আমাদের বাণী ডেস্ক; পরনির্ভরশীল অসংখ্য শিক্ষিত নারীদের একজন হয়েই কথাগুলো আজ বলতে হচ্ছে। এ আমার একার কথা নয়, এ কথা সবার। সমাজে সর্বস্তরে আজ নারী কতটা অবহেলিত, কতটা নির্যাতিত তার হিসেব নাইবা করলাম। প্রত্যেকটা শিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও (যেখানে নারীরা সম্পুর্ন স্বামীর উপার্জনের উপর নির্ভরশীল) আজ নারী চরম অসহায়ত্বের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। বিয়ের পর একজন নারী তার স্বামীর পরিবারকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করেন। অথচ সেখানেই নারীরা সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হন। তার মধ্যে অন্যতম হলো যৌতুক প্রথা। মেয়ের বাবা বিয়েতে যৌতুকের চাহিদা পূরণ করতে পারলে শশুর বাড়িতে সে মেয়ে হয় লক্ষী বউমা, আর না পারলে হয় অলক্ষী, অপয়া। এই যৌতুক প্রথা সমাজের এমন একটি কালো অধ্যায় যার অভিশাপে অকালে ঝরে যায় অসংখ্য নিষ্পাপ প্রাণ।
বর্তমানে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের পেছনে নারীর অবদান বিস্ময়কর হলেও পরিবারিকভাবে নারীর অবস্থান পরিবর্তন আজও পুরোপুরি হয়নি। বিবাহিত নারীর অধিকাংশই বিভিন্নভাবে শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের স্বীকার হন পরিবার থেকে। শুধু স্বামী নয়, পরিবারের অন্য দশজন থেকেও নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়।

এক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। কোন পরিবারের মধ্যে যদি শুরু থেকেই ছেলে এবং মেয়ের বৈষম্য থাকে, তাহলে সেই পরিবারের ছেলেটি নারীর প্রতি একটা অবহেলা ভাব নিয়েই বড় হয় যা তার ভবিষ্যৎ জীবনে প্রতিফলিত হয়। বাইরের জগতের কথা নাইবা বললাম। শুধুমাত্র একটা পরিবারের ভিতরেও নারীরা যে কতটা অবহেলিত, লাঞ্চিত আজ শুধু তাই বলছি। আমাদের মধ্যে সবসময় একটা ধারণা থাকে নারী সবসময় পুরুষের অধীন। পুরুষ ছাড়া নারী যেন অসম্পূর্ণ। হ্যাঁ, এই ধারণা থাকার কারণও একমাত্র আমরা নারীরাই। আমরা যদি সেই পুরুষটির সংসারে আসার আগে নিজেকে স্বাবলম্বী করে নিতে পারতাম তাহলে হয়তো এমন ধারণা পালটে যেতো। এক্ষেত্রে আমাদের বাবা মায়ের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছোটবেলা থেকেই বাবা মা যদি তাদের মেয়েকে সুশিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তুলতেন এবং এরপর বিয়ে দিতেন তাহলে হয়তো তাদের মেয়েকে আর অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকতে হতো না। খুব সামান্য প্রয়োজনেও স্বামীর কাছে হাত পাততে হতো না। উচ্চ শিক্ষিত ও অঢেল টাকা-পয়সা দেখে যে পুরুষটির হাতে বাবা-মা তাঁর মেয়েকে তুলে দেন সেখানে সে কতোটুকু মান মর্যাদায় আছে। কতোটুকু অধিকারে তার মনের চাওয়া-পাওয়াগুলো প্রকাশ করতে পারে আমাদের বাবা মায়েরা তার আর খবর রাখেন না।

