ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা; দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল মিলিয়ে অন্তত ১৮ জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল টানা তিন সপ্তাহ ধরে বানের জলে ভাসছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলা দফায় দফায় বন্যার শিকার হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, চলমান বন্যায় দেশের অন্তত ৩১ শতাংশ নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। গত শনিবার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে, তাতে আগামী কয়েক দিনে প্লাবিত এলাকা আরো বাড়বে।
আরো সাত থেকে ১০ দিন পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বন্যা এবার দীর্ঘায়িত হলো। কোথাও দ্বিতীয় দফা চলছে, কোথাও তৃতীয় দফা বন্যা শুরু হলো। অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নেমে যাওয়ার সময়ই পেল না। অন্তত তিন সপ্তাহের বেশি টানা দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন বানভাসিরা।’ ঢাকাসহ মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে একই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর ও নওগাঁ জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে।
গতকাল রবিবার দুপুরে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এমন পূর্বাভাস দিয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বাড়তে পারে। আর ঢাকা জেলার আশপাশে নদীর পানি বাড়ছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে বন্যায় ১৭টি জেলা আক্রান্ত। ১৮টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মোট ২৮টি পয়েন্টে এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। গত শনিবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সময়ে ১০১টি পানি পর্যবেক্ষণাধীন স্টেশনের মধ্যে ৪৪টির পানি বাড়ছে, ৫৪টির কমছে এবং তিনটির অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারত অংশের কোথাও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়নি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এক মাসের মধ্যে তিন দফায় দেশের ৩১টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, তিন বছর আগেও বন্যায় দেশের ৪২ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সে হিসেবে এবারের বন্যার ব্যাপ্তি ততটা মারাত্মক হয়নি। কিন্তু স্থায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এত দীর্ঘ সময় বন্যা থাকলে বাঁধ টেকে না, নদীর পাড় ভাঙে বেশি; রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ে।
তিনি জানান, গেল বছর ১২ জুলাই বন্যা শুরু হয়েছিল। এবার শুরু হয় ২৬ জুনের দিকে। গতবার দুই-তিন দফা বন্যা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এমনিতে প্রতিবার বন্যা ১০ থেকে ১৪ দিনের মতো স্থায়ী হয়, পরে পানি নেমে যায়। কিন্তু এবার দুই ঢলের মাঝে সময়ের ব্যবধান কম হওয়ায় ইতোমধ্যে টানা বন্যার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এত আগে শুরু হয়ে টানা এত দিন থাকায় বিষয়টি একটু আলাদা। এবারের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে বন্যা একটু আগেই শুরু হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ১৯৮৮ বা ১৯৯৮ সালের বন্যার মতো অবস্থা এখনো হয়নি, তেমন আশঙ্কাও করছি না এবার।’ ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের ৬১ শতাংশ এলাকা দুই মাস ধরে, ১৯৯৮ সালের বন্যায় ৬৮ শতাংশ এলাকা এক মাস ধরে প্লাবিত ছিল বলে প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান।
পদ্মায় অস্বাভাবিক স্রোত: পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে প্রবল স্রোতে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বেশ কিছুদিন যাবৎ। তীব্র স্রোতের কারণে নদী পার হতে এখন দ্বিগুণেরও বেশি সময় লাগছে। কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের চারটি ঘাটের মধ্যে ১নং ঘাট পানিতে ডুবে গেছে। ঘাটের পন্টুন পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি তিনটি দিয়ে ওঠানামা করছে ফেরির পরিবহন।
এ রুটে চলাচলকারী ১৭টি ফেরির মধ্যে মাত্র ৯টি দিয়ে সীমিত আকারে নদী পারাপার করা হচ্ছে। ফলে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ৬ শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়েছে। গত কয়েক দিন ধরেই তীব্র স্রোতের কারণে রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। সকালে আবার ফেরি চলাচল শুরু হয়।
এ ছাড়া এই রুটে ৮৭টি লঞ্চ ও শতাধিক স্পিডবোট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে যাত্রীরা ফেরিতেই পার হতে চাচ্ছেন।
