আসিকের ভাগ্নে ঢাকায় একটা বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরী করে । ভাগ্নের জন্য অারো একটা ভালো চাকরীর ব্যাপারে এক অাত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসিক এবং অাসিকের মেজ দুলা ভাই ঢাকায় গিয়েছিল। তিন চার দিন ঢাকায় থেকে আসিক এবং তার দুলা ভাই কুষ্টিয়াতে চলে অাসার সিদ্ধান্ত নিল ।
আসিকের এলাকার অাসিকের এক বান্ধবী নাম “রকসী ‘ রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে এস আই এর ট্রেনিং করছে। ট্রেনিংও প্রায় শেষের দিকে। রকসীরা এক সঙ্গে বাওয়ান্ন জন ট্রেনিং করছে। অাসিক বেশ কয়েকবার সারদায় বেড়াতে গিয়েছিল। পুলিশ অফিসারদের এক বছর ট্রেনিং হয়। রকসীর সুবাদে অনেকের সাথে অাসিকের পরিচয় হয়েছিল। শাহানা, জেসমিন,রুনি,রানা শারমিন,সোনিয়া,গুলশান অারা, শিউলী অারো অনেকে । এদের মধ্যে রকসীর ন্যায় শাহানার সাথেও অাসিকের সব রকম অালাপ চারিতা চলত। শাহানাও আসিকের সাথে বেশ মজা করত।
অাসিক ২৮/০৭/২০০৪ ইং তারিখে গভীর রাতে খাতা -কলম নিয়ে পত্র লিখতে বসল ” শাহানা,পত্রে অামার ফুলেল শুভেচ্ছা নিবেন। অাগে বলুন -কেমন আছেন। নিশ্চয় খুব ভাল অাছেন। অারো ভাল থাকুন সেই দোয়াই করি । অামার কথা কি আর বলব -কোন প্রকার ভাব খুঁজে পাচ্ছি না। তাহলে আপনিই বলুন, ভাল থাকি কি করে? যাই হোক, পর অালাপনে আসি। কেমন? কি, শুনছেন তো। না একেবারে গল্পে মসগুল হয়ে আছেন।
সে যাই হোক, আজ আপনাকে এমন একটা চিঠি লিখব – যা একটা ছোট গল্প মনে হবে। এই তো সে দিন মোবাইলে আর সাথে কথা বলার সময় মাঝে -মধ্যে আপনার অট্টহাসি যেমন মধুর লেগেছিল, তেমনি ঢাকা থেকে অাসার পথে বাসের ভিতরে একটি মেয়ের চাপা হাসি প্রচুর মিষ্টি লেগেছিল। অামি অার অামার মেজ দুলা ভাই পাশাপাশি সিটে বসেছিলাম। আমাদের সামনের সিটে ওরা দু ‘জনই মেয়ে ছিল। ওরা দুই জন বোন তা পরে বুঝতে পারলাম -ওদের কথাবার্তা শুনে । বড় বোনের সাত /আট বছরের একটা মেয়ে ছিল । চাপা হাসিওয়ালার নাম আমি জানি না। তবে আপনার সুবিধার্থে তার নাম দিলাম “অনামিকা “কুষ্টিয়াতে আসার একেবারে শেষ ট্রিপ ছিল। তাই নির্ধারিত সময় ছাড়াও অনেক দেরীতে বাস ছেড়েছিল। আমাদের বাস যমুনা সেতু হয়ে এসেছিল। সাভারে এসে অারো কিছু সময় দেরী করল।