আমাদের প্রত্যেক মা’কে বলল, আপনি আপনার নিজ বা একজন নারীর অবস্থানে দাঁড়িয়ে আপনার মেয়েকে আগে স্বাবলম্বী করে প্রতিষ্ঠিত করুন। আপনার মেয়ের একটি স্বাধীন জীবন নিশ্চিত করুন। অন্যের অধীন হয়ে চাপা কষ্টে সে যেন ধুকে-ধুকে নিঃশেষ হয়ে না যায়। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে আপনাকেও যে অসংখ্য বাধার সম্মুখীন হতে হবে না তা একেবারেই নয়। কারণ আপনিও একজন পুরুষের অধীন। আসলে প্রত্যেক নারীর জন্য পরিবার এমন একটি জায়গা, যেখানে নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হলেও তা বাইরে প্রকাশ করতে চান না। তাই নির্যাতনের ধরণও মাত্রাতিরিক্ত ও ভয়াবহ হয়। নিজের সংসারে টিকে থাকার জন্য নারীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে। শত অত্যাচার সহ্য করেও আইনের দারস্থ হতে চায় না। একসময় যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন নারীরা বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। কেউ কেউ আইনের আশ্রয় নিলেও বিচার শুরু হতে অন্তত আরও দুই তিন বছর লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত সঠিক বিচারেরও অনিশ্চয়তা থাকে। এসব কারণেও পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার অধিকাংশ নারী বিচারের অধীনস্থ হতে চান না। ফলে পরিবারে, সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে।

একজন নারী যে শুধু তার স্বামীর সংসারে অবহেলিত তা নয়। অনেক সময় বাবার পরিবারেও একইভাবে অবহেলিত। যখন আমি লেখাটা লিখছিলাম নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষিত নারী বলেছিলেন তাঁর জীবনের অত্যন্ত কষ্টের একটি ঘটনার কথা। তিনি যখন এস এস সি টেস্ট পরীক্ষা দিচ্ছিলেন সেই সময় উনার বাবা জোর করে উনাকে বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়েতে মেয়ের সম্মতি নেই জেনেও তিনি নিজেই বিয়ের রেজিস্ট্রিতে সাক্ষর করে দেন এবং বিয়ের চারদিন পর অনেক জোর করে মেয়েকে তাঁর স্বামীর ঘরে রেখে আসেন। স্বামীর সংসারে তিনি চরম প্রতিকুলতায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বাবলম্বী আর হতে পারেননি। এখানে দেখুন বাবার হাতেও নারীরা কতো অসহায় আর লাঞ্চিত। মেয়ের সমস্ত বেদনা মা জেনেও কিছুই করতে পারলেন না। কারণ তিনিও পরনির্ভরশীল। আজ যখন সেই নিষ্ঠুর বাবার অসহায় মেয়েটি ঘটনাটা আমার সাথে শেয়ার করলেন আমি সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম তবে অবাক হইনি। বাবা নামের সেই নিষ্ঠুর পুরুষটিকে একবার জিজ্ঞেস করতে খুব ইচ্ছে হলো, আপনার সেদিনের ব্যবহারের জন্য আজ পর্যন্ত কখনো মেয়ের কাছে এসে একবারও কি অনুতপ্ত হয়েছেন? কখনো পাশে বসে মাথায় হাতটি রেখে বলেছেন মা’রে, তুই কি সুখী হয়েছিস?।যে কিনা শুধুমাত্র আপনার সম্মানের কথা ভেবে এখনো সে সংসারে মুখ থুবড়ে জীবন কাটাচ্ছে।

