মঞ্চনাটকের দারুন আকাল চলছে দেশজুড়ে। এজন্য নতুন নাটক যেমন মঞ্চে আসছে না, তেমনি নাট্যকর্মীরও খরা দেখা দিয়েছে। বিগত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নাটক যৌবন ধরে রেখেছিল। সেই সময় দেশে আন্দোলন সংগ্রাম ছিল বলেই হয়তোবা মঞ্চনাটকের প্রতি দর্শক শ্রোতার আগ্রহ ছিল। মঞ্চনাটকের এই খরার যুগে স্বস্তির বৃষ্টির মতো কাজ করেছে সৈয়দপুরে অনুষ্ঠিত হওয়া পাঁচ দিনের নাট্যউৎসব।

দর্শক শ্রোতারা দর্শনীর বিনিময়ে নাটক উপভোগ করেছে। পৌষের শৈত্যপ্রবাহেও নাটক পাগল মানুষের উপস্থিতি নাট্য বোদ্ধাদের হৃদয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করতে পেরেছে। গত ২০ ডিসেম্বর শরু হয়ে ২৪ ডিসেম্বর উৎসবের সমাপ্তি হয়।

শহরের মুর্তজা মিলনায়তনে প্রতিদিন দুটি করে শো মঞ্চস্ত হয়। প্রথম শো শুরু হয় সাড়ে ৬টায়। আর দ্বিতীয় শো রাত ৮টায় শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টায় শেষ হয়। উৎসবের পাঁচ দিনের মধ্যে চারদিনে চারটি নাটক এবং শেষ দিন দুটি নাটক পর পর মঞ্চায়ন করা হয়। প্রতিদিনই মুর্তজা মিলনায়তনে আশানুরুপ দর্শকের উপস্থিতি ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি দর্শকনন্দিত হয়েছে দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি থিয়েটারের নাটক ‘ছোবল’। এই নাটকে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের জীবন চিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মাদক ব্যবসা কিভাবে টিকে আছে, কাদের মদদে চলছে তা নিখুঁতভাবে অভিনয়ে তুলে ধরা হয়েছে।

কথা হয় এ দিনের নাট্য দর্শক সৈয়দপুর মহিলা কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ক্ষিতিশ চন্দ্র রায় ও অধ্যাপক সামসুল আলম শাহর সঙ্গে। তারা বলেন জাতীয় মানের নাট্যশিল্পীদের চেয়ে অভিনয় শৈলীতে কোন অংশে কম ছিলনা হিলি থিয়েটারের নাট্যকর্মীদের অভিনয়। সবচেয়ে বেশি বাজিমাত করেছে পার্বতীপুরের ইয়াং স্টার থিয়েটার। নাট্য উৎসবের শেষ দিন ২৪ ডিসেম্বর রাতে এই নাট্য দলটি পরিবেশন করে দেশ বরেণ্য নাট্যকর মামুনুর রশিদ রচিত নাটক ‘রাষ্ট্র বনাম’। লেখ্য ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার মিশেলে নাটকটি উপস্থাপন করা হয়। ফলে মুর্তজা মিলনায়তন দর্শক  শ্রোতায়  কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। নাট্যশিল্পীদের অভিনয় কৌশলে মুগ্ধ হয়েছে উপস্থিত শ্রোতারা। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুট, গরীব মানুষদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, চার্জশীট তৈরীতে পুলিশের অনৈতিকতা এবং ময়না তদন্ত রিপোর্ট পাল্টানোর বিষয়গুলো বেশ চৌকষতার সঙ্গে ফুটে উঠেছে অভিনেতাদের অভিনয়ে। সর্বোপরি বিচারের বাণী আজও নিভৃতে কাঁদে এমন ঘটনাই রাষ্ট্র বনাম নাটকে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

এদিকে থিয়েটার সৈয়দপুর এর পরিবেশনা ছিল ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’। অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান রচিত এই নাটকটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন নাট্যজন আকতারুল ইসলাম মৃধা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক হীরা শর্মা। এই নাটকের কুশীলবরা হীরা শর্মার নির্দেশনায় একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে নাটকটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে কাজী আনিছুর রহমান, খলিলুর রহমান, ফারজানা আকতার, নাসিম রেজা শাহ ও মীর সরওয়ার আলী মুকুলের অভিনয় অনবদ্য ছিল বলে একাধিক দর্শক শ্রোতারা তাদের মন্তব্যে জানিয়েছেন। এ নাটকটি মঞ্চায়ন হয় ২২ ডিসেম্বর।
এছাড়াও ২০ ডিসেম্বর নাটক ‘হাঁড়ি ফাটিবে’, ২৩ ডিসেম্বর ‘ক্ষুদিরাম কথা’ ও ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয় ‘বুদ্ধির ঢেঁকি’। এসব নাটক পরিবেশন করে ঢাকার এথিক, পার্বতীপুরের প্রগতি সংঘ ও ডোমার সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ।

কথা হয় আয়োজক সংগঠন থিয়েটার সৈয়দপুর এর সাধারণ সম্পাদক হীরা শর্মার সঙ্গে। তিনি বলেন বখে যাওয়া যুব সমাজকে সহজ সরল পথে ফিরিয়ে আনতেই নাট্যউৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার প্রত্যয়ে এবং মঞ্চ নাটকের প্রতি বিমুখ দর্শকদের মঞ্চে টানতে এই উদ্যোগ। নাট্যউৎসবকে ঘিরে সৈয়দপুরের পাঁচজন নাট্যকর্মীকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধিত নাট্যজনরা হলেন আনোয়ার হোসেন বাঙালী, শোয়াএব হোসেন (মরণোত্তর), তমিজুর রহমান তোফায়েল, স্বপন কুমার গুহ ও শাহানা বানু নীরা। উৎসবের উদ্বোধনী দিন ২০ ডিসেম্বর এসব গুণি ব্যক্তিদের উত্তরীয় ও ক্রেস্ট প্রদান করে সম্মানিত করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নাট্যজন মামুনুর রশিদ।

নাট্য উৎসবের অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দপুরের কৃতি সন্তান ঢাকা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান তার ব্যক্ত কথায় জানান, যুব সমাজকে নাটকে সম্পৃক্ত করতে ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট থিয়েটার সৈয়দপুর জন্ম নেয়। পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে সংগঠনটি আট বছরে পা দিয়েছে। তাই সংগঠনের অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে নাট্যউৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

তার মতে, বর্তমান মঞ্চ নাটকের খরা যুগে এমন অনুষ্ঠান করবার জন্য পৃষ্ঠপোষকের বড়ই অভাব। তাই সংগঠনের সদস্যরা নিজের টাকা চাঁদা করে নাট্য উৎসব করার জন্য ফান্ড করেছে আর এই অর্থ দিয়েই উৎসব শুরু করা হয়। তার মতে ভাল জাতের বৃক্ষ রোপণ করলে ভবিষ্যতে ভাল ফল মিলবে, এটি নিশ্চিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।