সাভার নবীনগর পার হতে না হতেই রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। অনেকের চোখে ঘুমের পরশ নামতে শুরু করেছে। অনামিকার বড় বোন তার মেয়েকে কোলের উপর নিয়ে ঘুমিয়ে -ঘুমিয়ে পড়তে লাগলেন। এ দিকে আমার দুলা ভাইও ঘুমিয়ে -ঘুমিয়ে পড়লেও তখন পর্যন্ত বেশ চেতন – চেতনভাব লাগছিল। আর আমাদের দুই জনের চার চোখের এক চোখেও ঘুমের পরশ অাসেনি। ঘুম না অাসার জন্য মনে হয় আমিই বেশী দায়ী ছিলাম। তবে হ্যাঁ, চুলচেরা বিচার করলে অনামিকাও কম দায়ী ছিল না। কেনন, ও পিছন ফিরে-ফিরে বারবার আমার দিকে অমুন করে কেন তাকাতে লাগল? ভ্রমনের পথে সত্যিই এমন জনরা প্রশংসার দাবীদার। এত নীরব হয়ে যাওয়াটা অামার কাছে একেবারে অসহনীয় লাগছিল। আমি কোন উপায় অন্ত না পেয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আক্ষেপজনিত কণ্ঠে আস্তে -আস্তে বললাম, “এমন বাসেই অাজ উঠেছি, একেবারেই নীরব। “
আমার কথা পৃথিবীর আর কেউ না শুনলেও যার শোনারর দরকার সে ঠিকই শুনেছিল। অনামিকাও যে চেতন আছে -তা আমাকে বুঝানোর জন্য গলায় ছোট্ট একটা কাশির মত শব্দ প্রয়োগ করল। আসলে মেয়েরা না -খুব চমৎকার। আমি ওর কাশির শব্দ শুনে নীরব ভূমিকায় অবতীর্ন হলাম। আমার দিক থেকে কোন প্রকার সাড়া শব্দ না পেয়ে অনামিকা তার দীঘল ঘন কালো পেখম মেলানো কেশে বাম হাত খানা সঞ্চালন করতে লাগল। আমি পরিস্কার বুঝতে পারলাম -ও একটা কিছু ভাবছে। অামি আরো লক্ষ্য করলাম -অনামিকা মাথাটা ঈষৎ পিছনের দিকে ঘুরিয়ে -ঘুরিয়ে অামাকে দেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু অামি এমন ভাব প্রদর্শন করলাম -যেন আমি একেবারে ঘুমিয়েই গেছি। একটু -একটু করে নাক ডাকানোরও চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার কৃত্রিম নাক ডাকানোর ঈষৎ শব্দ অনামিকার কর্নকুহুরে প্রবেশ করা মাত্রই অনামিকা বলে উঠল – ” ওরে অামার ঘুম -রে “। এই কথা শেষ হতে না হতেই এমন একটা হাসির ঝলক অনামিকা বাসের ভিতর ছড়িয়ে দিল, এ যেন স্বগীর্য় হাসি। অাশে -পাশের দু ‘চার জন চেতন হয়ে গিয়েছিলেন কিনা জানি না, তবে ওর আপার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। এ দিকে অামার দুলা ভাইকেও দেখলাম -একটু নড়েচড়ে উঠলেন । তাতে বুঝলাম -দুলাভাইয়েরও ঘুম যায় – যায়। আমার এই মেজ দুলাভাই, বড় দুলাভাইয়ের মত চালাক চতুর না। খুব সহজ -সরল মানুষ। তাই আমাকে অার ভাল মন্দ কিছু জিঙ্গাসাবাদ না করে অাবার ঘুমের রাজ্যে প্রবেশ করলেন। অনামিকার আপা অনামিকাকে বললেন, ” কিরে, হাসলি কেন ? ” ” না আপু,তেমন কিছু না। একটা তাজা ঘুম বাসের ভিতর প্রবেশ করেছে তো, তাই হাসি পেয়েছিলাম। ” অনামিকার অাপা এই কথার কোন অর্থ বুঝতে পারলেন না। অনামিকা অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার নিমিত্তে আপার কোলের মেয়ের হাত ধরে টানতে -টানতে বলল, ” মুন্নি, তুমি তো একেবারেই দেখছি ঘুমিয়ে গেছ। এসো মা মনি, অামার কোলে এসো। ” ছোট্ট মেয়েটার নাম “মুন্নি ” তা অামি শুনে ফেললাম । ওদের কথোপকথনে অামার