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৪ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩৯১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

দেশে এ পর্যন্ত মোট ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৮টি নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জন। সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩০ জন। মোট ৯ হাজার ৫২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ১৩০ জন পুরুষ ও ২ হাজার ৩৯১ জন নারী।

২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে ৪৮ জন পুরুষ আর নারী ২৬ জন। বয়স বিবেচনায় ষাটোর্ধ্ব ৪৬ জন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ১৬ জন, চল্লিশোর্ধ্ব ৬ জন, ত্রিশোর্ধ্ব পাঁচজন এবং বিশোর্ধ্ব একজন। এদের মধ্যে ৪৩ জন ঢাকা, ১৫ জন চট্টগ্রাম, তিনজন রাজশাহী, সাতজন খুলনা, চারজন বরিশাল এবং দুজন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

আমাদেরবাণী/মৃধা