‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘কোমলগান্ধার’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো কালজয়ী বহু চলচ্চিত্রের পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈতৃক বাড়িটি ভেঙে ফেলছে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বাইসাইকেল গ্যারেজ তৈরির জন্য এরই মধ্যে বাড়িটির একটি অংশের পুরোটা ভেঙে ইট, সিমেন্ট ও সুরকি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রাজশাহীসহ দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। এরই মধ্যে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে রাজশাহীর প্রগতিশীল ১৩টি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

সংগঠনের নেতারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অতি দ্রুত বাড়ি ভাঙা বন্ধ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণসহ হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই ভিটায় ঋত্বিক ঘটক স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলারও দাবি উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নগরীর মিঞাপাড়ায় অবস্থিত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক ভিটার একটি অংশ ভেঙে এরই মধ্যে হোমিওপ্যাথিক কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষার্থী এবং কর্মচারীদের বাইসাইকেল রাখার জন্য গ্যারেজ তৈরি করা হয়েছে। ভেঙে ফেলা ওই অংশটি এরই মধ্যে ঘিরে ফেলাও হয়েছে।

রাজশাহী ‘কবিকুঞ্জের’ সভাপতি অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক জানান, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক কুমার ঘটক নগরীর মিঞাপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কাটিয়েছেন। এই বাড়িতে কিছু সময় বসবাস করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও। এই বাড়িতে থাকার সময় ঋত্বিক ঘটক রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। তিনি রাজশাহী কলেজ এবং মিঞাপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে কথাসাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ঋত্বিক ঘটক এই সময় রাজশাহীতে ‘অভিধারা’ পত্রিকা সম্পাদন করেছেন। বিলুপ্ত কল্পনা হলে ‘ভাবীকাল’ নামে একটি চলচ্চিত্রের ব্যানারও এঁকেছেন। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে যান। কিন্তু এই বাড়িটিই এখন ভেঙে ফেলা হচ্ছে নানা কৌশলে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, এই বাড়িটি এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৯ সালে নামমাত্র মূল্যে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজকে ইজারা দেওয়া হয়। তারাই এখন সম্পূর্ণ বাড়িটি ব্যবহার করছে। বাড়িটির এক অংশে ইতিমধ্যে বহুতল ভবন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আরেক অংশে যেসব কক্ষে ঋত্বিকরা থাকতেন সেসব কক্ষও ব্যবহার করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারাই এক অংশ ভেঙে অস্থায়ী বাইসাইকেল গ্যারেজ করছে।

রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. আনিসুর রহমান বলেন, এনিমি প্রপার্টি হিসেবে সরকার ৩৪ শতক জমি কলেজের নামে লিখে দেয়। সে হিসেবে পুরো বাড়িটিই কলেজের জন্য বরাদ্দকৃত জমি। এখন কিছু কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে কলেজ আরো সচ্ছল হলে তখন ওই সব ঘরও ভাঙা পড়বে। আর যে কক্ষটি ভাঙা পড়ছে সেই কক্ষটির অবস্থাও জরাজীর্ণ ছিল।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহম্মদ শরিফুল হক বলেন, ‘আমরা স্মারকলিপি পেয়েছি। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে কাজ বন্ধ করতে বলেছি। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

১২ চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রতিবাদ, হেরিটেজ ঘোষণার দাবি

ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ি ভেঙে ফেলার ঘৃণ্য উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ১২ জন চলচ্চিত্র নির্মাতা। গতকাল গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, “পরিত্যক্ত ওই বাড়িতে একটি ‘ঋত্বিক চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা দেশের চলচ্চিত্র কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু সামরিক শাসন এবং স্বৈরশাসনকালে সে স্থানে একটি হোমিওপ্যাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাজশাহীর ‘ঋত্বিক চলচ্চিত্র সংসদ’ কর্মীরা সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের কাছে ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে একটি চলচ্চিত্র কেন্দ্র করার জন্য দাবিপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। কিন্তু তিন বছরে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। গত ২১ ডিসেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষ সাইকেল স্ট্যান্ড করার অজুহাতে ভবনের একটি অংশ গুঁড়িয়ে দেয়। আমরা এ হীন কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিষয়টি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবুর গোচরে এলে তিনি দ্রুত জেলা প্রশাসককে ভাঙার কাজ স্থগিত করতে আশু পদক্ষেপ গ্রহণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। নির্দেশ মতো ভাঙার কাজ স্থগিত হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি এটা সাময়িক ব্যবস্থা।”

বিবৃতি দাতারা বলেন, “আমরা অনতি বিলম্বে ‘ঋত্বিক সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা এবং আমাদের চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক ভবনটিকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করে স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছি। দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গে একটি ভিন্নমাত্রার চলচ্চিত্র আন্দোলন এই প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে। আর এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে আমাদের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশ সাধিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের জোর দাবি হোমিওপ্যাথ কলেজটি ভিন্ন একটি স্থানে স্থানান্তর করে ‘ঋত্বিক চলচ্চিত্র কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হোক।”

বিবৃতি দাতারা হলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তানভীর মোকাম্মেল, মানজারে হাসীন মুরাদ, মোরশেদুল ইসলাম, এনায়েত করিম বাবুল, জাহিদুর রহিম অঞ্জন, শামীম আক্তার, নূরুল আলম আতিক, এন রাশেদ চৌধুরী, ফওজিয়া খান, আকরাম খান ও রাকিবুল হাসান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।