করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব, বিপর্যয় থেমে নেই বাংলাদেশেও। প্রতিনিয়ত হু হু করে বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে কার্যত চলছে লকডাউন। জরুরী সেবা বাদে সবকিছু বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ে দেশের অর্থনীতির মুল চালিকাশক্তি কৃষিখাত। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে ও জনবিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই আর্থিক প্রণোদনা সাময়িক দেশের বিপর্যয় ঠেকাতে পারলেও দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ভয়াবহের দিকে যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বেরও একই দশা।

দেশের এমন পরিস্থিতে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘বিসেফ ফাউন্ডেশন’ জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের সামগ্রিক কৃষিখাতের সুরক্ষা ও সহায়তায় কতিপয় সুপারিশ সদয় বিবেচনার জন্য পেশ করেছে। বিসেফ ফাউন্ডেশন কৃষি সুরক্ষায় সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজ করতে সদা প্রস্তুত।

বিসেফ ফাউন্ডেশন মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তিনটি খাত বিবেচিত হয়ে আসছে। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প, প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স এবং কৃষিখাত। আমাদের অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচিত সামগ্রিক কৃষিখাতে যথাযথ মনোযোগ দেয়া হলে দেশে খাদ্যাভাব মোকাবেলা এবং এই খাতের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল এক বিরাট জনগোষ্ঠী তাদের জীবনমান টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যসমূহ (ফসল, শাক-সব্জি, ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ইত্যাদি) নায্যদামে বিক্রির ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হলে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে এবং আমরা বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয় এড়াতে সমর্থ হবো। কৃষিখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা করে এই খাতের জন্য আশু ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে সমগ্র জাতি এর সুফল পাবে।

এমতাবস্থায়, বিসেফ ফাউন্ডেশন নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ তুলে ধরছে :

ক) আশু করণীয় সমূহ :

১। সরকার কর্তৃক ঘোষিত আর্থিক সহায়তার আওতায় কৃষিকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিয়ে আপদকালীন নগদ অর্থসহ সুস্পষ্ট বরাদ্দ ঘোষণা এবং ব্যাংকিং খাতে সহজ নির্দেশনা পাঠনো যাতে প্রান্তিক কৃষি সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গ কোন হয়রানি ছাড়াই সহায়তা পেতে পারে। অবিলম্বে, এই খাতে হয়রানি বা অন্য যে কোন বিষয়ে অভিযোগ জানানোর মত একটি ‘হটলাইন’ চালু করা হোক।

২। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেয়া জরুরী ত্রাণ বা খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল, ডাল, আলু, তেল এর সাথে স্থানীয় অন্যান্য কৃষিপণ্য যেমন ডিম, দুধ, কলা, মাছ ও মাংস ইত্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা করে কৃষিখাতকে সচল রাখা।

৩। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনায় কৃষিজাত খাদ্য, বিশেষ করে নিরাপদ খাদ্য, উৎপাদন ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে কৃষক ও ভোক্তা নায্যমূল্য পায় তার জন্য উৎপাদন পরবর্তি প্রসেসিং, প্যাকেজিং, স্থানীয়ভাবে স্বল্পকালীন সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত গুদাম নির্মাণ ও পরিচালনা, বিশেষায়িত যানে পরিবহণ, ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এর জন্য ক্ষতিকর পেস্টিসাইড এর বিকল্প উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী উৎপাদনও এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৪। আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদ এর আওতায় কৃষি কমিটি গঠন এবং এলাকার কৃষিখাতকে সক্রিয় রাখার জন্য এনএটিপি প্রস্তাবিত “কমিউনিটি কালেকশন মার্কেটিং কমিটি (সিসিএমসি)” বা কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজ বা কৃষি সমবায় গঠনের পরিকল্পনা করা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর তত্ত্বাবধানে একটি ‘আন্তঃবিভাগীয় (কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ইত্যাদি) বিশেষ সেল’ গঠনের মাধ্যমে তাদের সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করা।

৫। আগামী ৬ মাস কৃষিপণ্য যথাঃ সবজি, ফল, ডিম, দুধ, মাছ ও মুরগি, ইত্যাদি পরিবহণের ক্ষেত্রে ৫০% কম খরচে সরকারী পরিবহণ (রেল, বিআরটিসি, নৌ, ইত্যাদি) সুবিধা প্রদান এবং বেসরকারী পরিবহণেও ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া।

৬। পচনশীল কৃষিপণ্য বহনকারী যানবাহনের চালক ও সহকারিদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিশেষ প্রণোদনা সহায়তা দেয়া এবং করোনা সংক্রমণরোধে তাদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সামগ্রি বিতরণ নিশ্চিত ও ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

খ) স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদী করণীয় সমূহঃ

৭। খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চলতি বাজেট এর কৃষি ভর্তুকির অর্থ জরুরীভাবে বরাদ্দ দেয়া এবং করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে কৃষিখাতকে সচল রাখতে ‘বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ’ ঘোষণা করা।

৮। অবিলম্বে সকল কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কিস্তি আগামি এক বছরের জন্য স্থগিত করা। আসন্ন বোরো মৌসুমে সরকারের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে নায্যমূল্যে ৫০ লক্ষ টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত এপ্রিল মাসেই ঘোষণা করা এবং অবিলম্বে ক্রয় নীতিমালা চূড়ান্ত করা।

৯। ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারিদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় এনে খাদ্য (ফিড), ঔষধসহ অন্যান্য সহায়ক সামগ্রী করমুক্ত ঘোষণা করা। সেচ এর ন্যায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি ও মাছের হ্যাচারির বিদ্যুৎ বিল বিশেষ রেয়াতি হারে প্রদানের সুযোগ প্রদান করা। এই খাতে তদারকি বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযথা মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা।

১০। সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উৎপাদকসহ খাদ্য ভ্যালু চেইনের বিভিন্ন অংশীজনদের সংগঠিত ও সহায়তা করা এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এ বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা।

১১। জাতীয় চাহিদা পূরণে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ও বিপণন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থাসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি দেশের সকল মানুষই সাধ্যমত এগিয়ে এসেছেন। সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই কঠিন সময় মোকাবেলা করা কঠিন। করোনা প্রাদুর্ভাবের এই ক্রান্তিলগ্নে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় দেশের সকল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। এই আন্তরিক তৎপরতার জন্য সকলকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিকে কৃষিকাজে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রেখে মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে। সরবরাহ, বন্টন ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির অসাধুচক্রের সৃষ্ট মারাত্মক সংকট মোকাবেলায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কমিউনিটিভিত্তিক আন্তঃবাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে জোর দিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত রবিবারে যথার্থই বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে আশ্চর্য এক সহনশীল ক্ষমতা এবং ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে জাতি মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, সে জাতিকে কোন কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

আমাদের বাণী ডট কম/০৮ এপ্রিল ২০২০/পিপিএম 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।