মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মডেল হয়ে গড়ে উঠছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক বিদ্যাবাড়ী। ভিন্নধারার এ বিদ্যাবাড়ীর নাম ডাংগারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। পাঠ্যসূচির বাইরে শিশু শ্রেণি থেকেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনানো হয় শিক্ষার্থীদের।
পঞ্চম শ্রেণি পাস করতে করতে শিক্ষার্থীরা মোটামুটিভাবে জেনে যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একই সঙ্গে শিশুদের হৃদয়ে গেঁথে দেয়া হয় মানবতার বীজ। ভবিষ্যতে যাতে তারা পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চিন্তায় সমাজে অবস্থান করে এমন পরিবেশ সৃষ্টির শিক্ষা দেয়া হয় ওই বিদ্যালয়ে। বাবা মায়ের ¯েœহের পরশে ছাত্র ছাত্রীদের পড়ালেখা করা হয়। শ্রেণি কক্ষে কোন ছাত্রছাত্রী স্যান্ডেল বা জুতা পায়ে প্রবেশ করে না। শ্রেণি কক্ষ পরিচ্ছন্ন ও ধুলাবালিমুক্ত রাখতে এমন নিয়ম চালু করা হয়েছে বিদ্যালয়টিতে। ফুল ও ফলের ছবি এঁকে অংক শেখানো হয়। ইংরেজিতে পারদর্শী করতে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণমালা দিয়ে বাংলায় উত্তর লেখা হয়েছে ক্লাশের চারদিকের দেয়ালে। শিক্ষার্থীরা ক্লাশের বেঞ্চে বসলেই ইংরেজি শব্দের বাংলা উত্তর তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একই শব্দের উত্তর বারবার দেখার ফলে খুব সহজেই শিশুরা শব্দের অর্থ মনে রাখতে সক্ষম হয়।

শিশুদের হৃদয়ের মানসপটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগরিত করতে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আঁকা হয়েছে জাতীয় পতাকা। বিদ্যালয় ভবনে অংকিত আছে বঙ্গবন্ধু ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ছবি। বিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করা মাত্রই সেই সব ছবি চোখে পড়বে। স্কুলের অফিসকক্ষে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার রয়েছে। এই কর্ণারে দেশের মানচিত্র, জাতীয় চার নেতা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের প্ল্যাকার্ড, ভাষার দাবি আদায়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলার ছাত্রসভা, মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার, সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ১৪ বীরাঙ্গনা, পাকসেনা কমান্ডের আত্মসমর্পণ, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণের ছবি, সৈয়দপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও স্থানীয় বদ্ধভূমির ছবি স্থান পেয়েছে। ওই কর্ণারের চিত্র ও তথ্য বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনানো হয়। ওই গল্পের শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যার সমাপ্তি টানা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। এতে করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিশু শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মোটামুটি ইতিহাস জানতে পারে। বিশেষ করে লিঙ্গ সমতা শেখাতে শ্রেণি কক্ষের দেয়ালে বিভিন্ন লেখকের বাণি লেখা রয়েছে। যা দেখে শিশুদের মনে জাগরিত হবে ছেলে মেয়েতে কোন বিভেদ নেই।

এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জানতে অফিস কক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বই কর্ণার রয়েছে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বই নিয়ে শিক্ষার্থীরা টিফিন ও পড়ার অবসরে পড়ে। রয়েছে সততা স্টোর। এই স্টোর থেকে যে যার প্রয়োজনমত খাতা কলম কিনে টাকা রেখে যায়। ছোট বেলা থেকেই সৎভাবে গড়ে ওঠার প্রাথমিক ধাপ হিসাবে বেছে নেয়া হয়েছে এই সততা স্টোরকে। বিদ্যালয়ের এক কোণায় গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন শহিদ মিনার। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শহিদ মিনারে স্কুলের শিক্ষার্থীরা ফুল দেয়। শহিদ মিনারে মালা দেয়ার সময় কোন শিশু শিক্ষার্থী ভুলেও স্যান্ডেল বা জুতা পায়ে শহিদবেদীতে ওঠে না। এমনকি পাড়ার ছেলে মেয়েরাও খেলতে এসে ওই নিয়ম মেনে চলে। বিদ্যালয়ে নামাজ পড়ার জন্য রয়েছে নামাজঘর। আর পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে রয়েছে লাইব্রেরী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে লাইব্রেরীর নামকরণ করা হয়েছে। দেশের বরেণ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের নামে শ্রেণিকক্ষের নামকরণ করা আছে । এতে করে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এমন বরেণ্য ব্যক্তিদের নাম মনে রাখতে পারে। এছাড়াও ছোটবেলা থেকে সাংগঠনিক মনোভাব ও নেতৃত্ববোধ জাগাতে বিদ্যালয়টিতে স্টুডেন্টস কাউন্সিল, কাবদল, ক্ষুদে ডাক্তার, কিশোর-কিশোরী ক্লাব ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষা ভলানটিয়ার দল। কোন ছাত্র ছাত্রী স্কুলে অনিয়মিত আসলে তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করে শিক্ষা ভলানটিয়ার দলের সদস্যরা।

ডাংগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক দিকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। এজন্য এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবসর সময়ে খেলাধুলা আর গল্পের বই পড়ে সময় কাটায়। অপরদিকে এসব অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে প্রতিনিয়ত শিক্ষকরা ছাত্র ছাত্রীদের তালিম দিচ্ছেন। বিশেষ করে জাতীয় পতাকার মান বোঝাতে বিদ্যালয় চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে পতাকা স্তম্ভ।
অপরদিকে স্কুল পরিচালনায় জবাবদিহি করতে ও পরামর্শের জন্য অভিযোগ এবং পরামর্শ বাক্স বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর অভিভাবক, বিশিষ্টজনরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান বিষয়ে কিংবা শিক্ষকদের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ ও পরামর্শ বাক্সে পত্র ফেলতে পারেন। যা নিয়ে প্রতি সপ্তাহে অভিযোগ ও পরামর্শদাতা ও কর্মরত শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহি এবং পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে ১২৮ জন ছাত্র ছাত্রী অধ্যয়ন করছে।

মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে বসে কথা হয় প্রধান শিক্ষক শিবলি বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বাবা মো. সৈয়াদুল হকের কাছে দেশপ্রেমের শিক্ষা পেয়েছি আর মা কমলা বেগমের কাছে শিখেছি শিশুদের কিভাবে ভালবাসা আর ¯েœহের পরশে আবদ্ধ করা যায়। বাবা মায়ের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে কর্ম জীবনে প্রবেশ করি। এই বিদ্যালয়ে ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগ দেই। আমিই এই বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক। এর আগে যারা ছিল তারা সবাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে ভাবতে থাকি অজপাড়া গায়ের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে কিভাবে গড়ে তোলা যায়। আর শিক্ষার্থীদের মাঝে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কিভাবে উজ্জীবিত হবে এই চিন্তা করতে থাকি। পরে আমার ভাবনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষকদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়া আর বাস্তবে রুপ দেয়া খুব কঠিন কাজ। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজন অর্থের। এ ব্যাপারে সহকর্মী রামপ্রসাদ ও সহকারী শিক্ষা অফিসার মুসরাত জাহান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের অভয় আমার বন্ধুর পথচলায় একের পর এক সফল কাম হতে থাকি। তার মতে পরিকল্পনা আর সৎ মনোভাব নিয়ে কাজ করলে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। নিজের বেতনের টাকার সঙ্গে সহকর্মীদের আর্থিক সহায়তা আমার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সফলতা বয়ে এনেছে। যার কারণে আমি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার গৌরব ইতোমধ্যে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।
প্রধান শিক্ষক শিবলী বেগমের দেয়া তথ্য মতে, বিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি জাতীয়করণ হয় প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পর তথা ২০১৩ সালে। ৩৬ শতক জমির ওপর বিদ্যালয়টির অবস্থান। এই এলাকার বিশিষ্টজন মো. আব্দুল গফুর ফকিরের দানকৃত জমির ওপর গড়ে উঠেছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই সময়ে যারা এই বিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রণি ভূমিকা পালন করেন তারা হলেন কাদের বকস সরকার, শমসের উদ্দিন প্রাং, আনোয়ার আলী পীর, নাইমুল ইসলাম, ওসমান গনি মন্ডল, বশির উদ্দিন মন্ডল, আমির উদ্দিন মন্ডল, মজির উদ্দিন মন্ডল, আশরাফ আলী, ইয়াকুব আলী ও গোলাম হোসেন সরকার।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক বর্তমান বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রণোবেশ চন্দ্র বাগচী মুঠোফোনে বলেন সেদিন আমরা এলাকার শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষার বীজ বপণ করেছিলাম। আজ যোগ্য মানুষের হাতে তা বৃক্ষে রুপ নিচ্ছে। অর্থাৎ ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতিঘরে পরিণত হতে যাচ্ছে। এটিই সবচেয়ে আনন্দের। (ছবি আছে)
