নিজস্ব সংবাদদাতা, খুলনা; করোনাভাইরাস সংক্রমণের দুর্যোগকালে নারী নির্যাতন বন্ধ ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম খুলনা জেলা শাখা।
আজ মঙ্গলবার (০৫ মে ২০২০) সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম খুলনা জেলা শাখার উদোগ্যে ও কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই এই স্বারকলিপি পেশ করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক কোহিনুর আক্তার কণা, সদস্য সংগীতা মন্ডল, আলেমা সুলতানা শিল্পী প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দুর্যোগকালে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশ মহাবিপর্যয়ে পড়েছে। অন্যসব সংকটের মতোই করোনা সংকটেও নারীর ওপর এর প্রভাব সীমাহীন। লকডাউনের সময়ে মানুষ অনেক বেশি সময় ঘরে অবস্থান করছেন; এই রকম পরিস্থিতিতেও নারীর ওপর নির্যাতন থেমে নেই। খুন-ধর্ষণ-নির্যাতন ক্রমেই বেড়ে চলছে। এই সময় দরিদ্র-নিম্নবিত্ত কর্মহীন শ্রমজীবী পরিবারগুলো খাদ্য ও অর্থ সংকটের কারণে নানাভাবে বিপর্যস্ত। কর্মহীন-রোজগারহীন অবস্থায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এ সমস্যার কারণে অভাব-অনটনে মনমেজাজ খারাপ, আর এর প্রভাব পড়ে ঘরে, নারীর উপর নির্যাতনে। অন্যদিকে কেউ কেউ স্ত্রীকে বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দিচ্ছে। পরিবার নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা কিন্তু সেই পরিবারেও নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। গৃহস্থালির কাজ সাধারণত নারীকেই করতে হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নারী রান্না করা, ঘরদোর গোছানো ও পরিচ্ছন্ন করা, পরিবারের শিশু-বয়স্ক-অসুস্থদের যত্ন নেওয়াসহ গড়ে ৪৫ ধরনের কাজ দিনে গড়ে ১৬ ঘণ্টাব্যাপী করে থাকেন। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না, সেই কাজে পরিবারে দৃশ্যমান কোন টাকা আসে না বলে, সামান্যতম মূল্যায়নও করা হয় না।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, এখন করোনা ভাইরাসের কারণে সাহায্যকারীদেরও বাসায় আসতে মানা। পরিবারের সকল সদস্য সবসময় ঘরেই আছেন। ফলে নারীর গৃহস্থালির কাজও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সেজন্য যে সহযোগিতা, সহানুভ‚তি পাওয়া প্রয়োজন তা নেই-উল্টো নারীকে নানা ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রমের সাথে নারীর উপর নেমে আসে সহিংসতা। যেমন, ফেনীতে ফেসবুক লাইভে এসে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা; জামালপুরে করোনা রোগী তলাশির নামে পুলিশের পরিচয়ে কিশোরীকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ; ফেনীর সোনাগাজীতে সোনার অলঙ্কার না পেয়ে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করে ডাকাতেরা; কেরানীগঞ্জে ত্রাণ দেওয়ার কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ; বগুড়ায় যৌতুকের জন্য নববধূকে হত্যা; বগুড়ার ধুনটে প্রতিবন্ধি মেয়েকে ধর্ষণ, বগুড়ার শাহজাহানপুরে প্রাক্তন স্বামী কর্তৃক এক নারী ধর্ষণ ও হত্যা; গাজীপুরে মা-মেয়েসহ একই পরিবারের ৪ জন হত্যা; প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখে পড়ে এমন অনেক শিরোনাম। লকডাউনের কারণে আরও অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের খবর হয়তো পত্রিকায় আসছেই না। করোনা ভাইরাসের বিস্তারের ফলে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে কিনা, তা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি।
তবে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর এলাকায় গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনে ধর্ষণ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অপহরণের ২৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ধর্ষণের, ৮টি যৌতুকের জন্য নির্যাতন, ৫টি অপহরণ ও ৬টি যৌন নিপীড়নের মামলা। র্ব্যাকের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩২ শতাংশ বলেছেন, এই সময়ে পরিবারে এবং পাড়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা আরও বেড়েছে। সেইসাথে থেমে নেই বাল্যবিবাহও।
ওয়ার্ল্ড ভিশনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ২১টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। আবার লকডাউনের কারণে নির্যাতিত নারী মামলা করতে যেতে সমস্যায় পরছেন। অনেকক্ষেত্রে পুলিশ করোনার অযুহাতে মামলা নিতে চাচ্ছে না বা গড়িমসি করছে। নির্যাতন যে বা যারা করছে তারা তো ঘরেই আছে; ফলে ঘরে যে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন তারা প্রচন্ডরকমভাবে সারাক্ষণ নির্যাতনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন; লকডাউনের কারণে বাবার বাড়ি বা অন্য নিরাপদ স্থানেও যেতে পারছেন না। আমাদের শ্রমজীবী কর্মজীবী নারীরা আরও অনেক শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বেতন পাচ্ছেন না, কবে থেকে কাজ আবার শুরু হবে, কাজ শুরু হলেও চাকরি ফিরে পাবেন কিনা, যে বাসায় ভাড়া থাকতেন, সে বাসায় উঠতে পারবেন কিনা, সন্তানের ক্ষুধার্ত মুখ, সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তা। এ সময় জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যহত হওয়ায় অনাকাংক্ষিত গর্ভধারণ নারীর জন্য অনেক বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং দীর্ঘ কয়েক মাস পর্যন্ত খাবারের অভাবে, পুষ্টির অভাবে শরীরে সেটার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। বেশির ভাগ শ্রমজীবী নারী শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন। শরীর-ই যদি না চলে কাজ কীভাবে করবেন, ঘরে খাবার কীভাবে জুটবে? করোনাভাইরাস জনিত দূর্যোগ যেন নারীকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলেছে। রাষ্ট্র যদি এখনই বিশেষ যত্ন ও মনোযোগে এসকল সংকটকে সমাধান করার উদ্যোগ না নেয় তাহলে সামনের দিন নারীর জন্য আরও বেশি সংকটময় হয়ে উঠবে এবং সেটা দেশেরও অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ক্ষতি সাধন করবে।
ফলে এই করোনা সংকটকালে নারী নির্যাতন বন্ধ, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম স্মারকলিপির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর নিম্নোক্ত দাবি সমুহ জানায়।
১. নারী-শিশু নির্যাতন বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের উদ্যোগ নিতে হবে
৩. করোনা সংকটে কর্মহীন-রোজগারহীন দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের তালিকা করে আর্মি রেটে রেশন দিতে হবে।
৪. করোনা দুর্যোগকালীন সময়ে চাকরিচ্যুতি চলবে না
৫. করোনা সংক্রমণ থেকে নারী-শিশুদের রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতালে নারী-শিশুদের জন্য আলাদা করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ যত্ন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. সংকট উত্তরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নারী সংগঠনসমূহের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে নির্ধারণ করতে হবে।
আমাদের বাণী ডট/০৫ মে ২০২০/পিবিএ
