সুজন বিপ্লব

সুজন বিপ্লবঃ মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবছর, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী কাল উপস্হিত হয়েছে। ‘সব হাতে কাজ, সব মুখে ভাত’ স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার কতটুকু পূরণ হয়েছে? দেশের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী ধনিক শ্রেণির স্বার্থে লুটেরা ব্যবসায়ীদেরকে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিলেও আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, বিদেশ ফেরত শ্রমিক, করোনায় কর্মহীন, বেকারসহ অন্যান্য শ্রমজীবি মানুষের জন্য কোন প্রণোদনা নেই। সাধারণ মানুষ ক্রমশ আরো নিঃস্ব হচ্ছে।

দেশের ৩% ধনীর বিপরীতে ৯৭% সাধারণ মানুষ, এক চতুর্থাংশ কর্মক্ষম মানুষের পূর্ণকালীন কাজের ব্যবস্হা নেই। ১৯ নভেম্বর ২০২০ জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে ৩ লক্ষ ৬৯ হাজার ৪৫১টি শূণ্যপদ রয়েছে। দেশের উচ্চ শিক্ষিত যুবদের ৪৭ শতাংশেরর কাজ নেই। বিপুল পরিমাণ কর্মহীন যুবদের সাথে করোনাকালীন পরিস্হিতিতে আরো কোটি বেকার যোগ হয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি বলছে, করোনকালে ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে ২০২০, এ সময়ে ৩ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছে। কমপক্ষে ১৪ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক বেকার হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ১৩ ভাগ মানুষ চাকরিচ্যুত হয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশে ৭২% মানুষের আয় কমেছে। বিরাজমান পরিস্হিতিতে দেশের ১ কোটি ১০ লক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক, ২ কোটি ৩০ লক্ষ কৃষি শ্রমিক ও প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ অন্যান্য শ্রমজীবি মানুষের কারো জন্যই আর্থিক, সামাজিক বা স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। এরকম তীব্রতর সংকটে জনজীবন, সেখানে যুক্তিহীন ও অমানবিকভাবে বিশেষায়িত পেশাভিত্তিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বেকার বানানোর প্রক্রিয়াকে সমর্থন করা যায়না। নিবন্ধন পরীক্ষা নামক ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় জ্যামিতিক হারে, উলল্ফন গতিতে বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তদ্রুপ বিশেষায়িত সেবামূলক পেশাভিত্তিক আইন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মেধাবী তারুণ্যের স্বাধীন আইন পেশায় আইনজীবী নিবন্ধনে প্রচলিত ত্রিস্তরের পরীক্ষার কোপানলে আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন খুন হচ্ছে। কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্হাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উপেক্ষা করতে পারেনা। বেকারত্বের মীমাংসা না করে উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় বহন তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারেনা। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সরকারের একটি সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইনজীবীদের পেশাগত নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ৪৬ নম্বর আদেশ, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস এবং বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ দ্বারা বার কাউন্সিল গঠিত হয়। আইনজীবী নিবন্ধনে পরবর্তী সময়ে বার কাউন্সিল রুলস-এ যুক্ত ৬০ (ক) ও ৬০ (খ) বিধি অনুযায়ী এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাপেক্ষে আইনজীবী নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে ছাঁটাইয়ের সূচনা হয়। একারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শিক্ষানবীশ কাল সম্পন্নকারীকে আইনজীবী সনদ প্রদান করা হয়না। অযৌক্তিকভাবে প্রতিযোগীতামূলক বার কাউন্সিল পরীক্ষার মুখোমুখী করে শিক্ষানবীশদেরকে গিনিপিগ বানানো হচ্ছে।

প্রচলিত আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতিটি সংবিধান স্বীকৃত কর্মসংস্থানের অধিকার প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক অবস্হানে রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে দ্বিতীয় ভাগ-রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, অনুচ্ছেদ-১৫: মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্হা, (খ) দফা:”কর্মের অধিকার, অর্থ্যাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;” এবং তৃতীয় ভাগ-মৌলিক অধিকার, অনুচ্ছেদ-৪০:পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা:”আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে কোন পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের কিংবা কারবার বা ব্যবসা-পরিচালনার জন্য আইনের দ্বারা কোন যোগ্যতা নির্ধারিত হইয়া থাকিলে অনুরুপ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন আইনসঙ্গত পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের এবং যে কোন আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসায় পরিচালনার অধিকার থাকিবে।” যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির কর্মসংস্থানের অধিকার সংবিধানে মৌলিক অধিকার বলা হলেও আইন স্নাতক ডিগ্রিধারী ও শিক্ষানবীশ কাল সম্পন্নকারীগণ কি অ্যাডভোকেট স্বীকৃতির ক্ষেত্রে যোগ্য নয়? বার কাউন্সিল পরীক্ষা বছরে দুইবার হওয়ার কথা থাকলেও তিন ধাপের মধ্যে একটি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে তিন থেকে চার বছর বা আরো বেশী সময় লেগে যায়। সম্পূর্ণ পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় ক্ষেপন হয়। পূর্বে পরীক্ষাবিহীন ও নিকট অতীতে তিন ধাপের পরীক্ষা ব্যতিরেকে আইনজীবী সনদ প্রদানের পদ্ধতি চালু ছিল। কারিগরি এ পেশায় পরীক্ষা ব্যতিরেকে আইনজীবী সনদ দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়না। বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগ সংখ্যক অনুত্তীর্ণের ফলে বিশাল সংখ্যক একদল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের কাঁধে বোঝা হয়ে চেপে বসছে। স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠগ্রহণ ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আইন স্নাতকগণকে শিক্ষানবীশ কাল অন্তে এ ধরণের পরীক্ষার মুখোমুখী করা বা অনুত্তীর্ণের ঘটনা মোটেও শুভ ফল প্রদায়ক নয়।

