যশোরে ঐতিহ্যবাহী সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এম এম) কলেজের আসাদ হলে ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনে দুই মেধাবী ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় চার বছরেও কেউ আটক হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার আসামি ছাত্রলীগের ১২ নেতাকর্মী ঘুরে বেড়াচ্ছে দাপটের সাথে। বরং হত্যাকাণ্ডের পর এক আসামি পায় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। অন্যদিকে, তাদের হুমকির মুখে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বাদি। নিহতের পরিবার অগত্যা বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছেন আল্লাহর ওপর।
সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে এম এম কলেজের আসাদ হল ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখানে ১২০টি সিট রয়েছে। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল ছাত্রলীগ সমর্থিত একদল যুবক এম এম কলেজের শহীদ আসাদ হলের দখল নেয়। এরপর থেকে এম এম কলেজে ছাত্রলীগ তাদের এক অধিপাত্য বিস্তার করে। হলের আসাদ হলের ২০১ নম্বর কক্ষকে টর্চার সেল বানানো হয়। ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর অর্থনীতি বিভাগের সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র কামরুল হাসান ও হাবিবুল্লাহকে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
সূত্র মতে, ওই দিন বেলা দেড়টার দিকে তাদের টর্চার সেলে নেয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে নির্যাতন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পুলিশ তাদের যশোরে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে বিকেলে হাবিবুল্লাহ মারা যায়। পরে ঢাকায় নেয়ার সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে পথে মারা যান কামরুল হাসান (২২)। পরিবারের দাবি ছাত্রলীগের ওই নির্যাতনে তাদের মৃত্যু হয়। কামরুলের বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ছোট খুদড়া গ্রামে। চার ভাই-বোনের মধ্যে কামরুল তৃতীয়। অন্যদিকে হাবিবুল্লাহর বাড়ি যশোরের শার্শায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে হাবিবুল্লাহ সবার ছোট। এ ঘটনায় আহত হন আরেক ছাত্র আল মামুন।
ছাত্রলীগের নির্যাতনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হাবিবুল্লাহ হুসাইন ও কামরুল হাসান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। উভয়ে এসএসসি ও এইচএসসিতে এ-প্লাস ও এ গ্রেড পেয়ে অনার্সে ভর্তি হন। থাকতেন কলেজসংলগ্ন ছাত্রাবাসে। নির্ঝর ছাত্রাবাস থেকে কামরুলকে আর আশিক ভিলা ছাত্রাবাস থেকে হাবিবুল্লাহকে ধরে আসাদ হলে নিয়ে তাদের নির্যাতন করে ছাত্রলীগ।
নিহতের স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, হাবিবুল্লাহ ও কামরুল অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ও পরস্পরের বন্ধু। পাশের মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন। এ কারণে শিবির সন্দেহে তাদের খাবার টেবিল থেকে ধরে এনে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত আসাদ হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
নির্যাতনে হতাহত ছাত্রদের নিজেদের কর্মী দাবি করে তখন শিবির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ‘এম এম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তিনটি ছাত্রাবাস থেকে ওই ছাত্রদের ধরে আসাদ হলের ২০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করেন। পরে পুলিশ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণাধীন হল থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে তখন ছাত্রলীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রলীগের কেউ কোনো নির্যাতন করেননি। আর আসাদ হল থেকে নয়, হলের পাশ থেকে পুলিশ তাদের নিয়ে গেছে। তবে তখন ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ। বাধ্য হয়ে এ ঘটনার ১৯ দিন পর আদালতে মামলা দায়ের করেন কামরুলের বড় ভাই ইব্রাহিম হোসেন। এই মামলায় ১৩ জনের নাম পরিচয় উল্লেখ করে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান রনি, যুগ্ম আহ্বায়ক ছানছাবিল আহমেদ জিসান, এম এম কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, কর্মী নূর ইসলাম, জামাল হোসেন, ইয়াসিন মোহাম্মদ কাজল ও সজিবুর রহমান। আদালত তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলাটি কোতোয়ালি থানায় পাঠায়।
ওই সময় এসআই সাহাবুল আলম বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেখানে নিহতদের শিবির সমর্থন উল্লেখ করা হলেও হামলাকারীদের কোনো পরিচয় না দিয়ে অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জন দুষ্কৃতকারী উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালের ৬ জুন ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এ রিপোর্টের ফলাফল কী তা-ও জানে না নিহতের পরিবার।
এদিকে, ঘটনার পর চার বছর হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আটক হয়নি কোনো আসামি। দুইজনকে প্রকাশ্য পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামিই সরকারি এম এম কলেজের ছাত্র এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার ২ নং আসামি ছানছাবিল আহম্মেদ জিসান ছিল যশোর শহর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রকাশ্যে ছাত্র নির্যাতনের ‘বীরত্ব’ দেখানোর পর সে এখন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। পদ নির্ধারণে এমন পন্থা অবলম্বন করায় দিন দিন ছাত্রলীগ হয়ে উঠছে আরো বেপরোয়া।
আসামিরা এক সময় আইনি প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতেও মরিয়া হয়ে ওঠে। বাদিকে হুমকি দেয়া হয়, মামলা তুলে না নিলে তাকেও একই পরিণতির শিকার হতে হবে। বাদি ইব্রাহিম হোসেন জীবনের নিরাপত্তার অভাবে মালয়েশিয়া চলে গেছেন। নিহত হাবিবুল্লাহর মা জয়নাব বেগম বলেন, এ ঘটনা সবার জানা। মামলা করে কী লাভ? বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি নিশ্চয় সন্তানহারা এ মায়ের দোয়া কবুল করবেন।
নিহত মেধাবী ছাত্র কামরুলের মা জাহানারা বেগম মামলার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানাতে পারিনি। তিনি বলেন, সন্তান কামরুলের মৃত্যু চোখের সামনে হয়েছে। কামরুলের শরীরের সেই নির্যাতনের চিহ্ন চোখের সামনে আজো ভেসে উঠলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তিনি বলেন, ছেলে হত্যার বিচার আল্লাহ করবেন।
মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুইজন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। আইনজীবী হিসেবে খুনিদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূর পরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। তিনি বলেন, দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেছেন, ঘটনার সময় আমি এ থানায় ছিলাম না। তাই, প্রকৃত ঘটনা ও মামলা সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, কোতোয়ালি থানায় এসআই সাহাবুল আলমের দায়েরকৃত মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। সৌজন্যে নয়া দিগন্ত
