Shadow

দেশের এই দুর্দিনে এলাকায় নেই এমপি-মন্ত্রীরা!

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের বাণী ডেস্ক, ঢাকা; বিশ্বে দাবানলের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে করোনাভাইরাস। মুহুর্তের মধ্যেই বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস টা। আক্রান্তের দিক থেকে চীন ইতালি স্পেনকে ছাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  বাদ যায়নি বাংলাদেশও। এরইমধ্যে দেশে ৪৮ জনের শরীরে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। মারা গেছেন ৫ জন।

করোনা ভাইরাসে দেশজুড়ে চলছে অঘোষিত লকডাউন। স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম। ঘরে বন্দি হয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সব জেলার মানুষ।

এমন ভয়াবহ অবস্থায় শ্রমজীবী মানুষের পাশে নেই স্থানীয় এমপি-মন্ত্রী এবং জনপ্রতিনিধিরা। তারা করোনা আতঙ্কে নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকা ছেড়েছেন। করোনার প্রকোপে তারা এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ঢাকায় বসে মোবাইলফোন এবং ভিডিও বার্তা দিয়ে দায়সারা দায়িত্ব পালন করছেন।

অনেকে ঢাকায় বসে মাস্ক ও স্যানিটাইজার নিয়ে ছবি তুলে পোস্ট দিচ্ছেন। অথচ প্রতিটি এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যার সবার আগে এগিয়ে আসার কথা তিনিই নির্বাচনি এলাকা ছেড়ে রাজধানীতে অবস্থান করছেন।

যা নিয়ে ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। সুশীল সমাজের মধ্যেও ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ভাইরাস প্রতিরোধ সামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

স্থানীয় সাংসদরা নির্বাচনি এলাকায় না গেলেও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তারা নিজ নিজ উদ্যোগে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্য বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন।

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে করোনা ভাইরাস দেখা দেয়। প্রাণঘাতী ভাইরাসটি দেখা দেয়ার পর থেকে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে লিফলেট বিতরণসহ জনসচেনতামূলক কার্যক্রম করে স্থানীয় এমপি-মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা।

কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় দেশজুড়ে গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশের সব দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানচলাচল, অফিস-আদালত এবং জনসমাগম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সরকারের অঘোষিত লকডাউনের সিদ্ধান্ত আসার পর এলাকা ছেড়েছেন অধিকাংশ সাংসদ। ঘরবন্দি হয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন না কেউই।

জেলা প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্য মতে, করোনা ভাইরাসে নিজ নির্বাচনি এলাকায় যাননি সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোহাম্মদ নাসিম, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এমপি তানভীর ইমাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আব্দুল মমিন মণ্ডল ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের হাসিবুর রহমান স্বপন।

এছাড়া সিরাজগঞ্জ-৩ ডা. আব্দুল আজিজ গত শনিবার নিজ নির্বাচনি এলাকায় যান এবং দুই হাজার শ্রমজীবী মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন।

করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছে শরীয়তপুর জেলার মানুষ। জেলার সকল শ্রেণিপেশার মানুষ ঘরে বন্দি রয়েছেন। এ অবস্থায় এলাকায় যাননি শরীয়তপুর-১ আসনের এমপি ইকবাল হোসেন অপু ও শরীয়তপুর-৩ আসনের এমপি নাহিম রাজ্জাক। তবে গতকাল রবিবার এলাকায় গিয়েছেন শরীয়তপুর-২ আসনের সাংসদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, করোনা প্রতিরোধে আমার ইউনিয়নে মাত্র ৩০টি মাস্ক ও ১০টি ৫০ মিলি হেস্কিসল বোতল পাঠিয়েছেন এমপি সাহেব। এ সামগ্রী দিয়ে সর্বোচ্চ দুটি পরিবারকে দেয়া যাবে। অথচ ইউনিয়নে কয়েক হাজার পরিবার বাস করে।

পাঁচটি সংসদীয় আসন রয়েছে নেত্রকোনা জেলায়। করোনায় নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় যায়নি নেত্রকোনা-১ আসনের সাংসদ মানু মজুমদার, নেত্রকোনা-৩ আসনের অসীম কুমার উকিল, নেত্রকোনা-৪ আসনের রেবেকা মোমিন, নেত্রকোনা-৫ আসনের ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল এমপি। তারা সবাই ঢাকায় অবস্থান করছেন। নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু শুধু নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়েছেন। তিনি তার নির্বাচনি এলাকার সকল শ্রেণিপেশার মানুষের পাশে থাকার জন্য স্থানীয় সকল জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনাও দিয়েছেন।

করোনা ভাইরাসে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি করোনা আতঙ্ক উপেক্ষা করে সিটির প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

করোনা মোকাবিলায় সিটি মেয়র জনগণের পাশে থাকলেও রাজশাহী-১ আসনের ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-২ আসনের ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী-৩ আসনের আয়েন উদ্দিন, রাজশাহী-৪ আসনের ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, রাজশাহী-৫ আসনের ডা. মনসুর রহমান, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম এমপি এখনো নিজ নিজ এলকায় শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াননি। এদের কেউ বর্তমান ঢাকায় অবস্থান করছেন, কেউ বা নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করে নামমাত্র প্রচারণা করছেন।

রাজশাহী-২ আসনের ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আমার সিটি কর্পোরেশন এরিয়ার ৩০টি ওয়ার্ডে ১০ কেজি চাল, ডাল দেয়া হয়েছে। এখনো ১০০ টন চাল আমাদের হাতে রয়েছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে।