দুলাভাইয়ের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। অামার দুলাভাই অামার গায়ের উপর হাত দিয়ে বললেন, “কিরে, একেবারে যে ঘুমিয়ে গেছিস। “সত্যিকারের মত গাল হা করে, একটা অাড়ামোড়া দিয়ে, ঘুম ভাঙ্গানোর ভাব দুলাভাইকে দেখিয়ে বললাম, “না, ও, হ -হ – হ । ” দুলাভাই অার তেমন কিছু জিঙ্গাসা করলেন না। উনি অাবার ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলেন । অামি দুই হাত উপরের দিকে তুলে বকের মত গলাটা একটু খানী উঁচু করে লুকিয়ে দেখলাম -অনামিকা অামার অামতা্-অামতা্ কথা শুনে হাসি রোধ করতে না পেরে অবশেষে উড়নার এক প্রান্ত গালের সাথে ধরে রেখেছে। গালের ভিতরেই ঢুকিয়ে রেখেছে কিনা তাই বলবে কে ?।মুন্নি তার খালার কোলে গেল না । যেমন পরিবেশ ছিল, তেমন পরিবেশ ধীরে -ধীরে বিরাজ করতে লাগল।
বাস শাঁ -শাঁ বেগে ছুটে চলেছে। চলমান অবস্হায় বাসের ভিতর কোন অালো দেওয়া ছিল না। অাকাশে অবশ্য অাবছা -আবছা জ্যোৎস্না ছিল ঢাকা,টাঙ্গাইল,সিরাজগঞ্জের দিকে এখন বন্যা হচ্ছে । এক সময় যমুনা সেতু পার হয়ে আমরা সিরাজগঞ্জের উল্লা পাড়ায় এসে পৌঁছিলাম । একটা সুন্দর হোটেলের সামনে অামাদের বাস এসে থামল। দুর পাল্লার প্রায় সব বাস এখানে এসে থামে । অনেকেই খাওয়া -দাওয়া করলেন, আবার অনেকেই এদিকে -ওদিকে একটু হাটা -হাটি করে হাত মুখ ধুয়ে বাসে চেপে বসলেন । আমি খাবার টেবিলে বসার আগে মাথা উচুঁ করে চতুর দিকে একবার অাঁখিদ্বয় ঘুরালাম কিন্তু কোন টেবিলে অনামিকাদের দেখতে পেলাম না । দেখলে হয়ত তাদের টেবিলের কাছে বসার চেষ্টা করতাম । তা অার হল না। আমার এ হেন ভাব -ভঙ্গি দেখে দুলা ভাই আমাকে বললেন, “তুই ও রকম করছিস কেন? কি ও রকম দেখছিস? “
দুলা ভাইয়ের কথা শুনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম, “কি অার দেখব দুলা ভাই, অামার কি দেখার কেউ অাছে ? ” “হয়েছে, তোর শুধু ঐ একই কথা। নে, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে । ” দুলা ভাই এই বলে অার বিশেষ কিছু বললেন না । অামি ভাত অার রুই মাছ নিলাম, দুলা ভাই রুটি অার মাংস নিলেন। অামি খাচ্ছি অার অনামিকাকে মনে -মনে খুঁজছিলাম । খাওয়া মাত্র শুরু করেছি, এমন সময় ভিতর থেকে অামাদের টেবিলের পাশ দিয়ে অনামিকারা চলে গেল। প্রথম দিকে অামি খেয়াল করেছিলাম না। অামাদের টেবিল পার হয়ে গেলে অামি বুঝতে পারলাম অনামিকারা চলে গেল। অানন্দে,উৎফুল্ল চিত্তে, অনাকারণে অামি দুলা ভাইকে “দুলা ভাই ” বলে জোড়ের সাথে ডেকে দাঁড়িয়ে উঠেছিলাম । গালপূর্ণ ভাত থাকায় ডাকটা পরিস্কার না হলেও অনামিকা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। অনামিকা পিছনের দিকে শুধু মুখ খানা ঈষৎ ঘুরিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিময়তায় বাঁকা চোখে অামার দিকে তাকিয়ে, শব্দবিহীন মিষ্টি মধুর একটা হাসি উপহার দিয়ে চলে গেল । এরপরে দুলা ভাই ভাত নেওয়ার কথা বললেন, নাকি তরকারী নেওয়ার কথা বললেন, সে দিকে অামার কোনই খেয়াল ছিল না। প্লেটের দিকে না তাকিয়েই অামি বললাম, “অামার খাওয়া শেষ। “পরে প্লেটে ঈষৎ নজর পরতেই দেখি ভাত -তরকারী সবই অাছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত খাওয়া শুরু করলাম। ক্ষণকাল পরে অামরা বাসের কাছে গেলাম। বাহির থেকেই লক্ষ্য করলাম -বেশ কয়েকজন যাত্রী সিটে বসে অাছেন। পাশের দোকান থেকে দুলা ভাই পান কিনে অানলেন। বাসের ভিতরে গিয়ে সিটে বসতে -বসতে লক্ষ্য করলাম -অনামিকা তার অাপার সাথে কথা বলছে অার কলা ছুলে -ছুলে খাচ্ছে। মুন্নি চিপস্ খাচ্ছে। ওরা যে হোটেলে খায়নি তা অামার কাছে পরিস্কার হয়ে গেল কলা খাওয়া দেখে। সে যে কি খাওয়া গো । দুলা ভাই কি যেন বলছিলেন। অামি দুলাভাইকে বললাম, ” চুপ করেন তো, অামি কলার হিসাব করছি। আমাকে এখন disturb করবেন না। “কলার হিসাব কি দুলা ভাই ধরতে পারলেন না। হতবিহবল হয়ে শুধু অামার দিকে একবার তাকালেন। দুলা ভাই জানেন -অামি দুলা ভাইয়ের সঙ্গে মসকরা করি। সেইটা মনে করে দুলা ভাই অামাকে অার ভাল মন্দ জিঙ্গাসা করলেন না। অবশ্য যে বুঝল সে কোন্ রাগে -ক্ষোপে কলা অারো জোরো -জোরে খাওয়া শুরু করল তা কে জানে । তবে অামার ধারনা ওর হাত থেকে কলা কেড়ে নিয়ে খাইনি বলে ও রাগে -ক্ষোপে খেয়ে নিল। অবশ্য মন বলছিল -এক থাবা মেরে ছুলা কলা কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলি কিন্তু সম্ভব হল না। গাড়ী দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে। অামি ইচ্ছা করেই মাঝে -মধ্যে নীরব থাকছিলাম। গাড়ীর ভিতরকার পরিবেশ একেবারে নীরব। কখনো -কখনো পার্শ্ববতী লাইটের অালো গাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করছে। অামি লক্ষ্য করলাম, অনামিকা পার্শ্ববতী লাইটের অালোর সাহায্যে ঘড়ির সময় দেখে নিল। জানি না, কোন্ অাবেগের বশবতী হয়ে এরপরেও বেশ কয়েকবার কখনো হাত উচুঁ করে -করে ঘড়ি দেখতে লাগল অাবার কখনো ঘাড় বাকিঁয়ে -বাকিঁয়ে ঘড়ির সময় দেখতে লাগল। ঘাড় বাকিঁয়ে -বাকিঁয়ে এমনভাবে ঘড়ি দেখতে লাগল, তার অাসল উদ্দেশ্য অামি বুঝতে পারলাম। অামি ঘুমিয়ে পড়েছি কিনা তা দেখাই তার অাসল উদ্দেশ্য। এবার যখন অনামিকা ঘড়ির দিকে তাকাল, তখন অামি অকস্মাৎ বলে ফেললাম “দেখি এবার অামার ঘড়িতে কত বাজে? অামার এই কথা শুনে অনামিকা চাপা হাসিতে একেবারে এতটুকু হয়ে গিয়েছিল। তখন ওকে দেখতে যা ভাল লাগছিল! ক্ষণকাল পরে অনামিকা যখন অামার দিকে তাকাল তখন অামি হঠাৎ করেই বলে ফেললাম, দিনের বেলায় ঢাকায় অাসার সময় বন্যা দেখতে -দেখতে এসেছিলাম অার এখন যাচ্ছি রাত দেখতে দেখতে ।”