একজন নারী যখন তার স্বামীর সংসারে আসে স্বভাবতই অনেক আশা নিয়েই আসে। মায়ের মতো নিজের স্বামী সন্তান, শশুর শাশুড়ী সবার প্রতি সম্মান ও যথাযথ মূল্যায়ন করে স্বামীর সংসার যেন আলোয় আলোকিত করে রাখতে পারে।কিন্তু সে নারী যদি হয় উপার্জনহীন তাহলে অন্যের যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান রাখতে গিয়ে কখন যে নিজেকে মূল্যহীনের সারিতে দাঁড় করিয়ে দেয় নিজেও জানে না। ঘরের পুরোনো আসবাবের মতোই সংসারে তার অবস্থান হয়ে যায়। যা থাকলে ভালো, না থাকলে আরও ভালো। অন্যের ফরমায়েশ মিটাতে গিয়ে সে নারী ভুলে যায় তার নিজেরও একটি সুন্দর স্বপ্ন ছিল। যে স্বপ্ন দায়িত্বের চাকায় পিষ্ট। আজকের সমাজে যেখানে নারী বাধ্য,অবনত, সংসার খরচের কিছু টাকার জন্যও স্বামীর সামনে হাত পাততে হয় সেখানে কে রাখবে এমন বেকার নারীর চাওয়া পাওয়ার হিসেব? অথচ আমার মতো, শত-শত উপার্জনহীন নারীর মতো আপনিও চেয়েছিলেন একটি সুন্দর মন। যে মনের মুক্ত আকাশের এক চিলতে অরুণাভ আলোয় আপনি রাঙিয়ে নিতে পারতেন নিজস্ব পৃথিবী। হায় রে নারী! অন্যের অধীন হয়ে কি আর সূর্যের আলো পাওয়া যায়? সূর্যের আলো পেতে নিজের দু’টি হাত আগে ইস্পাতের মতো কঠিন করে তৈরি করতে হয়। নয়তো আপনার নরম মোমের মতো হাত সূর্যের তাপে মুহূর্তেই ঝলসে যাবে।

তাইতো আপনি আলোর বদলে পেয়েছেন সংসার নামক এক অন্ধকার বদ্ধ কুটির।যেখানে আপনি তিলে তিলে নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বদ্ধ কুটিরের অন্ধকার থেকে নিস্তার নেই। অথচ নিজের অজান্তেই আমরা নিজেকে এই অন্ধকারে ডুবিয়ে দিই। দিন শেষে আপনার আমার যখন জানা হলো পরিবারে নিজেদের অবস্থানের কথা, তখন আর পারি না সামনে দু’পা এগুতে অথবা পিছনে ফিরে তাকাতে। সময় থাকতে আমরা নারীরাই যদি নিজেকে মূল্যায়ন করতে না পারি চিরকাল এমনিই অন্ধকারে বিলীন হতে হবে। যে স্বামীকে আপনি দেবতার মতো সম্মান করেছেন, সে আপনার এই ত্যাগের কাছে কতটা সম্মানের কিংবা সে আপনার এই ত্যাগের বিনিময়ে কতটা সম্মান করে আপনাকে! যে স্বামী সংসারের ছোট বড় যেকোন সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছামতোই নেয়।সেখানে আপনার মতামত নেবার কোন প্রয়োজনই মনে করে না। আপনি সময়মতো ওষুধ খাচ্ছেন কিনা অথবা তরকারিতে লবণ দিলেন কিনা সেসব বিষয় থেকেও জরুরি ভিত্তিতে আপনাকে মনে রাখতে হয় সংসার খরচের পাই-পাই হিসেব। অন্যথায় আপনাকে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়। সেখানে এই মানুষটি থেকে কতোটুকু সম্মান আপনি আশা করতে পারেন! আমার অতি ক্ষুদ্র জ্ঞানে তাকে আর যাই হোক স্বামী বলা যায় না। তার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে সে বর হয়েছে ঠিকই কিন্তু সে তো পুরুষ নামক সিংহদের অনাসৃষ্টির একাংশ। তাই সে শুধুই বর, হৃদয়াসনে অধিষ্ঠিত স্বামী নামক দেবতাটি নয়। আবার অনেক উপার্জনক্ষম নারীও কিন্তু এমন অবহেলিত যার হিসেব আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। মনে করি তারা কতো সুখী। তারাও কিন্তু সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করে। সংসারে আমরা নারীরা যে ত্যাগ করে আসছি তা সত্যিই বেদনাদায়ক।

