আমরা সকলেই জানি আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। আজ যারা শিশু, কাল তারাই বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। আমার কাছে মনে হয় এই পৃথিবীতে শিশুদের থেকে বড় সম্পদ আর কিছু নাই। আজকের এই শিশুদের যদি আমরা আগামী দিনের কান্ডারী ভাবি দেশ গড়ার সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান ভাবি তাহলে আমার ও আপনাদের উচিত হবে এই দেশটাকে তথা বিশ্বে শিশুদের জন্য অবাধ বিচরণ ব্যবস্থা করে দেওয়া, তাদেরকে সঠিক ও মানসম্মত করে গড়ে তোলা। উপরোক্ত উক্তিতে বলা আছে, শিশুরা হলো নরম কাদার মতো, একজন কর্মকার যেমন নরম কাদামাটি দিয়ে ছাচে ফেলে বা চাকা ঘুড়িয়ে তার সুদক্ষ হাতের ছোঁয়াতে নিজের মনমতো কোন বস্তুর তার নিজস্ব অার্কৃতি দিয়ে থাকেন,শিশুরাও ঠিক তেমনি তারা নরম কাদামাটি তাদের যে ভাবে গড়বেন তারা ঠিক সেরকমটি হবে। তাই তো বিশিষ্ট শিশু মনোবিজ্ঞানী হাইম গিনোট বলেছেন “শিশুরা হচ্ছে ভেজা মাটির মতো, এর উপর যা কিছুই পতিত হয় তার ছাপ ফুটে ওঠে”কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন।

বলতে গেলে অামরা ব্যর্থ, কেননা আমাদের দেশের বিরাট এক অংশ শিশু কোন না কোন কারণে প্রতিনিয়ত শিশু শ্রমের পরিসংখ্যানটা ভারি করছে।একটু চোখ খোলা রাখলেই দেখা যায় এ দেশে কর্মক্ষেত্রের প্রতিটা সেক্টরে শিশু শ্রমের মতো জঘন্যতম কাজে নিয়োজিত আছে হাজারো শিশু। কিন্তু এর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৩ অনুসারে দেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমিক আছে। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূণর্ কাজ করে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমিক।বাংলাদেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৫-১৪ বছর বয়সী মোট শিশু জনসংখ্যার ১৯%, ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ২১.৯% এবং মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে তা ১৬.১%। এইটার বিস্তার শুধু বাংলাদেশে না সারা বিশ্ব জুড়ে এই সংখ্যাটা দিন দিন বাড়ছে।

জাতিসংঘের শ্রম বিষয়ক সংস্থা আইএলও এর সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ শিশু নানা ভাবে শিশু শ্রমে নিয়োজিত।বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি শিশু শ্রমিক আছে। যে বয়সে এই সব শিশুদের আনন্দ, কোলাহল, খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা কিন্তু ঠিক এই বয়সে শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বই, খাতা, কলম নিয়ে স্কুলে গিয়ে সুন্দর ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন না দেখে এই শিশুরা সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে যাচ্ছে শুধু দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্য।বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ।সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই দেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই বিশাল জনসংখ্যার দেশটিতে এখনো অনেক পরিবারেই রয়ে গেছে দারিদ্র্যতা। যে কারণেই দরিদ্র পরিবারের কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা না চাইতেও তাদের পরিবারের কথা ভেবে কাজ করতে হচ্ছে। ঠিক এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অাখের গোছাচ্ছে এক শ্রেণির লোকেরা।আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশু শ্রমিককে কাজে নিতে মালিকপক্ষ বেশ আগ্রহী। কারণ তাদের সহজেই কম-মজুরিতে নিয়োগ দেওয়া যায় এবং বেশি সময় কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। ফলে শিশুশ্রমের চাহিদা সমাজে বেশ লোভনীয়।বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা যেদিকে তাকাই না কেনো সেই দিকে শিশুশ্রমের সমাহার দেখতে পাবো।

দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল থেকে শুরু করে ক্যান্টিন, ডাইনিং, চায়ের দোকান,রিক্সা বা ভ্যান চালক, ফুলবিক্রেতা, হকার,রেলস্টেশনে কুলি, আবর্জনা সংগ্রাহক, ইট-পাথর ভাঙ্গা,বুননকর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক ও কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদি। এই শিশুদের অনেকেই এতিম, কারো বাবা নেই, কারো মা নেই। কিংবা বাবা-মা থাকলেও দেখাশোনা বা খোজ খবর নেয় না।

দারিদ্র্যতা, পারিবারিক বিচ্ছেদ, বাবা মায়ের বিচ্ছেদ, বাবা মায়ের পেশা, অভিভাবকের মৃত্যু, এসব অনেক কারণে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।এইসব শিশু প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে।এদের হাতে সহজে নগদ অর্থ আসার ফলে, এরা মাদকদ্রব্য উৎপাদন, পাচার,এবং একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পরে, পর্নোগ্রাফি, পতিতাবৃত্তির ক্ষেত্রে শিশুদের ব্যবহার এবং দাসত্ব ইত্যাদির শৃঙ্খলে বন্দি অসংখ্য শিশু।কিন্তু এইসব শিশু এরকমটা চায় নি কখনো তারা অাজ পরিস্থিতির স্বীকার।এদের মধ্যে এখনো অনেক শিশু চাই যে আবার তারা পরিবারে ফিরে যাক, অাবার সুন্দর ভাবে স্কুলে যাক,জীবনে অনেক কিছু করি। কিন্তু তাদের অনেকের যে পরিবারও নেই, অাবার ফিরে যেতে চাইলে পরিবার মেনে নেয় না। যার দরুন তারাও আর ফিরে যায় না। এই সমস্যা সমাধান করতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আর এজন্য সরকারের অবদান বেশি প্রয়োজন।

সরকার এ সম্পর্কে অনেক আইন জারি করার পরও আমরা যখন শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারছি না, সেক্ষেত্রে শুধু আইন দিয়ে হবে না,সাধারণ মানুষদের সচেতন হতে হবে । অভিভাবকরা যেন কোনো শিশুকে জোর করে কাজ না করান। কারণ শিশুশ্রম বন্ধ না হলে, শিশুদের সব অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অগ্রগতি হবে না। কারণ শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ।শিশুদের হাতেই জাতির উন্নয়ন সম্ভাবনার চাবিকাঠি তাই শিশুদেরকে গড়ে তুলতে হবে আমাদেরই। শিশুরা জাতির সেরা সম্পদ। শিশুকে তার প্রাপ্য পূর্ণ অধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সার্থক হবে বাংলাদেশ।

লেখক,  শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।