ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা;   রাজধানীর নিকেতনের গ্রান্ড প্রোপার্টিসের ৩৮৬৩৫ নম্বর মিটারে গত এপ্রিল মাসে বিদ্যুৎ বিল আসে ১৪০৯ টাকা। পরের মাসেই ঢাকা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ওই গ্রাহকের মে মাসের বিদ্যুৎ বিল দেয় সাত হাজার ৯৭ টাকা। গ্রাহক অভিযোগ জানালে বিতরণ কোম্পানির লোক এসে বিল সমন্বয় করে দেয়। পরে জুন মাসেও অতিরিক্ত বিল পান ওই গ্রাহক। জুনে তাকে পাঁচ হাজার ১১৪ টাকার বিল দেওয়া হয়। ওই গ্রাহক জানান, অভিযোগ করার পরও আবারও ভূতুড়ে বিল দেওয়া হয়েছে। বার বার এই দুর্ভোগ আর সহ্য হচ্ছে না।

রাজধানীর শেওড়াপাড়ার ডেসকোর গ্রাহক শামসুল হক জানালেন, তার মে মাসের বিল এসেছিল ৫০৩ টাকা, জুন মাসে এই বিল এক লাফে ৯ হাজার তিনশ’ টাকায় গিয়ে পৌঁছে। তিনি জানান, তার ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটেও মাত্রাতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এসেছে। যাকে বলা হয় ভূতুড়ে বিল।

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভোগান্তি চলছে করোনাকাল শুরুর পর থেকে। পরপর দু’মাস বিদ্যুতের মিটার রিডাররা গ্রাহকদের বাসায় যাননি। ঘরে বসেই আনুমানিক বিল করেছেন। অবশ্য বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রাহকদের আগের মাসগুলোর বিল পর্যবেক্ষণ করে এই আনুমানিক বিল করা হয়। এতে মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে অধিকাংশ বিলের মিল পাওয়ার কথা না। এগুলো এখন সমন্বয় করা হচ্ছে। কিন্তু আনুমানিক বিল সমন্বয়ের ফলে বহু গ্রাহক আবার নতুন করে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে ধরনা দিয়েও অনেকেই সঠিক সমাধান পাচ্ছেন না। ফলে দুর্ভোগ গ্রাহকদের পিছু ছাড়ছে না।

সরকারের নানা ঘোষণা, তদন্ত কমিটি, গণশুনানি কোনো কিছুতেই ভূতুড়ে বিল থেকে নিস্তার মিলছে না। অভিযোগের পর বিতরণ কোম্পানি কিছু গ্রাহকের বিল সমন্বয় করলেও দুর্ভোগের শেষ নেই।

এদিকে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মার্চ-এপ্রিলে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে। ভূতুড়ে বিলের অভিযোগ ব্যাপকভাবে আসতে থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্নিষ্ট বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করে। অনেককে শোকজ করা হয়। ঢাকার একটি বিতরণ কোম্পানির বেশ কয়েকজন জোনপ্রধান তাদের কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে জানিয়েছেন, তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শেই এ রকম বিল করেছেন। করোনা দুর্যোগে সংক্রমণ এড়াতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো মার্চ ও এপ্রিল মাসে ‘প্রাক্কলিত’ বিল করেছে। অর্থাৎ বাসায় না গিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বিল করা হয়েছে। এ সময় বহু গ্রাহকের ব্যবহূত ইউনিটের চেয়ে বিল কম-বেশি করা হয়। ফলে দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। পরে মে মাসের বিল মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে করতে বলা হয়। এই মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে করতে গিয়ে নতুন করে আরও প্যাঁচ লাগে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ কোম্পানিগুলো তদন্ত কমিটি গঠন করে। একাধিক কর্মকর্তা-কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত, কারণ দর্শানো নোটিশসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু জুনের বিদ্যুৎ বিলে আবারও একই সমস্যায় পড়েন অনেক গ্রাহক। তাদের অভিযোগ, ব্যবহারের অতিরিক্ত বিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যববস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমীর আলী বলেন, তারা এ মাসে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে বিল করেছেন। প্রতিটি গ্রাহকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার দেখে রিডিং নেওয়া হয়েছে। এরপরও কেউ অভিযোগ করলে তার সমাধান দেওয়া হচ্ছে।

অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, বিলের কাগজ নিয়ে তারা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে যাচ্ছেন। সেখানে যে সমাধান দেওয়া হচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়। বিদ্যুৎ অফিস থেকে বলা হচ্ছে, সরকারি রাজস্বের বিল কমানোর কোনো সুযোগ নেই। তবে মিটারে কোনো সমস্যার কারণে বিল কমবেশি হলে সেটা সমাধান করা হচ্ছে। এই করোনাকালে অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎ অফিস পর্যন্ত যাচ্ছেন না। ফলে তাকে অতিরিক্ত বিলই গুনতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত বিল দেওয়ার নির্দেশ : মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিদ্যুৎ বিভাগ একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছিল। সে সময় ডিপিডিসিও একটি কমিটি গঠন করে। যার প্রধান করা হয়েছিল সংস্থার নির্বাহী প্রকৌশলী (আইসিটি) এম এম শহিদুল ইসলামকে। সেই কমিটির সুপারিশে অতিরিক্ত বিল আদায় করায় একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল ডিপিডিসি। একই সঙ্গে ৩৬ জন আঞ্চলিক বা জোনপ্রধানকে (নির্বাহী প্রকৌশলী) শোকজ করেছিল। শোকজের জবাব দিতে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের আদেশেই অতিরিক্ত বিল করেছিলেন তারা। তারা জানিয়েছেন শহিদুল ইসলামই তাদের মেইল করে অতিরিক্ত বিল আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিল। ঢাকার কোন এলাকায় কতভাগ বাড়তি বিল করতে হবে তারও একটি তালিকা তাদের দিয়েছিলেন শহিদুল ইসলাম। সেই অনুযায়ীই বিল করেছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাই করতে কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিলের ধাপ প্রক্রিয়ার প্যাঁচে গ্রাহকরা :করোনা দুর্যোগে সংক্রমণ এড়াতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রাক্কলিত বিল করে। এ সময় অনেক গ্রাহকের ব্যবহূত ইউনিটের চেয়ে বিল কম করা হয়েছে। মে মাসের বিলে পূর্বের ব্যবহূত ইউনিট যুক্ত করে দেওয়ায় এক মাসে ব্যবহূত ইউনিটের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। এতে প্রকৃতপক্ষে উচ্চধাপের ফাঁদে পড়েছেন অনেক গ্রাহক। কারণ মাসিক হিসাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারে ইউনিটের দামও কম ধরা হয়। বেশি ব্যবহার করলেই ধাপে ধাপে ইউনিটের দরও বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের আবাসিক গ্রাহকদের (এলটিএ) বিলের ক্ষেত্রে লাইফ লাইন ধরেছে ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত। বিদ্যুতের সীমিত এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ৫০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীরা পড়বেন প্রথম ধাপে। এই ধাপ ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত। প্রথম ধাপে প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ৪ টাকা ১৯ পয়সা। দ্বিতীয় ধাপে (৭৬-২০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ৭২ পয়সা। তৃতীয় ধাপে (২০১-৩০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা। চতুর্থ ধাপে (৩০১-৪০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৩৪ পয়সা। পঞ্চম ধাপে (৪০১-৬০০ ইউনিট) প্রতি ইউনিটের দাম ৯ টাকা ৯৪ পয়সা এবং ষষ্ঠ ধাপে (৬০০ ইউনিট এর অধিক) প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ১১ টাকা ৪৬ পয়সা। ফলে ব্যবহূত বিদ্যুতের ইউনিট যত বেশি হবে বিল তত বাড়বে। এই উচ্চধাপের কারণে অনেকের বিলের পরিমাণ অনেক বেড়েছে।

গ্রাহকদের দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, অভিযোগ কমে এসেছে। অল্প কয়েকজনের বিলের বিষয়ে আপত্তি পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই-বাছাই করছে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চার কোটি গ্রাহকের তুলনায় অভিযোগের সংখ্যা নগণ্য। ওপর থেকে নির্দেশনার কারণে মাঠ পর্যায়ে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চালে নসরুল হামিদ বলেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন। অভিযোগটি যাচাই করতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র; সমকাল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।