অনেকেই হয়তো ভাববে এর ভিন্নতাও আছে। হ্যাঁ, তা আছে বৈকি, কিন্তু তা সংখ্যায় অতি নগণ্য। তবে এটা ধ্রব সত্য যে সংসারে অধিকাংশ নারীই পরনির্ভরশীল এবং তারা সব সময়ই অবহেলিত ও বিভিন্নভাবে নির্যাতিত।

হয়তো ধরুন কোনো একটি কাজ আপনি মোটেও পছন্দ করেন না কিংবা ওই কাজটি করতে অসম্মানিত বোধ করছেন। এ বিষয়টি আপনার স্বামী জানার পরও তিনি আপনার সম্মানের দিকে না তাকিয়ে, আপনার ভালো লাগার বিষয়টিকে মূল্যায়ন না করে শুধু তাঁর সুনামের জন্য, সমাজে তাকে জাহির করার জন্য, নিজেকে উদ্ভাসিত করার জন্য বা কিছুটা সমৃদ্ধির জন্য অনায়াসে তিনি সে কাজটি করলেন। এ বিষয়টি তাকে যখন বোঝাতে যাবেন, তখন আপনার উপর ছুড়ে দেবে অসহায়ত্বের এক অদৃশ্য হুমকি। প্রচ্ছন্নভাবে বুঝিয়ে দিল তাকে ছাড়া আপনি অচল, অসহায়। আপনার সম্মান দলিত করে সে চলে গেল। একবার কি ভেবে দেখেছেন, এ আঘাতটা আপনার কোথায় গিয়ে লেগেছে? আপনি কাঁদলেন কি কাঁদলেন না, মনঃকষ্টে আপনি খেলেন কি খেলেন না; তার কিছুই আসে যায় না।

এ বিষয় নিয়ে ভাবেই না। এমন মানুষকে আপনি নিজের জন্য কতটা যোগ্য মনে করবেন জানি না! যে আপনার চোখের জল দেখে মুখ টিপে হাসে, আপনার কষ্টে সে অনুতপ্ত হয় না কিংবা পেছন ফিরে থাকে। একবার বলুন তো, সেই মুহূর্তে আপনার স্বামীর সামান্যতম সহানুভূতি কি আপনি আশা করেননি? কিন্তু কী পেলেন তার কাছ থেকে? এমন অবহেলিত নারীদেরকে বলছি, আপনারা সত্যি করে বলুন তো, ওই পরিস্থিতিতে আপনার কি ইচ্ছা করেনি সব ছেড়ে পৃথিবীতে নিজের মতো করে বাঁচতে? স্বনির্ভর হয়ে সংসারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে? এমনি হাজারো ইচ্ছাটাকে গলা টিপে মেরে ফেলে, কখনো কখনো মনের চাহিদাগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে-দিতে ওই নারী যখন একজন স্বয়ংসম্পন্ন মায়ের অবস্থানে, ঠিক তখনই অমানিশার গাঢ় অন্ধকারেও একটি আশার প্রদীপ মনের কোণে কিঞ্চিৎ জ্বালিয়ে প্রতিক্ষা করে সন্তানের কাছে সঠিক মূল্যায়নের। তারা মনে করে সন্তান তো তার নিজের, তার নাড়িছেঁড়া ধন। সাত রাজার মানিক; তার কাছে নিশ্চয়ই নারী অনেক সম্মানিত। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। প্রতিটি সন্তান মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন হলেও সে তার বাবাকে অনুসরণ করে বড় হয়। স্বামীর সংসারে যা-ই হোক, রাগ-অনুরাগের সামান্য সুযোগ হয়তো বা থাকে, এখানে তো তাও থাকে না। সন্তানের যা কিছু সমৃদ্ধি সব তার নিজের অর্জন, আর যা কিছু ব্যর্থতা তার সবটুকুর দায়ভার বাবার কাঁধে তুলে দিতে সন্তানের কার্পণ্য থাকে না।

