ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা; ২০১৩ আগে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৩৭ হাজার। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সরকার একসঙ্গে সারাদেশের ২৬ হাজার ১৬৫টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে। শুরু থেকেই পুরোনো এই ৩৭ হাজার ও নতুন জাতীয়করণ হওয়া ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল। সম্প্রতি চাকরির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে তা চরমে উঠেছে। এ নিয়ে দুই পক্ষই আদালতে মুখোমুখি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হবে না। কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৭ সালে সারাদেশে চাকরিতে জ্যেষ্ঠ ১৮ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে নতুন ও পুরোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, জাতীয়করণের সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মোট চাকরিকালের অর্ধেক সময়কে সরকারি হিসেবে গণনায় নিয়েছে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষকের মোট চাকরিকাল ১৪ বছর হলে তা সরকারি চাকরির গণনায় সাত বছর বলে গণ্য করা হয়েছে। অথচ এই শিক্ষকরা দাবি করছেন, তাদের চাকরিকালের পুরোটাই সরকারি হিসেবে গণ্য করতে হবে। এই দাবি পূরণে তারা উচ্চ আদালতেও গেছেন।
রংপুর ক্যাডেট কলেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রওশন আরা বীথি জানান, ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। তাদের নিয়োগের সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। তাই ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের চেয়ে জ্যেষ্ঠ হতে পারেন না। কারণ তাদের নিয়োগের সার্কুলার ২০১২ সালের। তিনি জানান, পুল ও প্যানেলভুক্ত শিক্ষকরা পরে ২০১৬ সালের ১ জুলাই চাকরিতে যোগ দেন। এখন তারাও জ্যেষ্ঠতা দাবি করছেন।
২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৬৫টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে পুরোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নতুন জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে গেজেট, চাকরিজীবনে প্রাপ্ত টাইমস্কেল, পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বিধিবহির্ভূত সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ পুরোনো বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের।
অন্যদিকে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের দাবি, সরকার দিয়েছে বলেই তারা এসব সুবিধা পেয়েছেন ও নিয়েছেন। এতে অন্যদের নাক গলানো ঠিক নয়।
সর্বশেষ ২০১৮ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দিয়ে পরিপত্র জারি করা হয়। এতে এই দুই ধরনের শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব আরও চরম আকার ধারণ করে। জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে তাদের আগের (জাতীয়করণ করার আগের) চাকরিকালের ৫০ শতাংশ হিসাবে নিয়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের দাবি করেন। কিন্তু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ বিধি-২০১৩-এর গেজেটের বিধি ৯-এর উপবিধি ১-এ বলা আছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিধি ৪-এর অধীন কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার তারিখ থেকে কার্যকর চাকরিকালের ভিত্তিতে শিক্ষক পদে তার জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হবে এবং ওই তারিখের অব্যবহিত পূর্বে নিয়োগবিধির অধীন শিক্ষক সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে ওই শিক্ষকের অবস্থান নির্ধারিত হবে।
নিয়োগবিধি অনুযায়ী, ২০১২ সালের আগে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠ ধরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে পুরোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮ হাজার সিনিয়র সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দিলে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক মামলা করে তা আটকে দেন। পরে পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আদালতে যান। আইনি লড়াই শেষে বিচারিক রায় পক্ষে আসায় তারা প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব পান।
পরে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা আত্তীকরণ গেজেট ২০১৩-এর বিধি ৯-এর উপবিধি ১ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন (রিট নম্বর ১৪৩৪৪/২০১৭)।
২০১৯ সালে এই রিটের শুনানির পর আদালতের রায় বাদীর পক্ষে যায়। পরে সরকার পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ৮ জানুয়ারি উভয় পক্ষের শুনানির পর আদালত আগের রায় স্থগিত করেন।
পদোন্নতিতে শুধু সাবেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নন, এমনকি জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ে ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্যানেল শিক্ষকরাও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের আগে জ্যেষ্ঠতা দাবি করেন।
পুরোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, জাতীয়করণের সময় অনেক শিক্ষক অতীতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যোগদানের প্রকৃত তারিখ গোপন রেখে অনেক আগে চাকরিতে যোগ দেওয়ার তথ্য দিয়ে শিক্ষা অফিসে আবেদন করেছেন। তাই তাদের ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক চাকরিকাল সরকারি হিসেবে যুক্ত করলে পুরোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষতি হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও নোয়াখালী সদরের কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, জাতীয়করণের ২০১৩ সালের গেজেট অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে দ্রুত সঠিক পরিপত্র প্রণয়ন করে সমস্যার সমাধান করা হোক। কারণ এ সমস্যা সমাধান না হলে অনেক বিদ্যালয় দীর্ঘদিনের জন্য প্রধান শিক্ষকশূন্য থাকবে। এতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে।
জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এম মনসুরুল আলম বলেন, তিনি এই মন্ত্রণালয়ে নতুন এসেছেন। বিষয়গুলো সম্পর্কে এখনও তার তেমন ধারণা নেই। তবে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সুস্পষ্ট বিধি আছে। সে অনুসারে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হওয়ার কথা।
আমাদের বাণী ডট কম.০১ মার্চ ২০২০/ভিএ