যশোর-১ আসনের সংসদ শেখ আফিল উদ্দিন আহম্মেদ তার নির্বাচনি এলাকায় করোনায় আতঙ্কিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ভিন্নচিত্র দেখা গেছে যশোর-২ আসনের এমপি মেজর জেনারেল (অব.) মো. নাসির উদ্দিন, যশোর-৩ আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদ, যশোর-৪ আসনের এমপি রণজিত কুমার রায়, যশোর-৫ আসনের এমপি স্বপন ভট্টাচার্যের এলাকায়। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়লেও তারা কেউই নির্বাচনি এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াননি।

  চাল কেলেঙ্কারি: চেয়ারম্যানকে বাঁচাতে গিয়ে ফাঁসলেন ইউএনও

যশোর-৫ আসনের এমপি ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, করোনার প্রকোপ বাড়ার পর আমি এলাকায় যাইনি। তবে প্রতিদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শ্রমবীজী মানুষের মাঝে খাবার বিলি করা হচ্ছে।  করোনার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সকল ইউনিটের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাই সেভাবেই কাজ করছেন।

করোনায় নিজ নির্বাচনি এলাকার যাননি সিলেট-১ আসনের সাংসদ ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও সিলেট-৪ আসনের সাংসদ ইমরান আহমদ চৌধুরী।

তবে অভিযোগ রয়েছে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই খুব কম নিজ নির্বাচনি এলাকায় যান সিলেট-৫ আসনের সাংসদ হাফিজ আহমদ মজুমদার, সিলেট-৬ আসনের সাংসদ নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং সিলেট-২ আসনের সাংসদ মুকাব্বির খান। তারা সবাই নিজ নিজ বলয়ের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রম সম্পাদন করেন। তবে করোনায় নিজ নির্বাচনি এলাকায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সিলেট-৩ আসনের সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।

সিলেট-৫ আসনের সাংসদ হাফিজ আহমদ মজুমদার  বলেন, আমি এখন ঢাকায় আছি। করোনার প্রকোপ রোধে আমি এলাকায় না গেলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মোবাইলফোনে নির্দেশনা দিচ্ছি এবং সব খবরাখবর রাখছি।

দেশে প্রতিটি জেলার মতোই করোনায় আতঙ্কে ঘরে বন্দি রয়েছেন নরসিংদী জেলার মানুষ। তারাও অন্যান্য জেলার মতো ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এ অবস্থায় তাদের পাশে নেই স্থানীয় সাংসদরা। মোট পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে শুধু দুজন সাংসদ তার নির্বাচনি এলাকায় গিয়েছেন। তবে তারাও চোখে পড়ার মতো কিছু করেননি। শুধু এসব সংসদীয় আসনের এমপি নয়, দেশের প্রায় অধিকাংশ এমপি-মন্ত্রীরা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন।

তারা ঢাকায় থেকে নিজ বলয়ের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে এলাকার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।

তবে বর্তমান সাংসদদের এমন আচারণে ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন- করোনা ভাইরাসে অনেক মানুষ বেকার হয়েছে পড়েছে। এই মুহূর্তে তাদের সবাইকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। কিন্তু এমপিরা তাদের জন্য কিছুই করছেন না।

এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা করোনা ভাইরাসে শ্রমজীবী মানুষের পাশে সেভাবে দাঁড়াতে না পারলেও বসে নেই সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তারা নিজ নিজ উদ্যোগে চাল-ডাল বিতরণ করছেন সাধারণ মানুষের মাঝে।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার মানবতা ও পরিবেশবাদী সংগঠন দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাসের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক যেগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সহায়তায় গত শনিবার ৫০ জন অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন।

শরীয়তপুরের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন আলোকিত বিলাসপুর এই সংগঠনের পক্ষ থেকে শরীয়তপুরের জাজিরায় করোনা সংক্রমণের কারণে যে সমস্ত শ্রমজীবী ও দিনমজুরের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে, যারা এখন পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন এমন ৭০ থেকে ৮০টি পরিবারকে ১০ কেজি চাল, দুই কেজি তৈল, দুই কেজি ডাল, দুই কেজি আটা এবং চারটি ডেটল সাবান প্রদান করার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে এই ত্রাণ সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন তারা।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিম গঠন করেছেন স্থানীয়রা। উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদ ও একটি পৌরসভার কর্মহীন দিনমজুর পরিবারের তালিকা তৈরি করে প্রায় ২০০ পরিবারকে দুই হাজার টাকার চাল, ডাল, আলু, তেল, লবণসহ নিত্যপণ্য পৌঁছে দেয়ার কাজে মাঠে রয়েছে। ইতোমধ্যে এই লক্ষ্য পূরণে তারা অর্থনৈতিক তহবিলও গঠন করেছে। শিগগিরই এই পণ্য পৌঁছে দেয়া হবে। খবর আমার সংবাদ এর

উল্লেখ্য, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও একজন করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এ নিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৯ জনে এবং মৃতের সংখ্যা ৫। আজ সোমবার (৩০ মার্চ ২০২০) দুপুর ১২টায় মহাখালীতে এমআইএসের সম্মেলন কক্ষ থেকে আইইডিসিআরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি জানিয়েছেন, এক চিকিৎসক ও নার্সসহ আরও ৪ জন সুস্থ্য হয়েছেন। এর মধ্যে এক জনের বয়স ৮০ এবং দুই জনের বয়স ৬০ এর উপর। এই প্রথম দেশে ষাটোর্ধ কোন ব্যক্তির সুস্থ্য হবার কথা জানালো আইইডিসিআর। সব মিলিয়ে সুস্থ্য হয়েছেন ১৯ জন।

আমাদের বাণী ডট কম/৩০মার্চ ২০২০/ভিএ 

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •