অদৃষ্টের হাতে লেখা সূক্ষ্ম এক রেখা/ সেই পথ বয়ে সবে হয় অগ্রসর।’ কবির এই বাক্য চিরন্তন, সকলের জন্যই কঠিন সত্য; কিন্তু এই জগতে কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন যাহারা কেবল অগ্রসর হইয়া শেষ গন্তব্যে চলিয়াই যান না, নিজের জীবনকে সার্থক করিয়া, ইহার সহিত দেশ ও মানুষের মধ্যে এক অম্লান দাগ ফেলিয়া যান।
চলে গেলেন তেমনি একজন জ্ঞানের ফেরিওয়ালা, শিক্ষার আলোকবর্তিকা শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। কুষ্টিয়ার খোকসার কৃতি এই শিক্ষকের মহাপ্রস্থানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিভিন্ন মহলে।
শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) ভোর সাতটায় উপজেলার একতাপুরের খাগড়বাড়িয়ার নিজ বাসভবনে তিনি ৮৭ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মৃত্যুকালে এই প্রবাদপুরুষ তিন পুত্র সন্তান, সহধর্মিনীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে দ্বিজেন স্যার আজকের খোকসা সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রাখেন। শোনা যায়, নিজের ঘরের চালা থেকে ঝাড়ের বাঁশ পর্যন্ত কলেজ প্রতিষ্ঠায় দান করেছিলেন। সর্বোপরি খোকসা বা এর আশপাশ এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে তিনি অনন্য। দ্বিজেন স্যারই সর্বপ্রথম খোকসার মানুষকে কোট-টাইয়ের সাথে পরিচিত করান। তৎকালীন সময়ে তিনিই প্রথম খোকসার মানুষ হিসেবে নিয়মিত যশোর টু ঢাকা, ঢাকা টু যশোর বিমান ভ্রমণ করতেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস খোকসা-জানিপুর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না করেই ফিরে আসেন তার নাড়িপোঁতা খোকসাতে। ফিরে এসেই দলবল নিয়ে শুরু করলেন খোকসা কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ।
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর কলেজে ইংরেজি পড়ানোর দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব নেন রোভার স্কাউটসেরও। পাবনার হেমায়েতপুরের সৎ সংঘতে তিনি নিয়মিত ভ্রমণ এবং অবস্থান করতেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, এম.এ ফাইনাল পরীক্ষার সময় তাঁর এক গরীব সহপাঠি টাকার অভাবে ফরম পূরণ করতে পারছেন না জেনে নিজের ফরম পূরণের টাকা ঔ সহপাঠিকে দিয়ে তার পরীক্ষার দেবার ব্যবস্থা করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা না দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরিবারের সাথে দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। দেশ স্বাধীন হলে সপরিবারে ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিক্ষায় পশ্চাদপদ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠিকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষে অন্যদের সাথে নিয়ে খোকসায় কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর একটাই স্বপ্ন, তিনি খোকসাকে ঢাকা করবেন। খোকসার মানুষকে শিক্ষিত করবেন।
সকল প্রতিকূলতা দূরে সরিয়ে কঠোর শ্রম, মেধা, গভীর মমত্ববোধ ও আন্তরিকতায় খোকসা ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পৈতৃক জমি বিক্রি করে কলেজ নির্মাণে ও পরবর্তী বিভিন্ন সময় কলেজের প্রয়োজনে অর্থ যুগিয়েছেন। কলেজের আর্থিক দৈন্যতা কাটাতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গুড়, পাট সংগ্রহ করেছেন। গ্রামের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে সেগুলো অন্যদের সাথে তিনিও কাঁধে করে কলেজ প্রাঙ্গনে নিয়ে আসতেন। কলেজের ঘর নির্মাণে তিনি মিস্ত্রিদের সাথে কাজ করেছেন।
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন জনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা করতেন। কলেজের লাইব্রেরীর বই সংগ্রহ করার জন্য কলেজের উপাধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসকে সাথে নিয়ে ছুটে গেছেন পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর ব্যবসায়ী শঙ্কর মেহতার কাছে। সেসময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, “বিভিন্ন সময় কলেজের শিক্ষকদের বেতনের টাকার জন্যে গোলাম কিবরিয়ার (তৎকালীন এম.পি) কাছে যেতাম। সাথে ব্যাগ ভরে নিতাম ক্ষেতের মটর শাক। তিনি মটরের শাক খুব পছন্দ করতেন। সেই শাক রান্না হলে গোলাম কিবরিয়া সাহেব আমাকে সাথে নিয়ে ভাত খেতেন। এরপর তিনি কলেজের জন্য টাকা দিতেন। এভাবে বেশ কয়েকবার তাঁর দেয়া টাকায় শিক্ষকদের বেতনের ব্যবস্থা হয়েছে।
ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণে রয়েছে তাঁর অগাধ দখল। অনেকে মনে করেন, দ্বিজ্দ্রেনাথ বিশ্বাস নিজেই একজন ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। কলেজে ক্লাশের বাইরেও তিনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকটা জোর করেই ইংরেজি শিখিয়েছেন। পরিবার ও নিজের সন্তানদের চেয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই তিনি বেশি আপন করে নিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের পিছনেই তিনি তাঁর আয়ের সর্বস্ব ব্যয় করেছেন। নিজের পৈত্রিক জমি বিক্রি করে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার খরচ মেটানোর নজিরও রয়েছে তাঁর। আর এভাবেই তিনি ছাত্র-ছাত্রীর হৃদয়ে গন্ডি ছাড়িয়ে অভিবাবকদের মনে একজন সফল ও মহান শিক্ষক হিসেবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। কলেজের দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক ছাড়াও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ সেরা রোভার এবং স্কাউট কমান্ডারের স্বীকৃতি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয়ভাবে। সমাজের অসহায় অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন অভিবাবকের মতো। বিত্তবান পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করেছেন, চলেছেন সাধারণ মানুষের কাতারে।
তার মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার খোকসা সরকারি কলেজ, জেলা আওয়ামীলীগ, স্থানীয় সাংসদ, খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠন, খোকসা প্রেস ক্লাবসহ উপজেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে।