  একটি রক্তাত্ত আইডি কার্ড ও অপ্রতিরোধ্য সড়ক দুর্ঘটনা

আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণে বিকল্প অংশগ্রহণমূলক সৃজনশীল পদ্ধতি সর্বজন গ্রাহ্যের দাবি রাখে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তি বা আইনজীবী সনদ পরীক্ষার স্বরুপ: এ পদ্ধতিতে আইন স্নাতকের শিক্ষাসনদ, আইন শিক্ষানবীশ কাল, নাগরিক তথ্যাবলী যাচাই এবং সেমিনার, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও অ্যাসাইনমেন্টে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে আইনজীবী সনদ প্রদান যথোচিত হয়। অবিলম্বে সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক বিকল্প আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি প্রবর্তনের কোন বিকল্প নেই। আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি সংস্কারে বিজ্ঞ ও ভুক্তভোগী মহল কর্তৃক সুনির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাবসম্বলিত দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। আইনজীবী সনদ প্রদানে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবনাসমূহ:কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা হিসাবে আইন স্নাতকদের বিশেষায়িত আইন পেশায় প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা নিরসনে জটিল, ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ, ছাঁটাইকরণ ও হয়রানিমূলক তিন ধাপের পরীক্ষা বাতিলপূর্বক অবিলম্বে আইনজীবী সনদ প্রত্যাশীদের জন্য অনলাইন নিবন্ধন চালু, নিবন্ধিত শিক্ষানবিশগণের এক বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট তারিখে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পরীক্ষা ও সনদ প্রদান সম্পন্ন করা অন্যথায় বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে আইনজীবী সনদ প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান করা।

২। এক বছর মেয়াদি আইন শিক্ষানবিশকালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার ও অ্যাসাইনমেন্টে অংশগ্রহণমূলক সৃজনশীল পরীক্ষা অন্যথায় বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়ন সাপেক্ষে আইনজীবী সনদ প্রদান করা।

৩।বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সমন্বয় সভার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদে আইনে স্নাতক পর্যায়ে কাম্য ছাত্র সংখ্যা নির্ধারণ করা অথবা বিশেষ প্রতিষ্ঠান গঠন করে আইনের ছাত্র সংখ্যা, সিলেবাস ও পেশাগত সংকট সমাধানে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা।

৪। উপজেলায় আদালত চালু, গ্রাম আদালত পর্যন্ত পর্যাপ্ত বিচারক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও আইনজীবীদের কার্যক্রম বিস্তৃত করা। বিজ্ঞ আদালতে মামলা পরিচালনায় নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষানবিশ আইনজীবীর অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে শিক্ষানবিশকালে কাজের বিনিময়ে সম্মানি ফি প্রদানে অন্তর্ভুক্তিকরণের পূর্ব পর্যন্ত ন্যূনতম শিক্ষানবিশ সম্মানি ফি নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

আইনজীবী নিবন্ধন পদ্ধতি সংস্কারে চলমান যৌক্তিক গণআন্দোলনের সাথে বিবেকবান সকলে ঐক্যমত পোষণ করেছে। উচ্চতর বিশেষায়িত পেশাভিত্তিক সেবামূলক আইন শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীর জন্য স্বাধীন আইন পেশা গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হলে ক্ষতি কার? যারা আইনজীবী হিসাবে মেধা, মনন ও দক্ষতার মাধ্যমে কাজ করতে পারবে, তারা আইন পেশা অব্যাহত রাখবে। আইন শিক্ষা বাস্তবিক অর্থে কারিগরি ও ব্যবহারিক বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছর অথচ স্বাধীন আইন পেশা গ্রহণে আইন স্নাতকধারী শিক্ষানবীশেরকে অ্যাডভোকেট হওয়ার স্বাধীনতা ও গ্যারান্টি নেই। হাজার-হাজার শিক্ষার্থীকে সনদ দিয়ে আবার বার কাউন্সিল পরীক্ষার নামে প্রহসন, দফায়-দফায় ফি, পরীক্ষার নামে চাঁদাবাজি একইসাথে বেকারত্ব নিয়ে এ ধরনের মস্করা বন্ধ করা উচিত।

আইনজীবী নিবন্ধনে উত্থাপিত যৌক্তিক, মানবিক ও নীতিনিষ্ঠ নাগরিক দাবিসমূহ ইতোমধ্যে সরকার ও বার কাউন্সিলকে অবগত করা হয়েছে। আইন সনদ নিবন্ধনের ভুলনীতি-দুর্নীতির খপ্পড়ে জাতীয় ও অান্তর্জাতিক অঙ্গনে মেধাবী তরুণ আইনজীবী থেকে আইনী সেবা বঞ্চিত আমাদেরকে হতে হচ্ছে। বৃহত্তর জনস্বার্থে বেকারত্ব দূরীকরণ, আইন শিক্ষার্থী-শিক্ষানবীশের ভোগান্তি নিরসন, আইন শিক্ষা, পেশা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে, তারুণ্যের স্বপ্ন বাঁচাতে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণে ৪ দাবি বাস্তবায়ন করা খুব জরুরি, কর্তৃপক্ষের সেই শুভ বোধদয় হোক।

লেখক: আহ্বায়ক, আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন