খুলনা সংবাদদাতা; বিশ্বের জীববৈচিত্রের বৃহত্তম আধার ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দেশের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত পৃথিবির একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন।
- এ সংরক্ষিত বনটি বাংলাদেশের ফুঁসফুঁস ও অক্সিজেনের ভান্ডার। বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন হচ্ছে ৬ লাখ ১ হাজার ৭শ হেক্টর। যা দেশের আয়তনের ৪ দশমিক ১৩ ভাগ।
সংরক্ষিত এই বনের ৩টি অভয়ারণ্যের ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭শ হেক্টর বনাঞ্চলকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো ৭৯৮ তম ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড ঘোষণা করে। সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইডের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত জলাভূমিও। ১৯৯২ সালে সমগ্র সুন্দরবনের এই জলভাগকে রামসার এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।
- প্রশাসনিক সুবিধার কারণে সুন্দরবনকে পূব ও পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করা হয়। গোটা সুন্দরবনে রয়েছে ৪টি রেঞ্জের ১৮টি রাজস্ব অফিস, ৫৬টি টহল ফাঁড়িতে সর্বমোট জনবলের সংখ্যা ৮৮৯ জন। এই অপ্রতুল জনবল দিয়ে বিশাল এই সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিকে দেখভাল করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ।
সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রল হরিণ। বন বিভাগসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা দেশি বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
- গত ২৬ মার্চ গোটা সুন্দরবনে করোনাকালে প্রাণ-প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখতে ও করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সব ধরনের পর্যটকসহ জেলে-বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সর্বোচ্চ সর্তকতা ‘রেড এ্যালার্ড’ জারি করে বন বিভাগ।
২৪ ঘন্টায় দু’বার সমুদ্রের জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত এই বনভূমিতে পর্যাটকসহ জেলে-বনজীবীরা না থাকায় নেই কোন কোলাহল। র্নিভয়ে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সুন্দরবনে প্রকৃতির পাহারাদার রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল ও মায়া হরিণসহ সব বন্যপ্রাণী। বনের কর্মকর্তাসহ বনরক্ষীরা এখন প্রায় প্রতিনিয়তই শুনতে পাচ্ছেন বাঘসহ এসব বন্যপ্রাণীর ডাক। সহজেই চোখে পড়ছে বাদরের বাদরামী।
- বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন দল বেঁধে পানির উপরি ভাগে খেলা করছে। সহজেই দেখা মিলছে কুমির ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বাটাগুল বাচকা কচ্ছপের। র্নিভয়ে ঘুরে ফিরছে অজগর, কিংকোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বন মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙ্গছে বনের কর্মকর্তাসহ বনরক্ষীদের। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি কিচির-মিচির শব্দ করে গাছের এডাল থেকে ওডালে উড়ে ফিরছে।
সৃষ্টির পর এই প্রথম যেন সুন্দরবন স্বাভাবিক রূপে ফিরতে শুরু করেছে। দিন রাত ২৪ ঘন্টা ৬ বার রূপ পাল্টানো সুন্দরবন কোন উপদ্রব ছাড়াই পেয়েছে নতুন প্রাণ। করোনা ভাইরাসের কারণে রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে হঠাৎ করে চোরা শিকারীরা হরিণ শিকারে মেতে উঠে।
- বাগেরহাট জেলার পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ ও চাদপাই রেঞ্জে ৩০ মার্চ থেকে ৫ মে পযন্ত মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে পুলিশও বনরক্ষীরা অভিযানে চলিয়ে চোরা শিকারীদের কবল থেকে ২৪টি জীবিত হরিণ, ৭৯ কেজি হরিণের মাংস, নাইলনের দড়ির ৬ হাজার ৬’শ ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ উদ্ধার করে। এ সময়ে ৭ জন চোরা শিকারীকে আটকসহ শিকার কাজে ব্যবহৃত ৪টি ট্রলার ও দুটি নৌকা জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় হরিণ শিকার প্রতিরোধে বন বিভাগ সুন্দরবনে টহল জোরদার করলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।
সুুন্দরবনে ৪৫০টি ছোট-বড় নদী ও খালে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ইরাবতীসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার, কুমির ইত্যাদি।
আমাদের বাণী ডট কম/১৪জুন ২০২০/ডিএ
