Shadow

সুন্দরবনের মৎস্য আহরণে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা!

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা সংবাদদাতা;  মৎস্য ভান্ডারখ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে দুই মাসের জন্য সকল প্রকার মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা আসছে। জুলাই-আগস্ট সুন্দরবনের মৎস্য প্রজাতির প্রধান প্রজনন মৌসুম। তাই এই দুই মাসে কোনো মৎস্যজীবীকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও নিারপদ প্রজননের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বনবিভাগ।

  • এদিকে, নিষেধাজ্ঞার এই খবরে চরমভাবে হতাশায় পড়েছে সুন্দরবনের পাসধারী বাগেরহাটের শরণখোলার দুই সহস্রাধিক জেলেসহ তাদের পরিবার এবং এই পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে মাছ ধরা বন্ধের সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির চাকা অনেকটা সচল রাখে সুন্দরবনের এই মৎস্য আহরণ খাত। একে তো মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বন্ধের পথে সব ধরণের ব্যবসা-বাণিজ্যও। তার ওপর দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সবকিছুতেই একটা বিপর্যয় নেমে আসবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের দুই লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭ বর্গ কিলোমিটার বনভূমির মধ্যে দুই শতাধিক নদী ও খাল রয়েছে। এর মধ্যে অভয়ারণ্য এলাকার ১৮টি এবং ২৫ ফুটের কম প্রসস্ত খালগুলোতে সারা বছরই মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া, জুলাই ও আগস্ট প্রজনন মৌসুমের এই দুই মাস বনের সকল খালে মৎস্য আহরণ বন্ধ রাখা হয়। প্রজননের এই সময়ের বাইরে অভয়ারণ্য এবং নিষিদ্ধ নদী-খাল ছাড়া সারাবছরই পাসধারী দুই হাজারেরও বেশি জেলে সুন্দরবনে মৎস্য আহরণ করে থাকে।

  • জেলে মোশারেফ বেপারী (৬৫) প্রায় ৪০ বছর ধরে বনে মাছ ধরছেন। তার পরিবারে ৮ জন সদস্য। একদিন বনে না গেলে তার সংসার চলে না। মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়েছেন ৯০ হাজার টাকা। মাছ ধরে মহাজনের আড়তে দিয়ে সেই দেনা শোধ করবেন। কিন্তু দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকলে দেনা শোধ তো দূরের কথা তিন বেলা খাবারও জুটবে না বলে হতাশা প্রকাশ করেন।

সোনাতলা গ্রামের জেলে সালাম হাওলাদার (৫৫), খুড়িয়াখালী গ্রামের খালেক মোল্লা (৬০) জানান, একেকজন জেলের মহাজনদের কাছ থেকে বছরে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাদন নেওয়া আছে। মাছ ধরতে না পারলে এই দেনা কিভাবে শাধ করবেন সেই চিন্তা পড়েছেন সবাই।

  রাতারাতি নদী গর্ভে ২৬৯ জন শিক্ষার্থীর প্রিয় প্রাথমিক বিদ্যালয়
  • শরণখোলার বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. জালাল মোল্লা জানান, তিনি ১৭টি নৌকায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন। এভাবে, শরণখোলা, সোনাতলা, বগী, গাবতলা, তাফালবাড়ী, রসুলপুর, উত্তর রাজাপুর, ধানসাগর ও বান্দারহাট এলাকার প্রায় শতাধিক মহাজনের প্রত্যেকের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে জেলেদেরকে দাদন দেওয়া রয়েছে। দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকলে এসব দাদনে টাকা জেলেরা কোনোদিনই শোধ করতে পারবে না। এতে মহাজনদের বড় ধরণের লোকসানে পড়তে হবে।

এসব মহাজনরা জানান, করোনার কারণে এমনিতেই মাছের মোকাম ভালো না। আগের মতো মাছও পড়ছে না। বর্তমানে যা পাওয়া যাচ্ছে তার দামও কম। করোনার ভয়ে বাইরের পাইকাররা আসতে চায় না। এভাবে কোনো মতে জেলেদের দিন কাটছে। এ অবস্থায় যা মাছ ধরা বন্ধ করলে জেলে-মহাজন সবারই পথে বসতে হবে। তাই মৎস্য সংশ্লিষ্টদের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।

  • পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন জানান, জুলাই ও আগস্ট মাস হচ্ছে সুন্দরবনের মৎস্য প্রজননের জন্য উপযুক্ত সময়। সাধারণত এই সময়ে সকল মাছ ডিম ছাড়ে। তাই এ বছরও ১ জুলাই থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত দুই মাস সকল প্রকার মৎস্য আহরণ বন্ধ থাকবে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বেলায়েত হোসেন জানান, ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানস এর (আইআরএমপি) সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে এই সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ। মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও নিরাপদ প্রজননের জন্য নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর করা হবে। পাশাপাশি জেলেদের দাবির বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।

আমাদের বাণী ডট কম/২৬ জুন ২০২০/পিপিএম 

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •