ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার রুহিয়ায় ড্যান্ডু নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে পথ শিশুরা। যে বয়সে তারা নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার কথা সেখানে পড়ালেখার পরিবর্তে তারা সারাদিন ঘুরে বেড়ায় ড্যান্ডু নেশার পিছনে। গত বৃহস্পতিবার মো রফিকুল ইসলাম (সাবেক ইউপি সদস্য, রুহিয়া ইউপি) কিছু পথ শিশুদেরকে তার রাইস মিল সংলগ্ন রেললাইনে ড্যান্ডু সেবন অবস্থায় আটক করে, পরে তাদের অভিভাবকের হাতে তুলে দেয়া হয় ৷
এদের নাম, বিশাল, শাহীন, আপেল, রাসেল, রাকিব । ওই শিশুদের কাছ কৌশলে জানা গেল, কম দামে জুতার লাগানো গাম কিনে পলিথিনের ব্যাগে ঢ়ুকিয়ে শ্বাস নেওয়া হয়, যা থেকে এক প্রকার নেশা তৈরি হয়ে যায়। এ নেশা তাদের কাছে ড্যান্ডু নামে পরিচিত। অল্প পয়সায় এই নেশা করা যায় বলে এতে ঝুঁকে পড়ছে এক শ্রেণীর পথশিশুরা।এক জনের কাছ থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্যজনের কাছে। এমনই তথ্য পাওয়া গেল নেশাগ্রস্ত শিশুদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের বয়স আনুমানিক ৮ থেকে ১২ বছর। মরণ নেশা ড্যান্ডু নেশাতে তাদের সাথে রয়েছে আরো ৮-১০ জনে একটি সংবদ্ধ চক্র এরা সবাই পথ শিশু।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫০ থেকে ৬০ টাকায় এক ধরনের জুতার আঠা, সাইকেলের সলডিভিশন (টায়ারের গাম) কিনে শিশুরা। বিভিন্ন দোকানে এসব গাম পাওয়া যায় বলে জানা যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পলিথিনের ব্যাগে আঠালো ওই পদার্থ নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাঁকানো হয়। তারপর পলিথিন থেকে নাক বা মুখ দিয়ে বাতাস টেনে নেয়। এই নেশা ড্যান্ডু নামে পরিচিত।
কথা হয় রাসেল নামে এক পথ শিশুর সাথে। রাসেল জানায়, আগে সে প্রতিদিনই এই ড্যান্ডু নেশা করতো তবে এখন আর সে এই নেশায় আসক্ত নেই। তবে তার সাথে থাকা ১০-১৫ জন প্রায় প্রতিদিনই এই নেশা করছে। রাসেল জানায়, রুহিয়া ডিগ্রী কলেজের লিচু বাগান, রেল ষ্টেশনের দক্ষিন দিকে ভাংগাপুল সহ রুহিয়া ছালেহিয়া মাদরাসার কবরস্থানের বট গাছের তলায় ড্যান্ডু সেবন করে তারা৷ তীব্র গন্ধ না থাকায় কেউ নেশা করার সময় তাদের ধরতে পারে না।
রুহিয়া ডিগ্রী কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মো. মজিবর রহমানকে লিচু বাগানে ড্যান্ডু সেবনের কথা বললে তিনি বলেন, দিনের বেলা আমরা নিজেরাই খেয়াল রাখি কিন্তু রাতে কলেজের প্রাচির পার হয়ে তারা এ কাজ করে ৷
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ড্যান্ডু সেবন কারীকে খরচ কেমন জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, এ নেশার খরচ কম, ড্যান্ডুর নেশা বড়ই মারাত্মক, সময় মত না পাইলে মাথা ঠিক থাকে না ।
এ ব্যাপারে রুহিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার রিপন রায় জানান, জুতার আঠার উগ্র ক্যামিক্যালের নির্যাসে তারা নেশায় আসক্তি হয়। দীর্ঘদিন এটি ব্যবহারের ফলে ঠোঁঠে, জিহব্বায়, গলায় ও খাদ্য নালিতে ক্যান্সার আক্রান্ত হতে পারে ।
রুহিয়া গিন্নিদেবী মহিলা কলেজের প্রভাষক গোলাম মোস্তফার সাথে কথা হলে তিনি জানান, পথ শিশুরাও স্বপ্ন দেখে দেশ গড়ার । সমাজের সকল বিত্তবানেরা যদি পথ শিশুদের সাহায্যে এগিয়ে আসে তাহলে এসমস্ত পথ শিশুদের আগামী দিনগুলো সুন্দর হতো। এমনকি তারাও হতে পারে আগামী দিনের ভবিষ্য কর্ণধার ৷
এদিকে এই ড্যান্ডুর প্রধান উপকরণ জুতার আঠা পথ শিশুদের কাছে বেশি মুনাফার আশায় বিক্রয় করছে এক ধরনের ব্যবসায়ীরা। এইসব বিপথগামী পথ শিশুদের তো ব্যবসায়ীরা চেনেন। ব্যবসায়ীরা জেনে বুঝেই শিশুদের কাছে এসব উপকরণ তুলে দিচ্ছেন সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য।
মেসার্স ছালেহিয়া হার্ডওয়্যারের রবিউল ইসলাম বলেন, ড্যান্ডি বা টেষ্টিং আঠা যখন শুনেছি নেশা হিসেবে ব্যবহার হয় তখন থেকে বিক্রয় করিনা ৷ বিপথগামী এসব পথ শিশুরা সাময়িক সুখের প্রত্যাশায় হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের চোরাবালিতে। তাদের জীবন হয়ে পড়ছে জরাজীর্ণ। এই পথ শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে। এসব বিপথগামী শিশুদের ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আর এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগিয়ে আসা জরুরী বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
এ ব্যাপারে ১নং রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো মনিরুল হক বাবু বলেন, কিছুদিন থেকে ড্যান্ডু নেশার কথা শুনছি। প্রশাসন, লোকাল প্রশাসন, অভিভাবক সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মরণ নেশা ডান্ডুর হাত থেকে পথ শিশুদের বাঁচানো সম্ভব৷ বড় ধরনের একটা অভিভাবক সম্মেলনের প্রয়োজন৷
রুহিয়া থানার ওসি প্রদিপ কুমার রায় বলেন, বেশকিছু ড্যান্ডু সেবককে আমরা হাজতে দিয়েছি, আবারও পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমান আদালতে অথবা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে ।
