বাজার নিয়ন্ত্রণে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যে কতটা শক্তিশালী এবার দেশজুড়ে একযোগে কেজি দরে তরমুজ বিক্রির চিত্রই তা বলে দিয়েছে। চাষিদের কাছ থেকে পিস হিসেবে কেনা তরমুজ কেজি দরে কিনতে বাধ্য হয়েছেন ক্রেতারা। এতেই প্রমাণ মেলে সিন্ডিকেটের কাছে কীভাবে জিম্মি হয়ে আছে তারা। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা করলেও ভাঙা যায়নি সেই সিন্ডিকেট। এখনো বেশির ভাগ জায়গাতেই কেজিতেই বিক্রি হচ্ছে মৌসুমি এই ফলটি।

বিভিন্ন মৌসুমে সক্রিয় হয়ে ওঠা এসব অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। রমজানের আগেও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য সক্রিয় হয়েছিল তারা। কিন্তু এ বছর সরকার টিসিবির পণ্য বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। অন্যান্য বছর টিসিবি মোট চাহিদার ২-৩ শতাংশ পণ্য বিক্রি করলেও এবার বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হয়। যার প্রভাবে রমজানের শুরুর দিকে নিত্যপণ্য কিছুটা চড়া হলেও মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে অসাধু এই গোষ্ঠী ঈদ সামনে রেখে মুরগি, চিনি ও মসলাসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়াতে শুরু করেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, দুই-এক দিনের মধ্যে এসব পণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে।

ঈদ সামনে রেখে এরই মধ্যে প্রায় বেশ কয়েকটি পণ্যে দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি, বোতলজাত সয়াবিন, চিনি, প্যাকেট ময়দা, রসুন, জিরা, দারুচিনিসহ প্রায় সব ধরনের মসলার দাম বেড়েছে। ঈদের আগে বাজারের ঊর্ধ্বমুখিতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, মুনাফাখোররা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে, সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবিও মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আদনান হোসেন একজন ডেলিভারিম্যান। অনলাইনের বিভিন্ন পণ্য সাইকেলে করে মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেন। কখনো বা ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী বাজার থেকে পণ্য কিনে বাসায় সরবরাহ করেন। তিনি জানান, ঈদে সাধারণত যেসব খাদ্যপণ্য বিশেষ করে চিনি, মসলা ও মুরগির মাংসের দাম গত দুই-তিন ধরে বেড়েছে।

  ২৪ ঘন্টায় আরও ১৮৬ পুলিশ সদস্যের করোনা শনাক্ত, মোট ৩৯১৮

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি আগে ১৩৫-১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০-১৫৫ টাকায়। বোতলজাত সয়াবিনের দাম বেড়েছে লিটারে ২ থেকে ৩ টাকা। রসুনের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। জিরার দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা, দারুচিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা, চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা, প্যাকেট ময়দার বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা।

রাজধানীর বাড্ডার এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বাংলাদেশের খবরকে জানান, রোজার আগে ৫০ কেজি চিনির বস্তা কিনেছি ৩ হাজার ১০০ টাকা করে। এখন বস্তা কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ২৭০ টাকা করে। তাই কেজিতে ২ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তবে আশার কথা হলো, বাজারে কমতে শুরু করেছে চালের দাম। টিসিবির তথ্যমতে, গত সপ্তাহের তুলনায় চালের দাম কমেছে এক থেকে দুই টাকা। অর্থাৎ চালের দাম কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। যদিও চালের দাম এর চেয়ে খুব বেশি কমার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

এদিকে, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময় চাল, পেঁয়াজ ও আলুর বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে গবেষণা চালায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান চলতি বছর জানুয়ারিতে তাদের প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য অসাধু সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছে। একই সাথে ব্যবসায়ীদের এই ‘সিন্ডিকেট’ এবং তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছে বিএআরসি।

তাই ঈদের আগে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে সিন্ডিকেটের হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এবং বাজার বিশ্লেষকরা।