সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সবাইকে কমপক্ষে দু`বছর দেশের চরাঞ্চল অথবা দুর্গম এলাকায় চাকরি করতে হবে। দুর্গম এলাকার শিক্ষা বিস্তারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, শুধু যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে শিক্ষার আলো থেকে দুর্গম এলাকাগুলো ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে দেশের সব এলাকায় সুষম উন্নয়ন ঘটানো দরকার। একই সঙ্গে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) অর্জনের জন্যও এটি দরকার।
নতুন এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মতো নদীর চর এলাকার প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য `চর` ভাতা চালুর প্রস্তাব করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ কমিটির চাওয়া অনুসারে এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষকদের চর ভাতা চালুর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় এখনও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, শুধু চর এলাকার শিক্ষকদের জন্য চর ভাতা চালু করা হলে তাতে সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে। একই ধরনের ভাতা চেয়ে বসতে পারে হাওর, চা-বাগান, টিলাসহ দুর্গম এলাকার শিক্ষকরা। যদিও এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।
এ উদ্যোগ সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. এএফএম মনজুর কাদির সমকালকে বলেন, চরাঞ্চলের শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগ পাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষকদের অন্তত দুই বছর চর অথবা দুর্গম অঞ্চলে বাধ্যতামূলক চাকরি করতে হবে। এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ-বদলির নীতিমালা সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দশম সংসদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চরাঞ্চলে অবস্থিত স্কুলগুলোতে নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য `চর ভাতা` চালুর সুপারিশ করেছিল। বর্তমান একাদশ সংসদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, চর ভাতা চালুর বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনাধীন। তবে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা এ বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ দিতে আগ্রহ দেখায়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনজুর কাদির বলেন, চর ভাতা চালু বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় রাজি হয় না। এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে আরও কথা হবে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ ভাতা চালুর পক্ষে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন এ বিষয়ে
বলেন, চর ও দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের নিয়েই আমরা ভাবছি। বর্তমান বদলি নীতিমালায় ওইসব অঞ্চলের শিক্ষকদের উঠে আসার সুযোগ নেই। উপজেলাভিত্তিক এক-দুই বছর অবশ্যই শিক্ষকদের সেখানে থাকতে হবে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
এ উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন সমকালকে বলেন, ভাতা বা আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া দুর্গম চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য শিক্ষক নিয়োগ দিলে মেধাবী ও মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব সময়োপযোগী। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পাওয়া ৮০ শতাংশ শিক্ষকই নারী। এ বিষয়টি উপজেলার পরিবর্তে ইউনিয়ন বা গ্রামভিত্তিক নিয়োগকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নোয়াখালী সদর উপজেলার কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির উদ্দিন বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চরাঞ্চলে ২ বছরের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়োগ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে মেয়াদ শেষে তাদের বদলি যেন অনলাইনভিত্তিক করা হয়। এতে তাদের ভোগান্তি কমবে।
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার মৈশাষী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলে বাধ্যতামূলক দুই বছর চাকরি করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে এ জন্য তাদের অতিরিক্ত ভাতা অবশ্যই দিতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়া দৌলত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গোফরান মোস্তফা খান বলেন, যিনি বা যারা চরাঞ্চলের শিক্ষক, তাদের অবশ্যই আলাদা ভাতা দেওয়া যেতে পারে। তাতে তাদের কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হবে।
ভোলার দৌলতখান উপজেলার ৪৭ নং দক্ষিণ সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান বলেন, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে চরাঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের আকর্ষণীয় ভাতা দেওয়া উচিত।
রংপুর ক্যাডেট কলেজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রওশন আরা বীথি বলেন, চরাঞ্চলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কমপক্ষে দুই বছর বাধ্যতামূলক চাকরি করানোর উদ্যোগ কখনোই ফলপ্রসূ হবে না, যদি চর ভাতা না দেওয়া হয়। চর ভাতা দিলেই শিক্ষকরা চরাঞ্চলে কাজ করতে আন্তরিক হবেন।
সিরাজগঞ্জ সদরের চি দাসগাঁতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তানিয়া খাতুন বলেন, চর ভাতার মাধ্যমে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের চরে নিয়োগ এবং ২ বছর সেখানে পাঠদানের বাধ্যতামূলক বিষয়টিকেও সমর্থন করছি। এতে পিছিয়ে পড়া চরাঞ্চলগুলোর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) সেলিম হোসাইন বলেন, চরাঞ্চল ভাতা আসলেই জরুরি। ওখানে কেউ থাকতে চায় না। কারও স্কুলে যেতে লাগে পাঁচ মিনিট, কারও পাঁচ ঘণ্টা। আর একটা বিষয় মনে হয় জরুরি, প্রতি তিন বছর পর সব শিক্ষককে কাছাকাছি স্থানে অটো বদলি করা। কারণ অনেক সিনিয়রের চেয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়রের সমস্যা প্রকট। কিন্তু এ নিয়মে সে বদলি হতে পারে না।
নোয়াখালী সদরের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ মহীউদ্দিন বলেন, এটা ভালো উদ্যোগ। গত কয়েক বছর চরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে কাজ করছি। এখানে প্রচুর শিক্ষক সংকট। নতুন নিয়োগ দেওয়ার পর অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী। কিন্তু শিক্ষক ৩ থেকে ৪ জন। বেশিরভাগ স্কুলে স্থানীয়ভাবে প্যারা শিক্ষক রাখা হচ্ছে। তাই চরাঞ্চলের ভাতা দিলে হয়তো অনেকে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করবেন।
