ওসমান গনি; মহামারি করোনাভাইরাসের ছোবলে দেশের সকল শ্রেনিপেশার মানুষ আক্রান্ত হলেও দেশের ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের অবস্থা একবারেই শোচনীয়। তারা স্বল্প আয়ের মানুষ বলে তারা দেশের বেশীর ভাগ মানুষের চোখে অবহেলিত ও নিগৃহীত। এসব ভাসমান লোকদের বেশীর হলো রাস্তা ও ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী।

রাস্তার মোড়, ফুটপাত ও রিকশাভ্যানে জামা-জুতা, আসবাবসহ নানা পণ্য বিক্রিই ওদের পেশা। কেউ কেউ ফুটপাতে চট বিছিয়ে বিক্রি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট, অলিগলি, মোড়, বাস, ট্রেনে নিত্যদিন দেখা মেলে ওদের। ওদের সবাই হকার নামেই চেনে। করোনাভাইরাসের ছোবলে ভ্রাম্যমাণ এসব ব্যবসায়ী এখন ঘরবন্দি। আয় হারিয়ে দিন এনে দিন খাওয়া এসব মানুষের এখন দুর্বিষহ অবস্থা।

বেসরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সারা দেশে হকারের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। তাদের মধ্যে ঢাকাতে রয়েছে চার লাখ। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক হকার রয়েছে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলার শহরগুলোতে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত ছুটি আর লকডাউনে রাজধানীসহ সারা দেশে সব কিছু বন্ধ। রাস্তায় মানুষ নেই। খুলতে দেওয়া হচ্ছে না ফুটপাতের দোকানগুলো। এতে তাদের রোজগার একেবারেই বন্ধ। সরকারি-বেসকারি কোনো সহায়তাও তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুর্বিষহ জীবন কাটছে তাদের।

হরেক হকার, হরেক পেশা। আমের আচার থেকে লেবুর শরবত, দাঁত মাজার পাউডার থেকে ইঁদুর মারা ওষুধ-সবই পাওয়া যায় হকারদের কাছে। বিভিন্ন ঢঙে-সুরে, বেশভূষায় ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মূল উদ্দেশ্য ফেরি করা জিনিস বিক্রি করা। গাড়ির চাকার মতোই সারা শহর ঘুরে জিনিস বিক্রি করেই চলছিল হকার নামের মানুষের জীবন। করোনার কারণে থেমে গেছে তাদের জীবন-জীবিকা। বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়া করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে মাসখানেক ধরে দেশজুড়ে চলছে লকডাউন। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ রয়েছে বাইরের সব কাজকর্ম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় রাস্তার পাশে জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসা তো দূরের কথা, শহরই ছেড়ে গেছে হকারদের একটি বড় অংশ। তাদের মধ্যে যারা শহরে আছে তাদের অবস্থা আরো শোচনীয় বলে জানায় কয়েকজন।

ঢাকায় সারা বছরই হকাররা থাকে উচ্ছেদ আতঙ্কে। তার মধ্যে করোনা-লকডাউনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর। তারা রাস্তায় বসতে দিচ্ছে না হকারদের। ফুটপাতের হকাররা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে চেয়ে থাকে রোজার মাসটির দিকে। ঈদ সামনে রেখে মানুষের সবচেয়ে বেশি কেনাকাটা হয় এ মাসেই। এক মাসের আয় বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় তা দিয়ে ধার-দেনাও পরিশোধ করে তারা। সারা বছর চলার রসদেরও কিছুটা জমিয়ে নেওয়া হয় জমজমাট বেচাকেনার এই সময়ে। এবার করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সেই ব্যবসা তো দূরে থাক, এখন পরিবারের পেট চালিয়ে নেওয়াই বড় দায় হয়ে পড়েছে।

সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ হকারি পেশায় নিয়োজিত হয়ে দেশের বিপণন বাণিজ্যে অসামান্য অবদান রাখছে। এসব ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা যে শুধু শহরে বন্দরে তাদের ব্যবসার পরিধি সীমাবদ্ধ রাখছে তা নয়। তাদের এ ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার পরিধি এখন সারাদেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে। হকার্সদের এই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার কারনে শুধু একমাত্র হকাররা যে লাভবান হচ্ছে তা নয়। তাদের হকার্স ব্যবসার একটা সামান্য অংশ হলেও দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ব্যবসায় জড়িত জীবনযাপন করছে। করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগ সময়ে আজ তারা অতিকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কিন্তু হকারদের এই অবদান কখনোই স্বীকৃতি পায়নি। তারা আর্থিক প্রণোদনা পাওয়া তো দূরের কথা, দুর্যোগ-দুর্দিনে কখনো রাষ্ট্রীয় সহায়তাও পায় না।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট Email- [email protected]

আমাদের বাণী ডট কম/৩০ এপ্রিল ২০২০/পিপিএ 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।