কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ১৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের ২৮ মে, রোববার দেশের ২৬ তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তেরোটি বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি দেশের মধ্য-পূর্বাঞ্চলের এ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যার আতুড়ঘরে পরিণত হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিনিয়তই শিক্ষকদের গ্রুপিং, প্রতিহিংসামূলক মনোভাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, ছাত্র রাজনীতির নোংরা গ্রুপিং, পদ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি প্রভৃতি লেগেই আছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে রাজনীতিতেই ভবিষ্যত দেখে বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ শিক্ষক। প্রতিষ্ঠার এক বছর পর মাত্র ৭টি বিভাগে ৩০০ জন শিক্ষার্থী ও ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে শুরু হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম।
বর্তমানে এ বিদ্যাপীঠে ৬ টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছে বিভিন্ন বিভাগের আটটি ব্যাচ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ১৪ তম বছরে এসেও নানা সমস্যা আর অপূর্ণতায় আবদ্ধ। গেল বছরের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের ১৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প পাশ হলেও তা কবে নাগাদ শুরু ও শেষ হবে সেটাও শঙ্কা রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সেশন জট, শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম সংকট, অব্যবস্থাপনা, সুপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের অভাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা, জিমনেসিয়ামের অভাব, ভঙ্গুর চিকিৎসা সেবা, গ্রন্থাগার অব্যবস্থাপনা, হলগুলো ও ক্যাফেটারিয়ার খাবারে নিম্নমাণ, গবেষণায় যতসামান্য বরাদ্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সড়কের অভাব, পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব, তথ্যপ্রযুক্তিতে অনাগ্রসারতা, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব, রাজনীতি ও ধুমপান মুক্ত ক্যাম্পাসে সরব রাজনীতির প্রভাব, বিভিন্ন সময় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠা, অনিয়ন্ত্রিত মাদকের আগ্রাসনসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বরাবরই ব্যাহত হচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ছয় জন। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬ষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ হয় গত বছরের ৩১ জানুয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়টির চলমান শিক্ষক রাজনীতির প্রভাবে বিগত কোন উপাচার্যই সসম্মানে বিদায় নিতে পারে নি। মেয়াদ শেষ করতে পারেনি অনেকেই।
নিয়োগে দলীয়করণ ও পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ। এক পদে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তার থেকে নিচের পদে নিয়োগ দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি ব্যাচ স্নাতকোত্তর শেষ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক হয়েছেন ১৬ জন। শুধু ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকপ্রাপ্তই হয়েছেন ১৯ শিক্ষার্থী (৫জন শিক্ষক)।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থা : বিশ্ববিদ্যালয়টির ২১০ জনেরও অধিক শিক্ষকদের জন্য শিক্ষক ডরমেটরি রয়েছে একটি। যেখানে মাত্র ২০-২৫ জন শিক্ষকের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। আর কর্মকর্তা মাত্র ৬-১০ জন। আবার এ ডরমেটরির অবস্থাও একেবারে নাজেহাল। নতুন একটি ডরমেটরির কাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে। এদিকে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক হল রয়েছে মাত্র চারটি। যেখানে সর্বসাকুল্যে ৯০০-১০০০ জন শিক্ষার্থীর আবাসিক সমস্যা সমাধান হতে পারে। হলের ডাইনিংগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই কোন ভর্তুকি।
শিক্ষক সংকট ও সেশনজটে অধিকাংশ বিভাগ : বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ কয়েকটি বিভাগে সেশনজট লেগেই আছে। তার মধ্যে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ফার্মেসী, নৃবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, সিএসই, আইসিটি বিভাগগুলোতে সেশনজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুমের স্বল্পতা, শিক্ষকদের উদাসীনতা প্রভৃতি কারনে বিভাগগুলো সেশনজটের কবলে পড়ছে বলে শিক্ষার্থীদেও দাবি। ১৩ বছরে দেখা মেলেনি সমাবর্তনের : বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের আটটি ব্যাচ স্নাতক শেষ করলেও এখনও আয়োজন করা হয়নি কোন সমাবর্তনের। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে যে এবছরের শেষ নাগাদ না হলেও আগামী বছরের প্রথমেই সমাবর্তনের আয়োজন করা হবে। সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনে আমাদের মানসিকতার প্রয়োজন। আর সংকট শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয় পুরো বাংলাদেশেই একই অবস্থা। মেগা প্রকল্পের অর্থ আসলেই প্রধান ফটক করার চিন্তাভাবনা আছে এবং তা এ বছরেই হবে। সবার অংশগ্রহনেই এগিয়ে যাবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।