জিকরুল হক, সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা; জেলার সৈয়দপুরে নারী শিক্ষার বাতিঘর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ দীর্ঘ আট মাস ধরে পরিচালনা কমিটি ছাড়াই চলছে। ফলে চলমান উন্নয়নসহ শিক্ষা কার্যক্রম থমকে গেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিঘিœত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ২৬ জুলাই। অথচ গত ৮ মাসেও নতুন কমিটি গঠন করা হয়নি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বিধি মতে কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন কমিটি গঠন করতে অভিভাবক সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন শেষ করতে হয়। সেই হিসাবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ২৯ জুন ২০১৯ সালে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট গভর্নিং বডির নির্বাচন সম্পন্ন করে। এর মধ্যে অভিভাবক সদস্য ছয়জন, শিক্ষক প্রতিনিধি চারজন, দাতা সদস্য একজন, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও স্থানীয় এমপির মনোনীত একজন প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। এরপর শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদন মিললে গঠিত কমিটির কার্যক্রম সচল হয়। কিন্তু গত ৮ মাসেও বোর্ড কমিটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত না দেয়ায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি দ্রুত প্রতিকার কামনা করেছেন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে।
এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রাজিব উদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, নিয়মিত কমিটি গঠনকল্পে সকল বিধি বিধান মেনে অভিভাবক সদস্য, শিক্ষক প্রতিনিধি ও দাতা সদস্য নির্বাচন করা হয়। এরপর এলাকার জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য (নীলফামারী-৪ আসন) আলহাজ্ব আহসান আদেলুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয় তার মনোনীত একজন সদস্যের নাম দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি নানা অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করেন। কমিটির সদস্য নির্বাচনের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস পর এমপি স্থানীয় জাপা নেতা আলহাজ্ব জয়নাল আবেদীনের নাম প্রস্তাব করে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবরে চিঠি প্রেরণ করেন। এ বিষয়টি জানতে পেরে নবনির্বাচিত সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করে। এমতাবস্থায় গভর্নিং বডি গঠন নিয়ে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
পদত্যাগের বিষয়ে জানতে কথা হয় অভিভাবক সদস্য মো. জামিল উদ্দিন ও মো. খোরশেদ আলমের সঙ্গে। তারা বলেন কমিটির সভাপতি হবেন এমন ব্যক্তি যদি কোন ফৌজদারি আইনে হাজতবাস কিংবা তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলমান থাকে তাহলে সেই ব্যক্তিকে গভর্নিং বডির সভাপতি করা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড দিনাজপুরের ১১ এর ঘ ধারা পরিপন্থি। সেই কারণেই আমরা একযোগে নতুন নির্বাচিত অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা পদত্যাগ করেছি।
কমিটি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জানান, এমন অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে গেছে। ৭২ বছর বয়সি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৬৪ বছর স্বৈরতান্ত্রিক রাজত্ব কায়েম করেছিল যুদ্ধাপরাধী কুখ্যাত রাজাকার মরহুম ইজহার আহমেদ। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিগত ২০১২ সালে স্বৈরতন্ত্র থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত হয়। তারপরও নানা চড়াই উতরাই চলতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালে গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আসেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সৈয়দপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিন। তার প্রশাসনিক দক্ষতায় প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় কৃতিত্ব অর্জন করে শিক্ষার্থীরা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ৮৫০ জন শিক্ষার্থী থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ১০০ জন। গড়ে শতকরা শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ জন। প্রতিষ্ঠানের বিগত দিনের শূন্য তহবিলের জায়গায় বর্তমানে ব্যাংক স্থিতি ২০ লাখ টাকা। তাছাড়াও বিগত দিনের কমিটির মেয়াদে দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক, বাউন্ডারী ওয়াল, নাইটগার্ড রুম, সাইকেল গ্যারেজ, কলেজ শিক্ষকদের জন্য টয়লেট, ওজুখানা, মেয়েদের প্রিয়ড চলাকালীন ব্যবহারের জন্য আধুনিক শৌচাগার, গোটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও খেলাধুলার জন্য মাঠ ভরাট করাসহ সম্প্রসারণের কাজ করা হয়েছে। এমপিওভুক্ত করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখা। বর্তমানে পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল ভবনের উর্ধ্বমুখী কাজ চলমান রয়েছে।
এছাড়াও চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে অডিটোরিয়াম, শহীদ মিনার, ডিজিটাল হাজিরা সিস্টেম ও আরো একটি একাডেমিক দ্বিতল ভবন ও বিজ্ঞানাগার নির্মাণ। কিন্তু নতুন গভর্নিং বডি গঠন না হওয়ায় সকল কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। বিরাজমান সমস্যার সুরাহা টানতে তিনি দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক অচলাবস্থা বিষয়ে জানতে কথা হয় গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি ও সৈয়দপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোখছেদুল মোমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় বোর্ড চেয়ারম্যান যত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, ততই প্রতিষ্ঠানটির মঙ্গল হবে। এর ব্যত্যয় হলে চরম ক্ষতি হবে প্রতিষ্ঠানের। যার মাশুল গুণতে হবে অনেক দিন। (ছবি আছে)
আমাদের বাণী ডট কম/১৮ মার্চ ২০২০/টিএ
