আমাদের বাণী ডেস্ক, ঢাকাঃ ‘৩৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২০ কাটা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। জমি থেকে এক ছটাক ধান ঘরে তোলার আশা নেই। ঘরে খাবারও নেই’। আত্মীয় বাড়ি থেকে ১০ কেজি চাউল দিয়েছিল আর মাত্র একদিন চলবে।

দোকানে গিয়ে ছিলাম কিছু বাজার করতে, দোকানদার বাকী দিতে রাজি হয়নি। সে বলেছে জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে খেতে পাবে না, এখন তোমাকে বাকী দিলে পরে টাকা কোথায় থেকে দিবা।

চার মেয়ে দুই ছেলে আমার। ঘরে গিয়ে সন্তানের মুখের দিকে তাকালে কান্নায় বুখ পেটে যায়। তাদের কি খাওয়াবো? কি দিয়ে করবো তাদের ভরণ-পোষণ? আর কি দিয়েই করবো ঋণ পরিশোধ!

বয়স হয়েছে, শরীরে শক্তি নেই। হাওরের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অন্যর বাড়িতে কাজ করারও কোনো সুযোগ নেই। দু’চোখে অন্ধকার দেখছি। বাড়িতে হাহাকার। কথাগুলো বলছিলেন, নেত্রকোনার মদন উপজেলার গবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক আবুল মিয়া।

শুধু আবুল মিয়াই নয়, নেত্রকোনার মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার হাওর পাড়ের প্রতিটি কৃষক পরিবারের সদস্যদের মুখে এমন কথাই শুনা যায়। কিভাবে দিন কাটবে আগামী দিনগুলো। বছরের একটিমাত্র ফসল তাউ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই হাওরের বুখ জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার।

মঙ্গলবার সারাদিন জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ একসময় ছিল ধানে ভরপুর, এখন শুধু সাদা কাশ ফুলের মতো মরা ধানের গাছগুলো হাওরের বাতাসে দোল কাচ্ছে।

জানা গেছে, গত রোববার সন্ধ্যায় হঠাৎ ঝড় বৃষ্টি শেষে দমকা গরম বাতাস বইতে শুরু করে। সে সময় স্থানীয়দের মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করতে শুরু করে। পরদিন সকালে হাওরে গিয়ে কৃষকরা দেখেন তাদের ধানের ক্ষতি হয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে সে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। ফসলের মাঠে ধান গাছ সাদা হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে কষ্ট বাড়ছে সাধারণ কৃষকদের ঘরে।

  থমকে আছে দেশ ও দেশের অর্থনীতি, থেমে নেই ধর্ষণ

সূর্য্যরে প্রকরতা বাড়ার সাথে সাথে উঠতি বোরো ধানের শীষ মরতে শুরু করে ক্ষেতের পর ক্ষেত, মাঠের পর মাঠ। হাওরে ২৮ জাতের ধানসহ কাটা শুরু হয়েছে বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড ধান। বেশির ভাগ জমির ধানই পাকতে শুরু করেছিলো। এই সময়ে হাওর পাড়ের কৃষক-কৃষাণীরা কষ্টে ফলানোর সোনার ফসল ঘরে তুলতে অনেকেই ব্যস্থ সময় পার করতেন। কিন্তু এ বছর তাদের মাঝে শুরু হয়েছে শুধু হাহাকার।

এদিকে ফসলের এমন ক্ষতির কারণ জানতে কৃষি বিভাগের একটি গবেষক দল মাঠে কাজ করছেন।

হাওরের বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখতে সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরুসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জেলার বিভিন্ন উপজেলার কয়েকটি হাওর পরিদর্শন করেছেন। এসময় মন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সরকার কর্তৃক সব ধরণের সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, কয়েক মিনিটের গরম বাতাসে হাওরের এমন দূর্যোগ বয়স্ক লোকেরাও দেখেনি বা শুনেওনি। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে থাকবে সরকার। লকডাউনের পর আমি ঢাকা গিয়ে কৃষিমন্ত্রীর সাথে সরাসরি কথা বলবো বলেও আশ্বাস দেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ হাবিবুর রহমান বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করে বলেন, অতি গরম আবহাওয়ায় এমনটা হয়েছে। ফুল আসা ধান সব চিটা হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে আছেন, জরিপ শেষে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে। হঠাৎ গরম বাতাসে বোরো ফসল নষ্ট হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য কৃষি বিভাগের একটি গবেষণা ইউনিট মাঠে কাজ করছে।

আমাদেরবাণী/মৃধা