আমাদের বাণী ডেস্ক, ঢাকা;  গত বছরের শুরুতে নিবন্ধিত প্রার্থী মো. রাসেল মিয়াকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। সে অনুযায়ী যোগদান করেন তিনি। নিয়োগের কয়েকদিন পর থেকে পুরোদমে শুরু করেন ক্লাস নেয়া। কিন্তু বছর পেরুলেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তিনি। এমন নিয়তি শুধু রাসেল মিয়ার না। এনটিআরসিএর দ্বিতীয় চক্রে নিয়োগ সুপারিশ পাওয়া আট শতাধিক প্রার্থীর ভাগ্যে জোটেনি এমপিও নামের ‘সোনার হরিণ’।

এনটিআরসিএর মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার এক বছর পর আজ হতাশ রাসেল মিয়া, সুলতান মাহমুদ, রাজা, সেলিম, আতিকুর রহমান, শ্যামল দাস কিংবা সোহেল রানার মতো আট শতাধিক নিবন্ধিত শিক্ষক। তাদের হতাশার মূল কারণ ভুল তথ্য দেয়া শূন্যপদে নিয়োগ সুপারিশ।

গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ সুপারিশ পেয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করে অনেক প্রার্থীই নানা জটিলতায় এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না। জটিলতা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। প্রার্থীদের মতে শূন্যপদের ভুল তথ্য দেয়ায় এমপিওভুক্তি এসব শিক্ষকের জন্য এখন সোনার হরিণ। কয়েক দফা এনটিআরসিএর কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেও জটিলতা নিরসন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদারাসা শিক্ষা বিভাগ।

প্রার্থীরা জানান, প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করে নিবন্ধিত হয়েছি। অনেক আশা করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আবেদন করেছিলাম। সে অনুযায়ী নিয়োগ সুপারিশ পেয়েছি। চাকরির শুরুর বছর পার হলেও জোটেনি বেতন-ভাতা। এমপিওভুক্ত হতে পারিনি। ভুল তথ্য দেয়া শূন্যপদে নিয়োগ সুপারিশ পাওয়ায় এ জটিলতা সৃষ্টি। আটশ’র বেশি প্রার্থী এ জটিলতায় ভুক্তভোগী।

তথ্য মতে মূলত মহিলা কোটা, নবসৃষ্ট পদ, প্যাটার্ন বহিভূর্ত পদে নিয়োগ সুপারিশ সর্বোপরি ভুল তথ্য দেয়া শূন্যপদে নিয়োগ সুপারিশ পাওয়ায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের শূন্যপদের ভুল তথ্য দেয়া নিয়ে দেশের শিক্ষা বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও বিষয়টি আমলে নেননি প্রতিষ্ঠান প্রধান, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও এনটিআরসিএ।

গত ১২ জুন জারি করা এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোতে কিছু পদ বৃদ্ধি পায়। যেগুলো ‘নবসৃষ্ট পদ’ নামে পরিচিত। যেগুলোতে নিয়োগ দিতে আলাদা আদেশ জারি করা হবে বলে জানিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় চক্রে শিক্ষক নিয়োগের আগে ইরিকুইজেশনে এসব পদ শূন্যপদ হিসেবে ঘোষণা করেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। যদিও শূন্যপদের তথ্য পাঠানোর নির্দেশনায় নবসৃষ্ট পদগুলোকে শূন্যপদ ঘোষণা না করতে বলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নবসৃষ্ট পদগুলোকে শূন্যপদ ঘোষণা করা হয়। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা শূন্যপদের তথ্য যাচাই করার পরও এসব তথ্যে ভুল থেকে যায়। ফলে নবসৃষ্ট পদে নিয়োগ সুপারিশ করা হয় রাজা, সেলিম কিংবা আতিকুর রহমানের মত নিবন্ধিত প্রার্থীদের। কিন্তু পরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের এমপিও আবেদন অগ্রায়ন করেননি।

গত বছরের মাঝামাঝি বেসরকারি স্কুল কলেজের এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামো অনুসারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পদগুলোতে নিয়োগের কাঙ্ক্ষিত আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আদেশে নবসৃষ্ট পদে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির আদেশে ভৌতবিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে শুরু করতে বলা হলেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এসব পদে সুপারিশ পেয়ে যোগদান করেছেন কয়েকশ প্রার্থী। নিয়োগ কার্যক্রম গ্রহণের আদেশ ও প্রকৃত নিয়োগের অর্থবছর আলাদা হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই, কয়েকশ প্রার্থী এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না।

এদিকে, এনটিআরসিএর সুপারিশ পেয়ে যোগদান করলেও সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠানের মহিলা শিক্ষক কোটা পূরণ না থাকায় এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না শিক্ষকরা। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের দেয়া শূন্যপদের তথ্যে মহিলা কোটার পদকে সাধারণ পদ ঘোষণা করায় প্রতিষ্ঠানগুলো মহিলা কোটা পূরণ হয়নি। তাই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব শিক্ষকদের এমপিও আবেদন অগ্রায়ন করেননি। তাই এমপিওভুক্ত হতে পারেননি তারা। যদিও শূন্যপদের তথ্য পাঠানোর নির্দেশনায় মহিলা কোটা উল্লেখ করে তথ্য দিতে বলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠান প্রধানদের। যা যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের। কিন্তু প্রার্থীদের নিয়োগ সুপারিশের পর দেখা যায়, সে তথ্যেও ভুল আছে। তাই মহিলা কোটা পূরণ হয়নি তাদের। মহিলা কোটা পূরণ না হওয়া পদগুলোতে নিয়োগ সুপারিশ করা হয় রাসেল মিয়া, সুলতান মাহমুদের মত কয়েকশ প্রার্থীকে।