এসব সন্তানের মুখে যদি কখনো শোনা যায় যে মা হয়ে তার জন্য আপনি কিছুই করেননি, তার প্রিয় বান্ধবীটি এসে হাত ধরেছিল বলেই তার উন্নতি হলো! ওই মুহূর্তে নারীকে শক্ত থাকতে হবে। কোনো ক্রমেই ভেঙে পড়া যাবে না। ভাবতে হবে, ওই সন্তানকে আপনি সুশিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তখন আপনার সান্ত্বনা একটাই আপনাকে অসম্মান করতে গিয়ে যাকে সে সম্মান দিল সেও তো একজন নারী। এটুকু পাওয়াই বা কম কিসে। ওই মুহূর্তে তাকে যখন কিছু বলতে যাবেন, তখন আপনার তথা ওই নারীর কপালে এসে ভর করবে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা। একাকিত্বের জীবন কাটাতে হবে অনন্তকাল। অবশেষে এই হবে পরনির্ভরশীল নারীর শেষ আশ্রয়স্থল। যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। কারণ নারীর স্বাধীনতা না আছে পিত্রালয়ে, না আছে স্বামীর সংসারে, আর না আছে সন্তানের কাছে।

তাই আহ্বান জানাব, এ রকম পরনির্ভরশীল শত-শত নারী যারা এখনো অসহাত্বের মধ্যে জীবনযাপন করছেন, অন্ধ হয়ে কলুর বলদের মতো সংসারের চাকায় পিষ্ট হচ্ছেন নিজের সম্মানকে জলাঞ্জলি দিয়ে, নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন যৌতুকের কালো থাবা, যারা নিরুপায় হয়ে আত্মহননের কথা ভাবছেন, তারা একবার নিজের জন্য কিছুটা সময় নিয়ে ভাবুন তো! কী হবে এভাবে নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়ে! এ সংসারে কেউ আপনাকে নিয়ে ভাববে না। নিজের ভাবনা নিজেকেই ভাবতে হবে। নিজের জীবন নিজেকেই গড়ে তুলতে হবে। নিজের অধিকার নিজেকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এটা কেউ আপনার হাতে তুলে দেবে না। তাই এবার নিজের জন্য কিছু করুন। নিজের যতটুকু যোগ্যতা-সামর্থ্য আছে, তার ওপর ভর করেই এগিয়ে চলুন সামনের দিকে। পুরুষশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ভেদ করে, একবার সমস্ত বাধার বেড়াজাল ছিন্ন করে, প্রতিবন্ধকতার পাহাড় ডিঙিয়ে সময় থাকতে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করুন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করুন নারীরাও মানুষ! নারীরাও পারে। সুতরাং আমি নারী, আমিও পারব, আমাকে পারতেই হবে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রমাণ করতে হবে পুরুষ যা পারে, নারীরাও তা পারে। আপনাকে অনুসরণ করবে পরবর্তী নারী প্রজন্ম। শত শত বেগম রোকেয়া তৈরি করতে হবে। আর কোনো নারীকে যেন যৌতুকের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে না হয়, অবহেলার নোনাজলে নিজ

অবহেলার নোনাজলে নিজেকে খাক হয়ে যেতে না হয়, সাগরের অথই জলে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে না হয়; আর কোনো কষ্টের পাহাড় যেন কোনো নারীর কাঁধে চেপে না বসে, কাউকে যেন আর আফসোস করতে না হয়, নৃসংশতায় অকালে প্রাণ দিতে না হয়। শেষ জীবনে যেন কোনো নারীর ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সে পথ এখনই তৈরি করতে হবে নিজের মেধা, বিবেক-বুদ্ধি আর কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে। পৃথিবীর আর কোনো নারীকে যেন বলতে না হয়, জীবনে আত্মনির্ভরশীল না হওয়াটাই চরম ভুল ছিল, পরম অপরাধ ছিল। কারণ নারীদেরও অধিকার আছে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার।

রীতা ধর, লেখক ও কবি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।