বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে। উন্নত ও ধনী দেশগুলোর শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে। এসব গ্যাস তাপ ধরে রেখে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকায় ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। গ্রীষ্মকাল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। বর্ষাকাল তার সময় থেকে সরে যাচ্ছে। ঋতুর চিরচেনা রূপের দেখা না মেলায় এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি, ফসল ও মানুষের ওপর। ঋতুভিত্তিক ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের ওপর চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুর মতো নতুন রোগের প্রভাব বাড়ছে। জলবায়ুর এই ক্ষতিকর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শহরগুলোতে অভিগমনের হার বাড়ছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নুরুল কাদির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, খরা, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর সব ক’টি থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। দেশে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বন্যা কিংবা খরার বিরূপ আচরণ খুবই পরিষ্কারভাবে টের পাওয়া যায়। কোনোটিই আগের মতো সময় মানছে না। অসময়ে যেমন অতিবৃষ্টি হয় তেমনি আবার অসময়ে খরা কিংবা বন্যাও হয়। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে পানি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও রাসায়নিক দূষক পদার্থ বহন করে থাকে। একইভাবে ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটায় ও নানা কীটপতঙ্গের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা ব্যাধি বাসা বাঁধছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রিত কার্বন নির্গমনের জন্য আমরা উন্নত দেশগুলোর প্রতি চাপ দিয়ে যাচ্ছি। এটি যেহেতু আমাদের একার বিষয় নয় এ জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হচ্ছে। আগামী সম্মেলনে আমাদের পক্ষ থেকে প্যারিস চুক্তির রুল বুক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন) জাকির হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তা পোষাতে যে অর্থায়ন হবে তা অনুদানভিত্তিক হবে। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে ‘সবুজ জলবায়ু প্রকল্প’ থেকে যে অর্থায়ন করার কথা ছিল সে অর্থ এখন পর্যন্ত ছাড় হয়নি। কবে হবে তাও বুঝা যাচ্ছে না। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়া প্যারিস চুক্তির জন্য বড় ক্ষতি। যুক্তরাষ্ট্রকে আবার প্যারিস চুক্তিতে ফিরিয়ে আনতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন কয়েকজন প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যোর গভর্নর ও ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের দিয়ে চাপ তৈরি করতে হবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দেয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না দিলে মানবাধিকার বা আইনের মাধ্যমে সেটি আদায় করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভেক্টর অণুজীব মশা, মাছি, ইঁদুর অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বেশি বংশ বিস্তার করায় ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
২০২০ সালের মধ্যে উদরাময়জনিত রোগ বেড়ে যাবে। এ ছাড়া তাপমাত্রা উষ্ণ থাকলে সমুদ্রে ঘন ঘন শৈবাল জন্মায়, বিশেষ করে যেখানে দূষিত পানি রয়েছে। আর শৈবালের সাথে কলেরা জীবাণুর সংশ্লিষ্টতা থাকায় এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাবে, ফসলহানি ঘটবে। মাছ ও জলীয় উদ্ভিদের ক্ষতি হবে। পানি ও খাবারের অভাবে কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
বায়ুমণ্ডলে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিভিন্ন দূষিত গ্যাস, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য দূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ যেমন হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমফাইসিমা ও অন্যান্য রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য অবনতির প্রধান ১০টি রোগের মধ্যে একটি হবে শ্বাসজনিত রোগ। ঘরে ও বাইরে বহুক্ষণ ধরে বায়ুদূষণের মধ্যে কাটানোর পর শিশুদের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত অসুস্থতা বেড়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো গাছপালার রেণু উৎপাদন বাড়বে। ফলে হাঁপানি ও অ্যালার্জিজনিত রোগ আরো বেশি হবে। করোনারি আর্টারি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে এবং বিভিন্ন রকম ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে উষ্ণ ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণ প্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল যেমন গমের ফলন খুব কমে যায় এবং উৎপাদন অলাভজনক হয়। ধানের ক্ষেত্রে ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শীষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেবে। ধানের কাইচ থোড় আসার পরপরই রাতের তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে এবং এ অবস্থা ৪-৫ দিন অব্যাহত থাকলে ধান আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে বাতাসের গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে ধানগাছের জন্য খুবই অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং ধানে অতিরিক্ত চিটা হয়। শৈত্যপ্রবাহের সাথে দীর্ঘ সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে অনেক ফসল বিশেষ করে গমের পরাগায়ন (পলিনেশন) ও গর্ভধারণ (ফার্টিলাইজেশন) না হওয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণ ফসল চিটা হয়ে যায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়, প্রজাতি বৈচিত্র্য কমতে পারে এবং প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। উষ্ণতা বাড়ার ফলে গাছের প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত সেচ প্রদানের ফলে সেচের পানির অভাব হয়। শৈত্যপ্রবাহের ফলে আমের মুকুল নষ্ট হয় ও নারিকেলের ফলধারণ ব্যাহত হয়।
আগামী ২৫তম জলবায়ু সম্মেলন ২ ডিসেম্বরে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনটি ১৩ তারিখ পর্যন্ত চলবে। চিলির পরিবর্তে ২৫তম জলবায়ু সম্মেলন স্পেনে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে সম্মেলনটি চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চিলিতে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ফলে তা ভেস্তে যায়। গত সপ্তাহের বুধবার চিলি সরকার ডিসেম্বরের জলবায়ু সম্মেলন এবং নভেম্বর মাসে নির্ধারিত এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে তাদের নাম প্রত্যাহার করে।
