দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ২২ দশমিক ৪ শতাংশই কোচিংয়ের সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ শিক্ষকই তার নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করান। দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এ গবেষণার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

দেশের ৬০০ সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন হাজার শিক্ষকের ওপর গত এক বছর গবেষণামূলক জরিপ চালায় ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ‘চতুর্থ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের আলোকে বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের শিক্ষকবৃন্দ’ শিরোনামে এডুকেশন ওয়াচ ২০১৮-১৯ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গতকাল রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেনÑ শিক্ষাউপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক সেলের মুখ্য সমন্বয়ক মো: আবুল কালাম আজাদ। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের ভাইস চেয়ার অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপনা করেন এডুকেশন ওয়াচ প্রতিবেদন ২০১৮-১৯ এর প্রধান গবেষক সমীর রঞ্জন নাথ।

এডুকেশন ওয়াচ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোচিং করানোর হার ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এ হার ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া এলাকার দিক থেকে শহর অঞ্চলের শিক্ষকদের মধ্যে প্রাইভেট টিউশনের হার বেশি। শহর অঞ্চলের ৩০ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষক প্রাইভেট টিউশনের সাথে জড়িত, যেখানে গ্রাম অঞ্চলে এ হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিষয়ভিত্তিক দিক থেকে গণিতের শিক্ষকরা কোচিংয়ে সবচেয়ে বেশি জড়িত। গণিতের প্রায় ৫১ শতাংশ শিক্ষকই কোচিং করান। ইংরেজি, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের মধ্যে এ হার যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৫, ২৮ দশমিক ৩ ও ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া প্রাইভেট কোচিংয়ের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ শিক্ষকই নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়ান।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ শিক্ষকই পাঠাদনের ক্ষেত্রে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করছে না। শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ শিক্ষাক্রম, শিক্ষানীতি ও এসডিজিরি মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানেন না। এ ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষকেরই শিক্ষকতার বাইরে অন্য পেশা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের পাঠদানের মূল পদ্ধতি হচ্ছে একতরফা বক্তৃতা। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত না করে একমুখী বক্তৃতা প্রদান হচ্ছে পাঠদানের সর্বাধিক ব্যবহৃত পদ্ধতি। পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন আসতে পারে, মূলত সেসব প্রশ্নে সম্ভাব্য উত্তর শনাক্ত করাই হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে পাঠন-পাঠনের মূল কর্মকাণ্ড। শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার সামর্থ্যরে ওপরই শিক্ষকদের বেশি সন্তুষ্ট থাকতে দেখা গেছে।

অনুষ্ঠানে উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কয়েকটি পাঠ্যবই পরীক্ষা করে দেখেছি, সেখানে যে ধরনের কনটেন্ট দেয়া হয়েছে, তার ৫ থেকে ৭ শতাংশের বেশি একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের পাঠ্যবইগুলো আরো শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে। দুর্বোধ্য বইয়ের কারণেই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের না শিখিয়ে অনেকেই এই সুযোগ ব্যবহার করেই আলাদাভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ানো ও গাইড বইয়ের বাণিজ্য করছে।

শিক্ষা উপমন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। ম্যানেজিং কমিটিতে যদি শিক্ষিত লোক না থাকেন, তাহলে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। আসলে শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সব অংশীজনদের এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রাইভেট টিউশন কিংবা গাইড বইয়ের যে বাণিজ্য সেখানে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা দুইটি শ্রেণীই রয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও কোচিং ও গাইড বইয়ের মাধ্যমে সন্তানের জন্য বাড়তি কিছু পাওয়ার এক ধরনের প্রবণতা রয়েছে। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উপমন্ত্রী বলেন, আমরা সমালোচনা চাই তবে, সুনির্দিষ্ট সমাধানের কথাও চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।