চলতি মাসের ১৭ তারিখের কথা। তপ্ত দুপুর। সিদ্ধেশ্বরী কলেজ থেকে বের হয়েছি একটি চাকরির লিখিত পরীক্ষা দিয়ে। সাথে ছিলো খালাতো ভাই জাহিদ। দুজনেই ক্ষুধার্ত। এতো ক্ষুধার্ত যে চোখে অন্ধকার দেখার মতো অবস্থা!তাই সময় নষ্ট না করে পাশের একটি হোটেলে ঢুকে পড়ি। এরপর পছন্দের পাপদা মাছ দিয়ে দুজন গোগ্রাসে খেলাম। যাকে বলে উদর পূর্তি করে খাওয়া। যেনো পেটের আগুন নিভলো!
উদর পূর্তির পর হঠাৎ মনে হলো অনেকদিন রমনা পার্কে যাওয়া হয়নি। শেষ কবে গিয়েছি মনে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে? না, মনে পড়ছে না। তাই মনস্থির করলাম রমনায় যাবো। দূরত্ব তো খুব বেশি না। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পায়ে হাঁটার পথ। রিকসা নিলে তো আরও কম লাগবে।
হেঁটে যাবো না রিকসায় যাবো এ নিয়ে ভাবতে ভাবতেই মনে হলো শরীরে ক্লান্তি ভর করেছে। দুপুরে খেয়েছি কিনা! অগত্যা রিকসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। দু-চারটা রিক্সাওলাকে ডাকলাম। তারা সবাই ভাড়া চেয়ে বসলো ৭০-৮০ টাকা। সাধারণত ২৫/৩০ টাকা ভাড়ায় রিকসা পাওয়া যায়।
এ সময় দেখতে পেলাম কিছুটা সামনেই রাস্তার পাশে একটি রিকসা। রিকসাওয়ালাও পাশেই আছেন। রমনা পার্ক যাবে কিনা জানতে চাইলাম। উত্তরে, জড়িয়ে যাওয়া কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জবাব দিলেন-’না বাজান যামু না। গরমে অস্থির লাগতাছে। অহনি খ্যাপ লইয়া আইলাম। একটু জিরাইতাছি।’
তার কথা শুনে স্বাভাবিক ভাবেই অন্য রিকসার জন্য সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। সামনে দু’পা ফেলতেই কেন যেন মনে হলো লোকটা অসুস্থ। পিছনে ফিরে তাকালাম। যা দেখলাম, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। বয়সের ভারে নুইয়ে পরা ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর।
কাছে এগিয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম-বয়স কতো? এই বয়সে কেনো রিকসা চালান?
উত্তরে বললেন, ‘আমি দেশ ভাগ দেখেছি। তখন বয়স ছিলো কুড়ি-বাইশ।’
কৌতুহল বাড়লো। ফের জানতে চাইলাম- ৭১ সালে বয়স কুড়ি-বাইশ ছিলো?
উত্তরে একটু হেসে বললেন- ‘৭১ তো গেল এই সেই দিন। দ্যাশ ভাগ হইয়া দুইডা দ্যাশ হইলো। একটা হইলো ইন্ডিয়া আর একটা হইলো পাকিস্তান। আমরা হইলাম পাকিস্তান।’
শিওর হলাম তিনি ১৯৪৭ সালের কথা বলছেন।
আমি ততোক্ষণে হিসেব শেষ করে ফেলেছি। তিনি এখন ৯২ বছরের বৃদ্ধ। যার সময় কাটার কথা নাতি-নাতনীর সাথে। কিন্তু…উত্তর মেলেনা!
জানালেন বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়েই তার সংসার। হেসেই বললেন। আমি স্পষ্টই বুঝলাম, হাসির আড়ালে তিনি কষ্টে গাঁথা জীবন যুদ্ধকে আড়াল করতে চান।
সন্তানদের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘দুইডা পোলা আছে আমার। লেহাপড়া করাইছি। দুজনে ভালো চাকরিও করে। দুজনেই আলাদা বাসা নিয়া থাহে।বেশ ভালোই আছে।’ হাসতে হাসতে বললেন, ’শুনছি ওগোরেও নাতিপুতি হইবো। শুইনা ভালাই লাগছে।’
৯২ বছর বয়সী এক রিকসা চালক, যার চাকুরীজীবী দু’টি ছেলে থাকা সত্বেও ক্ষুধার তাড়নায় প্রতিনিয়ত রিকসা নিয়ে ছুটতে হয় যাদুর শহরের এ গলি থেকে ও গলি। তিনি নিজে অসুস্থ হয়েও অবিরাম ছুটে চলেছেন অসুস্থ স্ত্রীর ওষুধ কেনার টাকা জোগারের জন্য।
হাসির আড়ালে চোখ থেকে গড়িয়ে পরা দুফোঁটা অশ্রুতেই জানিয়ে যায় তার জীবন যুদ্ধের গল্প। মুখটা আড়াল করে চোখের পানি মুছে আবার ছুটে চলেন অজানা জীবন সংগ্রামে।