আর প্যাটার্ন বহির্ভূত পদগুলোকেও এমপিও পদ ঘোষণা করে শূন্যপদের তথ্য দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। সেই পদগুলোর তথ্যও যাচাইয়ে সংশোধন হয়নি। তাই, প্যাটার্ন বহির্ভূত পদে নিয়োগ সুপারিশ করা হয় সোহেল রানা, শ্যামল দাসের মতো প্রার্থীদের। প্যাটার্ন বহির্ভূত পদে নিয়োগ পাওয়ায় তারাও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি।

ভুক্তোভোগীরা জানান, ‘ভুল তথ্য দেয়া শূন্যপদে নিয়োগ সুপারিশ পাওয়ায় এমপিওভুক্তি হয়ে গেছে সোনার হরিণ’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরগুলো ও এনটিআরসিএতে ধারণা দিয়েও কাজ হয়নি। চাকরি পাওয়ার এক বছর পরও বেতন-ভাতা বা এমপিও পাইনি। তাই, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপণ্য হতে হচ্ছে। যদিও এমপিও পদ দেখেই নিয়োগ সুপারিশের জন্য আবেদন করেছিলেন বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।

এনটিআরসিএর কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশের ৮ শতাধিক শিক্ষক ভুল তথ্য দেয়া শূন্যপদে নিয়োগ সুপারিশ পেয়েও এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। ভুক্তোভোগীদের মধ্যে স্কুল-কলেজের পাঁচ শতাধিক, মাদরাসার আড়াইশোর বেশি ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ৭১ জন শিক্ষক রয়েছেন। নিয়োগ সুপারিশ করার পর তারা এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। পরে জটিলতা নিরসনে তাদের তথ্য চাওয়া হয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে।

অধিদপ্তরগুলো থেকে আটশতাধিক শিক্ষকের তথ্য এনটিআরসিএতে দেয়া হয়। সেই তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এসব শিক্ষকের এমপিও জটিলতা নিরসন করতে উদ্যোগ নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ, এনটিআরসিএর কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক দফা সভা হলেও জাটিলতা নিরসন হয়নি।

এদিকে, এনটিআরসিএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এমপিও জটিলতায় ভুক্তভোগীদের নিয়ে ফের আলোচনা করছেন এনটিআরসিএ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এনটিআরসিএ চায়, এসব জটিলতায় ভুক্তভোগীদের জটিলতা নিরসন করতে। তারা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাদের জটিলতা নিরসন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কিছু প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমারা চাই তৃতীয় চক্রে শিক্ষক নিয়োগের আগে ভুক্তভোগীদের জটিলতা নিরসন করতে। ইতোমধ্যে শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৯ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫৭ হাজারের বেশি এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় চক্রে নিয়োগ পাওয়া ভুক্তভোগী শিক্ষকদের নতুন করে সুপারিশ করা যেতে পারে। জটিলতা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এমনটাই সুপারিশ করেছে এনটিআরসিএ।

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিদ্যমান বিধান মতে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের নতুন করে জটিলতাবিহীন পদে নিয়োগ সুপারিশ করার ক্ষমতা এনটিআরসিএর নেই। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়ে এ বিষয়ে নির্দেশনা চাইবে এনটিআরসিএ। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতবেক জটিলতা নিরসনে কাজ করবে এনটিআরসিএ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের নিয়ে এনটিআরসিএর কর্মকর্তাদের সাথে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। গত ১২ মার্চ এ নিয়ে সভা হয়। সভায় প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে জটিলতা নিরসনে কমিটি গঠনের। কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনটিআরসিএ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা থাকবেন। জটিলতা নিরসনের পথ খুঁজে বের করবে কমিটি।

এদিকে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকরা ঝামেলাবিহীন পদে নতুন করে নিয়োগ সুপারিশের দাবি জানান। তারা বলেন, আমাদের সাথে নিয়োগ পেয়ে প্রায় সবাই এমপিওভুক্ত হয়ে গেছেন। মেধাতালিকায় ভুক্তভোগীদের থেকে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীরাও এমপিওভুক্ত হয়ে গেছেন। সাড়ে ৩১ হাজার পদে নিয়োগ সুপারিশ করা হলেও জটিলতা প্রায় এক হাজার শিক্ষকের। তাই ভুক্তভোগীদের জটিলতা নিরসন করে এমপিওভুক্ত করার আবেদন করছি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশিষ্টদের কাছে।

দেশের স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫৭ হাজারের বেশি শূন্যপদ রয়েছে। এসব পদে নিয়োগের গণবিজ্ঞপ্তি জারির আগেই ভুক্তভোগীদের এমপিওভুক্ত করার ব্যবস্থা করতে এনটিআরসিএ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করছি। সূত্র দৈনিক শিক্ষা

আমাদের বাণী ডট কম/১৫ মার্চ ২০২০/সিপি 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।