বিআইডব্লিউটিসির কাঁঠালবাড়ি ঘাটের ব্যবস্থাপক আবদুল আলীম মিয়া জানান, তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ রুটে চলাচলকারী ৬টি ডাম্প ফেরি চলতে পারছে না। এ ছাড়া তীব্র স্রোতের কারণে একটি রোরো ফেরি ইঞ্জিনের ক্ষমতা বাড়িয়ে চালানোর কারণে ইঞ্জিন কিছুটা বিকল হয়ে পড়েছে। সেই কারণে শাহ-মুখদুম ফেরিটি এখন নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে রয়েছে। ফলে মাত্র ৯টি ফেরি দিয়ে সীমিত আকারে নদী পারাপার করা হচ্ছে। পদ্মার দুই পাড়ে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে সহস্রাধিক যানবাহন।
শেরপুর: জেলায় আবারো বেড়েছে বন্যার পানি। এ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এর আগে ১৯ জুলাই থেকে টানা দুই দিন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, সদর উপজেলায় বন্যার পানি বাড়ায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী ৪টি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এ ছাড়া জেলার শ্রীবরদী উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম, নালিতাবাড়ীর ৪টি ইউনিয়নের ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নকলার ৫টি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এ অবস্থায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। আর এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
কালিয়াকৈর (গাজীপুর): কালিয়াকৈরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে চলাচলের প্রধান প্রধান সড়ক, হাট বাজার, স্কুল কলেজ, বাড়িঘর। অনাবরত বেড়েই চলছে বন্যার পানি। অব্যাহত পানির বৃদ্ধিতে উপজেলার প্রধান কিছু সড়ক প্লাবিত হয়েছে যার ফলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর) আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, কালিয়াকৈরে বন্যাদুর্গত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার পরিবারের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা ঘরবাড়ি হারা তাদের নিরাপদ স্থানে ঘরবাড়ি করে দেয়া হবে এবং যাদের ঘরবাড়ি করার জমিও নেই তাদের সরকারি জমিতে ঘর করে দেয়া হবে।
ইসলামপুর (জামালপুর): জামালপুরে তিন দফা বন্যায় দীর্ঘ ২৬ দিন যাবৎ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। খাদ্য সংকটে রয়েছে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের পরিবার। বানভাসিদের দুর্ভোগ কমাতে খাদ্য সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে উপজেলা প্রশাসন।
যমুনা নদীর পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি পরিবারের অভিযোগ করোনার পর দীর্ঘ দিনের বন্যায় তাদের রোজগার বন্ধ থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছে।
আগামী মাসে উন্নতি: তবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বন্যার উন্নতির আভাস দিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী তিন-চার দিন ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারি বর্ষণ হতে পারে। এ সময় বহ্মপুত্র-যমুনার পানি স্থিতিশীল থাকবে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ারনিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নওগাঁ জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। দেশের নদ-নদীগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০১টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৪৩টি পয়েন্ট শনিবার পানি বেড়েছে; কমেছে ৫৮টি পয়েন্টে। ১৭টি নদীর ২৭টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার পেরে বয়ে যাচ্ছে।
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জমান ভূইয়া বলেন, ‘চলমান বন্যা পরিস্থিতি চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’ ঢাকার আশপাশের ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে বয়ে চলায় নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি এক সপ্তাহ দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে জানান তিনি।
সাপে কাটা রোধে সুপারিশ: বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মোহন কুমার দাশ জানান, উত্তরবঙ্গের অনেক জেলা বরাবরই বন্যাপ্রবণ। সেখানে চরাঞ্চলে বন্যার সময় নানা রোগের পাশাপাশি সাপের দংশনেও অনেকের মৃত্যু হয়। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া (বিশেষ করে মহিলা ও শিশু), নৌ দুর্ঘটনা, সাপের ছোবলে মৃত্যু প্রতিবারের মতো এবারের বন্যায়ও হচ্ছে। উত্তরণের ব্যবস্থা হিসেবে জনসচেতনতা, উন্নতমানের নৌ ব্যবস্থাপনা, কার্বলিক এসিড, এন্টিভেনম সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা দরকার। বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বিভিন্ন অধিদফতরের মধ্যে আরো বেশি সমন্বয়ের প্রয়োজন বলে মনে করেন এ গবেষক।
সূত্র; মানবকন্ঠ
