১৫ দিন আগেও ভিটেমাটি ও ফসলি জমির মালিক ছিলেন কৃষক মো. ফয়েজুল্লাহ। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিলো সেই ভিটেবাড়িতে। কিন্তু আজ তাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে সর্বনাশী মেঘনা নদী। ৬ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তিনি আজ পথের ফকির।
এর চেয়েও ভয়াভহ অবস্থার বর্ণনা দিলেন দিনমজুর নাজিম বক্স। মেঘনা নদী তীরে তাদের বক্সী বাড়ি। প্রায় ৩৫ পরিবারের বসবাস ছিলো ওই বাড়িতে। গেল এক সম্পাহ আগে পুরো বাড়িটি মেঘনা গ্রা করে নেয়। গৃহহারা নাজিম বক্স বলেন, বসতভিটা মেঘনাতে বিলীন হওয়ায় তিনি বেড়ি বাঁধের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন।
সপ্তাহখানেক আগে কৃষক আবুল কাশেমের বসতবাড়িটিও নদী নিয়ে যায়। তবে ভিটেবাড়ি ভাঙনের আগেই ঘরটি সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। অন্যের জায়গায় ঘরের আসবাবপত্র রেখে দিলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিনযাপন করছেন।
এসব ঘটনা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেজান্ডার ইউনিয়নের বালুরচর এলাকার। নদীভাঙনের শিকার মানুষের দুর্দশার এমন ঘটনার শেষ নেই।
শুধু কৃষক মো. ফয়েজুল্লাহ, আবুল কাশেম বা দিনমজুর নাজিম বক্স নয়, এ রকম ইতিহাস ওই এলাকার প্রায় ৫ হাজার পরিবারের। শনিবার সকালে মেঘনা নদীর তীরে সরেজমিনে গেলে দেখা মেলে এমন করুণ দৃশ্য।
এলাকাবাসী জানান, গেল এক বছর ধরে আগ্রাসী মেঘনা নদী। কয়েক বছর ধরে ভাঙন দেখা দিলেও এক বছর থেকে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত গৃহহারা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এখনো হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকশ পরিবার। কথা হয় এমন কয়েকজনের সাথে।
নদীর তীরের বাসিন্দারের শেষ ভরসা এখন সৃষ্টিকর্তার আর্শিবাদ আর সরকারি পদক্ষেপ। শনিবার সকালে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পেতে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া চেয়ে প্রার্থনা করেছেন স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। এর আগে কোরআন খতম করেছেন তারা। আর সরকারের সুদৃষ্টি পেতে মানববন্ধন করেছেন।
শনিবার সকালে কয়েক হাজার গ্রামবাসী ভিটেমাটি রক্ষার দাবিতে মানববন্ধনে শামিল হন। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় জনপ্রতিধি, রাজনৈতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষার্থীসহ শিশুরাও। সরকারের কাছে তাদের দাবি, ‘ভিক্ষা নয়, অধিকার চাই; নদীভাঙা রোধ চাই’।
মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘বালুরচর রক্ষা মঞ্চ’ নামের স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন।
মানববন্ধনে এলাকাবাসী জানায়, ভয়াভহ ভাঙনে ইতোমধ্যে বালুরচর এলাকার বাংলা বাজার পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে হুমকির মধ্যে রয়েছে জনতা বাজার, কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অচিরেই এগুলো নদীতে হারিয়ে যাবে।
তারা আরো জানান, রামগতি এবং কমলনগর উপজেলার একাধিক স্থানে ভাঙন প্রতিরোধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলেও এ এলাকায় এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কয়েকদিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ভাঙনকবলিত এলকা পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন। দিন দিনই সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি হারা হচ্ছে। তাই দ্রুত সরকারি সহায়তা দাবি করেন নদী তীরের বাসিন্দারা।
আলেকজান্ডার ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, মেঘনার ভাঙনের মুখে এরই মধ্যে ইউনিয়নের চরসীতা গ্রাম ও বাংলা বাজার বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে আসলপাড়া, শিকদার পাড়া, উকিলপাড়া ও সুজন গ্রামসহ কয়েকটি গ্রাম। এছাড়া স্থানীয় জনতা বাজারের কাছে নদী চলে এসেছে।