যাচ্ছি ” এর পরে বলতে গিয়ে অামি থেমে গিয়েছিলাম। মেয়েরা এত দ্রুত বুঝতে পারে যা কল্পনাতীত। থেমে যাওয়া মাত্রই অনামিকা বুঝতে পেরে হাসতে শুরু করে দিয়েছিল। অাসলে অামি ” রাত ” এর জায়গায় বলতে চেয়েছিলাম -“একজন সুন্দরী মেয়েকে দেখতে দেখতে যাচ্ছি। কিন্তু অামার “রাত ” বলাতে অনামিকার হাসির গতিবেগ অারো বেড়ে গিয়েছিল। চাপা হাসিতে অনামিকা মাথা নিচু করে বেশ অনেক সময় ছিল। অামিও প্রতিঙ্গা করেছিলাম -দেখি ও কত সময় এভাবে ডুব দিয়ে থাকে । অামি ওর দিকে পলকবিহীন চেয়েই ছিলাম। অনামিকা হয়ত ভেবেছিল -আমি এতক্ষণে অন্য দিকে তাকিয়ে অাছি। মাথা উচুঁ করে, ঈষৎ ঘাড় বাকিঁয়ে সবেমাত্র তাকিয়েছে অমনি অামার চোখে ওর চোখ পড়ে গেল। বিধাতার কোন্ মধুর হাসির বান ডেকে, সে যে কত ভঙ্গিমায় অঙ্গ -ভঙ্গি করতে লাগল তার কোন ইয়াত্তা নেই। কভূ চায় বাহির পাানে, কভূ চায বাসের ছাদের দিকে। ঈষৎ অালো আবছায় সে সময় অনামিকাকে অসম্ভব রকমের ভাল দেখাচ্ছিল। অাহা, মায়াবী কোমল সোনার বদন খানী যেন দুধে অালতায় ছাওয়া।
নাটোরের বন পাড়া মোড় থেকে কয়েকজন যাত্রী নেমে গেলেন। সেই কারণে বাস একটু খানী থেমেছিল। অামি অার অনামিকা তো জেগেছিলামই, অামাদের অন্য প্রানীগুলোও ক্ষণিকের জন্য জেগেছিলেন। বাস ছাড়ার কিছু সময় পরেই অাবার নীরব পরিবেশ বিরাজ করতে লাগল। অনামিকার অাপা এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন -এটা অামি পরিস্কার বুঝতে পারলাম। এ দিকে অামার দুলা ভাই তখন পর্যন্ত চেতন অাছেন। তবে কোন প্রকার কথাবার্তা বলছেন না। জানালা দিয়ে দুর পানে চেয়ে অাছেন। অনামিকাও জানে -অামার দুল ভাই জেগেঅাছেন। নীরবতার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হতে লাগল ।
কোন এক সময় অামি লক্ষ্য করলাম -অনামিকার ডাগর -ডাগর অাঁখির পাতায় ঘুম টস্ -টস্ করছে। ওর অাপার মত অও ঘুমের রাজ্যে সবেমাত্র প্রবেশ করতে যাবে এমন সময় অামি বলে উঠলাম -দুলা ভাই, অাপনি ঘুমাচ্ছেন কেন? অনামিকা হয়ত ভেবেই নিয়েছিল -অামার দুলা ভাই সত্যি -সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। অামার দুলা ভাই আমাকে একটা ধোমক দিয়ে বলে উঠলেন -” ধোট,ঘুমাচ্ছি কোথায়? তুই তো দেখছিস্ অামি জেগেই আছি। ” এবার বলুন, অামার অবস্হা কি হতে পারে । অামি তো মুহুর্তের মধ্যে জড়ো -সড়ো হয়ে গেলাম। আমার এ হেন দুরাবস্হা দেখে অনামিকা যে কি পরিমান হেসেছিল তা বলা মুসকিল। তার সেই হাসি ছিল সম্পূর্ণ চাপা হাসি। চাপা হাসিতে নাকি মানুষের পেট ফুলে যায়। তবে ওর পেট ফুলেছিল কিনা তা জানি না । হয়ত ফুলেছিল । অারো কিছু সময় পরে অামি লক্ষ্য করলাম -অনামিকা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে পানি পান করতে লাগল। অামি এই সময় দুলা ভাইকে বললাম, -দুলা ভাই, অাপনি উল্লাপাড়ার হোটেল থেকে রুটি খেয়েছিলেন, রুটি খেলে পানির পিপাসা লাগে। অাপনার পানির পিপাসা লাগেনি? দুঃখের কথা কি অার বলব গো -পাগল দুলা ভাই স্বাবলীল ভাষায় বলে ফেললেন-“অামার পানির পিপাসা লাগেনি। “এমন সর্বনাশের কথা দুলা ভাই যে বলে ফেলবেন অামি কল্পনাও করতে পারেনি। পাানি যে অামার দরকার অনামিকা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। অন্যান্য সময় দেখতাম অনামিকা দু ‘চার ঢোক পানি খেয়ে বোতল ব্যাগে রেখে দিত। কিন্তু অামার এই স্পর্কাতর কথা বলাতে পানির বোতল ব্যাগে না রেখে ঈষৎ উচুঁ করে অামাকে দেখায়ে -দেখায়ে ঝাঁকাতে লাগল। অামি লক্ষ্য করতে লাগলাম -কখনো -কখনো পানি খাওয়ার মত করে রাঙা ওষ্টদ্বয় থেকে ইঞ্চি খানেক দুরে বোতলের মুখ ধরে রেখেছে। অামিও পানি চেয়ে নিতে পারলাম না। কোন্ যন্ত্রনায় জানি না,শেষে দুই -এক ঢোক করে পানি খেতে লাগল। অাসলে অনামিকা অামাকে বুঝাতে চেয়েছিল -পানি এখনো অাছে,লাগলে নেওয়া যেতে পারে। অবশেষে আমার অার না চাওয়াতে ও রাগ করে সবটুকু পানি খেয়ে বোতলটা বালিশের ন্যায় ঘাড়ের নিচে সিটের সাথে দিয়ে, উপরের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতে লাগল। দুষ্টামী করে অনামিকার ঘাড়ের নিচ্ থেকে বোতলটা টান্ দিয়ে বের করে নেওয়ার জন্যে ডান হাত খানা বাড়িয়ে প্রায় বোতল পর্যন্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত অার নেওয়া হল না। কেন যে নিতে পারলাম না, তা জানি না। অামি অারো লক্ষ্য করলাম -অনামিকা চোখের পাতা অনেক পরপর ফেলছে, অাবার কখনো কথনো বেশ ঘনঘন ফেলছে। ক্ষণিকের ক্ষত হয়ত অাঁখির পাতায় মহা প্লাবন সৃষ্টি করছে। মুখে কথা বললে যেমন ঠোঁট নড়ে,তেমনি মনে মনে কথা বললে চোখের পাতা নড়ে।
এ দিকে অামার নামার সময় হয়ে এসেছে। বারখাদার ত্রিমোহনী থেকে কয়েকজন যাত্রী যখন নেমে গেলেন,তখন অামার হৃদয় অাকাশে বিষন্নতার কালো মেঘ ভেসে উঠল। অামার এই বিষন্নতা অনামিকা কিভাবে বুঝতে পেরেছিল -জানি না। অার অল্প কিছু সময় পরেই অামাদের গাড়ী কুষ্টিয়া মযমপুর বাস ষ্ট্যান্ডে গিয়ে থামবে। তারপরেই ঝিনাইদহের গাঁড়াগঞ্জের উদ্দেশ্যে গাড়ী রওয়ানা দিবে । অামার ভিতরকার বিষন্নতার কালো মেঘ দুর করার মানসে এবং অানন্দের মহা সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অনামিকা তার মাথার ঘনকালো দীঘল কেশগুচ্ছ সিটের উপর দিয়ে অবলীলাক্রমে অামার সামনে এলিয়ে দিল। অামি লক্ষ্য করলাম -অনামিকা জানালা সামান্য ফাঁক করে দিল। এই ফাঁক দিয়ে বাহিরের বাতাসের অাগমন ঘটল। এলোচুল পেয়ে চপল বায়ু যেন পাগল পারা হয়ে উঠল। অামার সমস্ত মুখোমন্ডলে মায়াবিনীর চুলের নাচন খেলে যেতে লাগল। তখন মনে হচ্ছিল -এমন অানন্দময় যাত্রা যদি সারা জীবন ধরে চলত,তবেই জীবনটা সার্থক হত। অানন্দের মহাতরী নঙ্গর করলেও, অামার বুকের ভিতর বেদনার পাহাড় রচিত হতে লাগল। ক্রমশঃ অামার কাছে অার কিছুই ভাল লাগছিল না। অামার হৃদপিন্ডে তখন ঘনঘন শ্বাস -প্রশ্বাস প্রবাহিত হচ্ছিল। মাঝে -মধ্যে দীর্ঘ শ্বাসও বের হয়ে অাসছিল। ভুল করেই হোক,অার ইচ্ছা করেই হোক,অামি এক সময় অনামিকার চুলের কয়েকটা অগ্রভাগ ধরে ঈষৎ প্রেমোময় টান দিলাম। অনামিকা কোনরূপ বাঁধা প্রদান করল না,কোনরূপ প্রতিবাদের নড়াচড়া করল না। অমিয় প্রেমের ঝাকুনি হয়ত তাকে নীরব করে রেখেছিল। অামি তখন পরিস্কার বুঝতে পারলাম -অনামিকাও অামার চেয়ে কম কষ্ট পাচ্ছে না। অামি অতি সংগোপনে অনামিকার কয়েকটা জাম কালো চুল একত্রিত করে ছোট্ট একটা গিট্ দিলাম। অনামিকা মোটেও টের পেল না।
ইতিমধ্যে অামাদের বাস মঙ্গলবাড়িয়ার বাজার পার হয়ে এলো। অামি জানি অার কয়েক মিনিট পরেই নেমে পড়তে হবে। অামি একেবারে নীরব নীথর মূহ্যমান হয়ে গেলাম। রাত সাড়ে তিনটার সময় অামাদের রাজধানী এক্সপ্রেস এসে মযমপুর বাস ষ্ট্যান্ডে থামল। অামার অার দুলা ভাইয়ের সামান্য দুইটা ব্যাগ ছাড়া ভারী তেমন কিছু ছিল না। বাস থামার সাথে সাথে বাস থেকে নামতে শুরু করলাম। নামার সময় অনামিকাদের দিকে বিন্দুমাত্র তাকালাম না,কোন প্রকার কথাও বললাম না। বিদায় নিতে বা দিতে গেলে খুবই কষ্ট লাগবে ভেবে এমন নিষ্টুর পথ বেছে নিয়েছিলাম।
বাস থেকে নেমে অামি কোন রূপ স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। অনামিকাকে একটু দেখার জন্যে,একটু কথা বলার জন্যে অামার মনটা কেমন যেন অাকুবাকু করতে লাগল। দুলা ভাইকে ফাঁকি দিয়ে একটু অাড়াল মত জায়গায় গিয়ে অবস্হান নিলাম। লক্ষ্য করলাম -অনামিকাও ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে এদিক -সেদিক ছলছল নয়নে তাকাচ্ছে। হয়ত বা ও অামাকেই খুঁজছে। তার নারী হৃদয়টা যে কত কষ্ট পাচ্ছিল তা অামি দুর থেকে বুঝতে পারছিলাম। ঐ সময়টুকু অামার কাছে ভীষণ খারাপ লাগছিল। ও হয়ত একটু কথা বলার জন্য ব্যাকুল পারা হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে বাসের ভিতর কেন কথা বললাম না? অাচ্ছা বলুন তো,অামি এত নিষ্টুর কেন?
