নাসির উদ্দিন সাগর, জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা, ঢাকা; করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বের ১১০টি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ১০০ কোটি শিশু-কিশোর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু-কিশোর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে চীনে। ওই তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। চীনে ২৩ কোটি ৩০ লাখ ও বাংলাদেশে ৩ কোটি ৬৭ লাখ শিশু স্কুলে যাচ্ছে না। ওই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের নাম।
এদিকে এখন থেকে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ দেশের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিকভাবে নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা আছে। গতকাল পর্যন্ত যারা আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন তাদের মাধ্যমে ছড়ালেও সর্বোচ্চ আগামী ২১ দিনের মধ্যেই তা প্রকাশ পাবে। ভাইরোলজির ভাষায় যাকে ‘পিক টাইম’ বলা হয়।
এ সময় সংক্রমিত হতে পারে অসংখ্য মানুষ। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমন আশঙ্কা করছেন দেশের ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা।
যেসব দেশে ভাইরাসটি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেই দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখা হলে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তবে এখনও যদি ছড়িয়ে পড়া দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে আনা হয় তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলছিলেন, ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, উচ্চ আয়ের উন্নত প্রযুক্তির রাষ্ট্রগুলো সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও নতুন করোনাভাইরাসে মহামারী ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার মূল কারণ, ওই দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সময়ের কাজ সময়ে করতে পারেনি। এসব দেশের প্রতিটিতেই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল আক্রান্ত দেশ থেকে আসা দু-একজন ব্যক্তির মাধ্যমে।
ভাইরোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব দেশে ভাইরাসটির ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেছে সেসব দেশে প্রথম ২ থেকে ৩ সপ্তাহ হাতেগোনা কয়েকজনের দেহে এটি শনাক্ত হয়। একটা পর্যায়ে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে।
এর কারণ, প্রথমে দেশে প্রবেশ করা সেই দু-একজন ব্যক্তি তাদের পরিবার থেকে শুরু করে যত মানুষের সংস্পর্শে গিয়েছেন, তাদের অনেকের দেহেই ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। এই ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো প্রকাশ হতে সাধারণত ১ থেকে ২ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। তাছাড়া সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লুর সঙ্গে এর উপসর্গগুলোর মিল থাকায় পরীক্ষা না করে, শুধু শারীরিক লক্ষণ দেখে এটি আলাদা করা সম্ভব হয় না।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক সময়। আমাদের হিসাব মতে, এই সময়ে দেশে নতুন করোনাভাইরাসের পিক টাইম হবে।
যা হওয়ার এই সময়ে হয়ে যাবে। তিনি বলেন, যেসব সতর্কতা এখন নেয়া হচ্ছে এগুলো আরও আগেই নেয়া দরকার ছিল। পিক টাইম হলে আরেকটি ডিজাস্টার ঘটবে। সেটা চিকিৎসক ও সেবাদানকারীদের ক্ষেত্রে। কারণ তাদের হাতে পর্যাপ্ত পার্সনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) নেই।
ফলে যারা চিকিৎসা ও সেবা দেবেন তারা ব্যাপকভাবে ভাইরাসটি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন। অধ্যাপক নজরুল বলেন, আমরা এ ধরনের ঝুঁকি থেকে অনেকাংশই নিরাপদে থাকতে পারতাম যদি সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়া দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে নিতে পারতাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের জন্য সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
দেশে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। বর্তমানে সেই সংখ্যা ২০ জন, যাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। অর্থাৎ ইতালি থেকে আসা ১৪২ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে দেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দেশের প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়।
এখন পর্যন্ত যে ২০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে তাদের সবাই কোভিড-১৯ এর মহামারী আক্রান্ত দেশ থেকে আসা বা তাদের পরিবারের সদস্য। অথচ শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসা যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখলে দেশ মহামারীর হুমকিতে পড়ত না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই মাসে সমুদ্র, সড়ক ও আকাশপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪২ জন। যাদের বেশির ভাগই কোভিড-১৯ এর মহামারী চলছে, এমন দেশ থেকে এসেছেন। সতর্কতার জন্য দেশের প্রবেশপথগুলোতে এসব যাত্রীর স্ক্রিনিং করা হয়।
তবে সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেতে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগায় স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে কেউ যে ভাইরাসটির বাহক তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাহকরা দেশে ফিরে বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে এসে নিজের অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, দেশের সম্ভাব্য মহামারী প্রতিরোধে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কোভিড-১৯ এর একটি জাতীয় রেসপন্স টিম গঠন করতে হবে। যার প্রতিটি কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে সরাসরি পরিচালিত হবে।
এদিকে গত ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী পহেলা এপ্রিল থেকে এইচএসএসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হবার কথা থাকলেও তা এই সময়ে হচ্ছে না বলে একাধিক বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বোর্ড চেয়ারম্যান জানিয়েছেন তারা এই পরীক্ষা এক মাস পিছিয়ে দিতে চান তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উপর এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বলে তারা জানিয়েছেন।
দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি শেষ হচ্ছে আর মাত্র দশ দিন পরে তবে বিষেজ্ঞদের মতামত আগামী ২১ দিন দেশের জন্য সর্বচ্চো ভয়াভহ অবস্থা বিরাজ করতে পারে। কেননা এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করা দেশ গুলোর দিকে তাকালে তাই জানা যায়। এমতাবস্থায় দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পহেলা এপ্রিল থেকে চালু করা হবে কি না ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকসহ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনায় চলছে কিভাবে ছুটি আরও বাড়ানো যায়। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ ২০২০) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বধোন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছিলেন তারা কমপক্ষে আরও দুই সপ্তাহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি দেওয়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রস্তাব এসেছে এই ছুটি একই সাথে রমাজন মাস ও ঈদের ছুটির সাথে করা যায় কি না (অর্থ্যাৎ ছুটি একবারে ঈদ পর্যন্ত) সেটাও ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে কমপক্ষে এক থেকে দুই সপ্তাহের ছুটি বাড়ানো হবে তা নিশ্চিত করেন এসব কর্মকর্তারা।
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস উৎকণ্ঠার মধ্যেই সদ্যসমাপ্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার উত্তরপত্রের ওএমআর শিট স্ক্যানিং স্থগিত করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। ফলে যথাসময়ে এ পরীক্ষার ফল প্রকাশে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
গত বুধবার (১৮মার্চ ২০২০) মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক স্বাক্ষরিত এক নোটিসের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। সেখানে মূল্যায়নকৃত খাতা নিয়ে বোর্ডে আসতে পরীক্ষকদের নিষেধও করা হয়েছে। বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, শুধু ঢাকা বোর্ড নয়, দেশের অন্যান্য বোর্ডও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দষ্ট কালের জন্য বন্ধের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা। তারা বলছেন বিশ্বের যে পরিস্থিতি তা এত সহজে ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রতিদিনই নতুন করে করোনায় আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সঠিক তথ্য প্রকাশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ সন্দেহাতীত সমালোচনায় হচ্ছে।
আমাদের বাণী ডট কম/২১ মার্চ ২০২০/সিপি