অামি অার স্থির থাকতে পারলাম না। এক সময় ভাবলাম, যাই,বাসের ভিতর গিয়ে অনামিকার সাথে একটু কথা বলে অাসি, একটু ভাল ধরনের বিদায় নিয়ে অাসি। অাকুল অাপ্লুত হয়ে,অমিয় অভিপ্রায় বক্ষে ধারন করে যাওয়ার জন্যে সবেমাত্র ডান পা বাড়িয়েছি -এমন সময় নিষ্টুর বাস পঁই করে চলে গেল। চলে যাওয়া গাড়ীর দিকে অামি অপলক নেত্রে চেয়েই ছিলাম। অামার মনে হয় বাঁকী পথটুকু অনামিকা কাঁদতে -কাঁদতে গিয়েছিল। কারণ, দুর থেকে দেখেছিলাম -ওর ডাগর ডাগর অশান্ত অাঁখি দুটো অাষাঢ়ের বাদল ঝড়া মেঘের মত টলমল করছিল। তার সেই কাঁন্নাটাও ছিল চাপা কাঁন্না। এ দিকে অামার দুলা ভাই কখন থেকে যে অামার হাত ধরে টানাটানি করছিলেন, তা মোটেও টের পাইনি। পরে জানলাম হাত ধরে এই টানাটানির দৃশ্য উপস্হিত অনেকেই দেখে বেশ হাসাহাসি করেছিলেন। অামি কাঠের পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়েই ছিলাম। অামার চোখ যেন কোন কিছুই দেখছিল না, অামার কান যেন কোন কিছুই শুনছিল না।সমস্ত তনুময় শুধু অনামিকার প্রতিচ্ছবি ভাসছিল। ঘড়ির দিকে ঈষৎ নজর পড়তেই দুলা ভাইকে বললাম -এত রাতে গড়াই নদী পার হয়ে কয়া ইউনিয়নে যাওয়া সমীচিন নয়। ফজরের অাযান হোক, তারপরে যাওয়া যাবে। অতঃপর অন্যান্য যাত্রীদের ন্যায় অামরাও কাউন্টারে অপেক্ষা করতে লাগলাম। শুনন,অামি অাগেই বলেছি -মুন্নি ছাড়া ওদের কারুর নামও জানি না,গ্রামের নামও জানি না। তবে অামার ধারনা,কাঁচের কোল ষ্টীল ব্রীজের অাশে -পাশে কোথাও হবে। কারন,টিকিট চেক করার সময় কনট্র্যাক্ঠর সাহেবের সাথে কথোপকথনে ঝিনাইদহের গাঁড়াগঞ্জের কাঁচের কোল ষ্টীল ব্রীজ প্রসঙ্গে উঠে এসেছিল। তাই বলছিলাম কি – অাপনারা পুলিশের লোক, দায়িত্বটা অাপনাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম -ওকে খুঁজে বের করার। অামার মনে হয়, অনামিকা অাজো চুলের গিটটা অতি যত্নসহকারে রেখেছে, অতি সোহাগভরে দেখে ।
আর কি লিখব।অাপনার সহপাটীদের অামার শুভেচ্ছা দিবেন। খুব ভালভাবো ট্রেনিং সমাপ্ত করুন। দেশ ও দশের জন্য অাত্মনিয়োগ করুন -এই দোয়া করি। পরিশেষে অাপনার অমিয় সুখ শান্তি কামনা করে অাজকের মত এখানেই শেষ করলাম।
ইতি,
আসিক, ”
আসিক কোথাও বসেও শান্তি পাচ্ছে না, দাঁড়িয়েও শান্তি পাচ্ছে না। এ দিকে ও দিকে মনের অজান্তে শুধু পায়চারী করতে লাগল। আসিকের হৃদয় আকাশে ঐ মেয়েটার প্রতিচ্ছবি বারংবার ভেসে উঠতে লাগল। ঐ বাস যদি পথ ভুলে অাবার ফিরে অাসত,তাহলে হয়ত অাসিকের চেয়ে বেশী অানন্দ এই পৃথিবীতে আর কেউ পেত না।
ইতিমধ্যে মসজিদে মসজিদে পবিত্র ফজরের অাযান ধ্বনিত হতে লাগল। অাসিকের দুলা ভাই যাওয়ার কথা বললে, -আসিক চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে,ধীরে-ধীরে মুখ খানা উপরের দিকে তুলে,বুক ভাঙ্গা একটা সুবিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে,অাহত চিত্তে বাড়ীর দিকে পা বাড়ালো ।
